হরমুজ প্রণালী বন্ধ হলে কী প্রভাব পড়বে?

হরমুজ প্রণালী পার হচ্ছে একটি তেলবাহী ট্যাংকার জাহাজ। ছবি: সংগৃহীত
যখনই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দেয় তখনই বিশ্বজুড়ে একটি বিষয় হয়ে ওঠে আলোচনা মূল বিষয়। সেটি হচ্ছে হরমুজ প্রণালী।
কয়দিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম বৃহত্তম পরমাণু শক্তিচালিত যুদ্ধবিমানবাহী রণতরী ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড উপসাগরের দিকে রওনা হয়। এটি এই অঞ্চলে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনীর সঙ্গে যুক্ত হবে। ২০০৩ সালে ইরাক আগ্রসনের পর থেকে এটিই এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সৈন্য সমাবেশ। তবে এবার ওয়াশিংটনের নিশানায় রয়েছে ইরান।
যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিমানবাহী রণতরী ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড। ছবি: সংগৃহীত
এদিকে হরমুজ প্রণালী আংশিকভাবে বন্ধ করে দেওয়ার মাধ্যমে এই মাসে তেহরান ইঙ্গিত দিয়েছে, কোনো হামলা হলে তারা কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে। ইরান ওই করিডোরে সরাসরি গোলাবর্ষণের সামরিক মহড়া পরিচালনা করে। এর কারণে ওই প্রণালী হয়ে তেল পরিবহণ করা জাহাজগুলোকে বিড়ম্বনায় পড়তে হয়।
প্রতি বছর এই জলপথ ধরে ৫০০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি তেল ও গ্যাস পরিবহণ করা হয়। যা পৌঁছে যায় বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে।
এ জলপথে যে কোনো ধরনের অস্থিরতা বিশ্ব অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব ফেলবে। দেখা দেবে জ্বালানি সংকট, যার মাধ্যমে সচল থাকে প্রায় পুরো বিশ্ব।
এ ধাক্কা সামাল দিতে অন্য দেশগুলো তেল সরবরাহ বাড়াতে পারে। কিন্তু অন্য দেশগুলো জ্বালানি সরবরাহ করলেও দাম হবে আকাশচুম্বী। কারণ উপসাগরীয় দেশগুলো এই জলপথ ধরে বিশ্বের জ্বালানি চাহিদার প্রায় ২০ শতাংশ মেটায়।
হরমুজ প্রণালীর অবস্থান কোথায়?
তেল পরিবহনে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু সংকীর্ণ পথ হচ্ছে হরমুজ প্রণালী। বাঁকানো জলপথটির উত্তরে ইরান এবং দক্ষিণে ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের অবস্থান।
এর প্রবেশ ও প্রস্থানমুখের প্রস্থ প্রায় ৫০ কিলোমিটার (৩১ মাইল) এবং সবচেয়ে সরু স্থানে এটি প্রায় ৩৩ কিলোমিটার (২০ মাইল) পর্যন্ত সংকুচিত হয়েছে।
হরমুজ প্রণালীর অবস্থান। ছবি: সংগৃহীত
এটি উপসাগর এবং আরব সাগরের মধ্যে একমাত্র সামুদ্রিক সংযোগ গঠন করে।
এর সংকীর্ণ প্রস্থ সত্ত্বেও, এই নৌপথে বিশ্বের বৃহত্তম অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজ চলাচল করতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান তেল ও গ্যাস রপ্তানিকারক দেশগুলো আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি পাঠাতে এই পথের ওপর নির্ভরশীল। অন্যদিকে আমদানিকারক দেশগুলো এই প্রণালীর স্থিতিশীলতার ওপর নির্ভর করে।
প্রণালী দিয়ে কী পরিমাণ তেল ও গ্যাস যায়
যুক্তরাষ্ট্রের এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (ইআইএ) তথ্যমতে, ২০২৪ সালে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি (২০ মিলিয়ন) ব্যারেল তেল হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিভিন্ন গন্তব্যে পাঠানো হয়েছে। সে অনুযায়ী হিসাব করলে, এই পথ ধরে বছরে প্রায় ৫০০ বিলিয়ন ডলারের সমান জ্বালানি বিভিন্ন গন্তব্যে পাঠানো হয়।
হরমুজ প্রণালী পার হচ্ছে একটি এলএনজিবাহী ট্যাংকার। ছবি: সংগৃহীত
এই প্রণালী দিয়ে যে অপরিশোধিত তেল যায় তা আসে ইরান, ইরাক, কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে।
প্রণালীটি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) বাণিজ্যেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ২০২৪ সালে বৈশ্বিক এলএনজি চালানের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়ে গেছে।
ইআইএর তথ্য অনুযায়ী, এই এলএনজির অধিকাংশই কাতার থেকে বিভিন্ন গন্তব্যে পাঠানো হয়েছে।
এসব জ্বালানি কোথায় যায়?
এই প্রণালী দিয়ে বিভিন্ন গন্তব্যে যেভাবে এলএনজি পাঠানো হয় তেমনই কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাত আমদানিও করে। তারা এলএনজি আনে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিম আফ্রিকা থেকে।
ইআইএর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত অপরিশোধিত তেল ও কনডেনসেটের ৮৪ শতাংশ এশিয়ার বাজারে গেছে। গ্যাস বাণিজ্যেও একই ধারা দেখা যায়। হরমুজ প্রণালী দিয়ে যাওয়া এলএনজির ৮৩ শতাংশ এশিয়ার বিভিন্ন গন্তব্যে পৌঁছেছে।
গত বছর এই প্রণালী হয়ে পরিবাহিত অপরিশোধিত তেল ও কনডেনসেটের ৬৯ শতাংশ চীন, ভারত, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ায় গেছে। দেশগুলোর কারখানা, পরিবহন নেটওয়ার্ক ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থা উপসাগরীয় জ্বালানির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল।
ইরানের কী কী বিকল্প আছে?
আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে, কোনো রাষ্ট্র তার উপকূলরেখা থেকে ১২ নটিক্যাল মাইল (২২ কিলোমিটার) পর্যন্ত সার্বভৌমত্ব প্রয়োগ করতে পারে। সবচেয়ে সংকীর্ণ স্থানে হরমুজ প্রণালী এবং এর নির্ধারিত নৌপথ সম্পূর্ণভাবে ইরান ও ওমানের আঞ্চলিক জলসীমার মধ্যে পড়ে।
মিসাইল ছুঁড়ছে ইরানের একটি যুদ্ধজাহাজ। ছবি: সংগৃহীত
এই আইনি বাস্তবতা তেহরানকে ভৌগোলিক প্রভাব বা সুবিধা দেয়। প্রতি মাসে প্রায় ৩ হাজার জাহাজ এই প্রণালী অতিক্রম করে।
ইরান যদি নৌ চলাচলে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করে, তাহলে সবচেয়ে কার্যকর কৌশলগুলোর একটি হতে পারে ক্ষেপণাস্ত্রবাহী স্পিডবোট মোতায়েন এবং সাবমেরিন থেকে নৌ-মাইন স্থাপন।
ইরানের স্পিডবোটেও যুক্ত করা হয়েছে স্বপ্লমাত্রার ক্ষেপণাস্ত্র। ছবি: সংগৃহীত
গত বছর ইরানের সংসদ হরমুজ প্রণালী বন্ধ করার একটি প্রস্তাব অনুমোদন করেছে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির ওপর নির্ভর করে।
আঞ্চলিক পরিস্থিতি বিষয়টিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
বাব-আল মান্দেব প্রণালীতে হুথিদের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত একটি জাহাজ। ছবি: সংগৃহীত
ইয়েমেনে ইরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র হুথি গোষ্ঠীও বাব আল-মান্দেব প্রণালীতে নৌ চলাচলে বিঘ্ন ঘটানোর চেষ্টা করতে পারে। এই প্রণালীটি লোহিত সাগরকে বৈশ্বিক বাণিজ্যপথের সঙ্গে সংযুক্ত করা আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক সংকীর্ণ পথ।
২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এই করিডোর দিয়ে জাহাজ চলাচলে উল্লেখযোগ্য বিঘ্ন ঘটেছে।
হরমুজ প্রণালী ও বাব আল-মান্দেব প্রণালীতে যেকোনো সমন্বিত চাপ বৈশ্বিক নৌপরিবহন, জ্বালানি বাজার এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে তুলবে।
দাম বাড়বে জ্বালানির
এনার্জি ইন্টেলিজেন্সের মধ্যপ্রাচ্য বিভাগের প্রধান কোলবি কনেলি সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালী সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে বন্ধ হলে অল্প সময়ের মধ্যে তেলের দামের ওপর বড় প্রভাব পড়বে। তবে এটি নির্ভর করবে প্রণালী কতদিন দ্বন্দ্বপূর্ণ অবস্থায় থাকে তার ওপর।
প্রতীকী ছবি
এনার্জি ইন্টেলিজেন্সের গুরুত্বপূর্ণ এই ব্যক্তি আরো বলেছেন, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে তেলের দাম অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে। আর এই পথে কোনো ধরনের বিঘ্ন ঘটলে ব্যারলপ্রতি তেলের দাম ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। বর্তমানে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৬৫ ডলার।
বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রভাব
হরমুজ প্রণালী দিয়ে জ্বালানি সরবরাহে কোনো বিঘ্ন ঘটলে বিশ্বজুড়ে পণ্য উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পাবে। বিশেষ করে চীন ক্ষতিগ্রস্ত হবে বেশি। কেননা দেশটি তার জ্বালানি চাহিদা মেটানোর জন্য এই জলপথের ওপর নির্ভর করে।
যুক্তরাজ্যের রয়েল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের সহযোগী ফেলো স্যামুয়েল রামানি সতর্ক করে বলেন, যদি এই জলপথে কোনো ধরনের বিঘ্ন ঘটে তাহলে বিশ্ব অর্থনীতিতে মারাত্মক মুদ্রাস্ফীতির সৃষ্টি হবে।
এই প্রভাব কেবল চীনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। এশিয়ার কয়েকটি প্রধান অর্থনীতি এই প্রণালীর ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।
যার মধ্যে রয়েছে ভারত, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া। দেশগুলো জ্বালানির গুরুত্বপূর্ণ অংশ এই পথ দিয়েই আমদানি করে।
রামানি বলেন, হরমুজ প্রণালীর বন্ধ হলে পর্যটন ও আর্থিক খাতের ওপর কী প্রভাব পড়তে পারে তা নিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতে ব্যবসায়ীরা উদ্বিগ্ন। এটি সৌদি আরবের ভিশন ২০৩০ প্রকল্পের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। সর্বোপরি এরকম কোনো ঘটনা এই অঞ্চলের পাশাপাশি বিশ্ব অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
সূত্র: আলজাজিরা

