ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনার পর কোন পথে মধ্যপ্রাচ্য?

দীর্ঘদিনের বৈরিতা, পারস্পরিক অবিশ্বাস এবং একাধিক প্রক্সি সংঘাতের পর আবারও আলোচনার টেবিলে মুখোমুখি হয়েছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র। সুইজারল্যান্ডের লেক লুসার্নে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে দুই দেশ একটি সম্ভাব্য চূড়ান্ত সমঝোতার লক্ষ্যে ৬০ দিনের রোডম্যাপে সম্মত হয়েছে। মধ্যস্থতাকারী কাতার ও পাকিস্তান এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। তবে এই অগ্রগতিকে চূড়ান্ত সাফল্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নগুলো এখনো অমীমাংসিত রয়ে গেছে।
সুইজারল্যান্ডের বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয় ১৭ জুন স্বাক্ষরিত ১৪ দফা সমঝোতা স্মারকের ভিত্তিতে। প্রায় ১২ ঘণ্টাব্যাপী আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। তার সঙ্গে ছিলেন জ্যারেড কুশনার ও বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ। অন্যদিকে ইরানের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি।
বৈঠকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হলো একটি উচ্চপর্যায়ের তদারকি কমিটি গঠন। এই কমিটি ভবিষ্যৎ আলোচনার রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা দেবে। একই সঙ্গে পারমাণবিক কর্মসূচি, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, পর্যবেক্ষণ এবং বিরোধ নিষ্পত্তি নিয়ে পৃথক কর্মদল গঠন করা হয়েছে। অর্থাৎ রাজনৈতিক সমঝোতার পর এখন আলোচনা প্রবেশ করছে বাস্তবায়নের কারিগরি পর্যায়ে।
তবে সবচেয়ে বড় বাধা পারমাণবিক ইস্যুই। ওয়াশিংটনের প্রধান দাবি হলো ইরানের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ কমানো কিংবা অপসারণ। কিন্তু ইরান কতটা ছাড় দিতে রাজি হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তেহরান দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে, শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ তাদের অধিকার।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা আশঙ্কা করছে, এই কর্মসূচি ভবিষ্যতে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পথ খুলে দিতে পারে। ফলে আলোচনার পরবর্তী ধাপ যে কঠিন হতে যাচ্ছে, তা নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে কোনো দ্বিমত নেই।
আলোচনায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হলো হরমুজ প্রণালি নিয়ে সরাসরি যোগাযোগ ব্যবস্থা চালু করা। বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও গ্যাস এই জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। সাম্প্রতিক উত্তেজনার কারণে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা দেখা দেয়। নতুন যোগাযোগ চ্যানেল ভুল বোঝাবুঝি ও সম্ভাব্য সামরিক সংঘর্ষ এড়াতে সহায়ক হতে পারে। ফলে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতিও এই উদ্যোগের সফলতার দিকে তাকিয়ে রয়েছে।
লেবানন ইস্যুও আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। যুদ্ধবিরতি কার্যকর রাখতে একটি ‘ডি-কনফ্লিকশন সেল’ গঠনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এর লক্ষ্য ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে চলমান সংঘাতের অবসান নিশ্চিত করা। তবে এখানেই দেখা দিয়েছে নতুন বিতর্ক। কারণ এই ব্যবস্থার আলোচনায় সরাসরি লেবানন বা ইসরায়েল অংশ নেয়নি।
সমালোচকদের মতে, এতে লেবাননের ওপর ইরানের প্রভাব আরও বৈধতা পেতে পারে। অন্যদিকে ইসরায়েলও মনে করছে, তাদের কৌশলগত স্বাধীনতা সীমিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। তবে মাঠপর্যায়ে কিছু ইতিবাচক ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে। দক্ষিণ লেবাননের কয়েকটি এলাকায় তুলনামূলক শান্ত পরিস্থিতির খবর পাওয়া গেছে। যদিও এটি দীর্ঘস্থায়ী হবে কি না, তা এখনই বলা কঠিন।
অর্থনৈতিক দিক থেকেও আলোচনাটি গুরুত্বপূর্ণ। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি দাবি করেছেন, দেশটির তেল ও পেট্রোকেমিক্যাল রপ্তানির ওপর আরোপিত কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল হয়েছে। কয়েকটি জব্দকৃত সম্পদ মুক্ত করা হয়েছে এবং পুনর্গঠন ও উন্নয়ন পরিকল্পনার পথ খুলেছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে এসব দাবির পূর্ণ সমর্থন দেয়নি। তাছাড়া ওয়াশিংটনের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিও একটি বড় বাধা। মার্কিন কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া অনেক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা সম্ভব নয়, আর সেখানে এই চুক্তি নিয়ে আপত্তি রয়েছে।
সুইজারল্যান্ডের আলোচনা মধ্যপ্রাচ্যের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক মোড়। এটি যুদ্ধ থেকে সংলাপের পথে ফেরার একটি চেষ্টা। কিন্তু সামনে রয়েছে পারমাণবিক কর্মসূচি, নিষেধাজ্ঞা, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং ইসরায়েল-লেবানন সংঘাতের মতো জটিল বিষয়। তাই আগামী ৬০ দিনই নির্ধারণ করবে এই উদ্যোগ মধ্যপ্রাচ্যে নতুন স্থিতিশীলতার ভিত্তি গড়ে তুলবে, নাকি আবারও পুরোনো উত্তেজনার চক্রে ফিরে যাবে অঞ্চলটি। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্য দাঁড়িয়ে আছে সম্ভাবনা ও অনিশ্চয়তার এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে।







