মানবতার ফেরিওয়ালার দেশে শিশু তাড়ানোর উৎসব!
- প্রত্যাবাসন লড়াইয়ে যুক্তরাষ্ট্রে ৪ লক্ষ ২৫ হাজার অভিবাসি শিশু

সংগৃহীত ছবি
গণতন্ত্রের ছড়ি হাতে দেশে দেশে ‘মানবতার ছবক’ দিয়ে বেড়ানো যুক্তরাষ্ট্রের নিজের ঘরেই ‘জাত-বিদ্বেষ’র জঞ্জাল। ‘মানবতার ফেরিওয়ালা’ সেজে বিশ্বমঞ্চে বড় বড় বুলি ছাড়া দেশটিই আজ উন্মাদ হয়ে উঠেছে ‘শিশু নির্বাসন’র রমরমা উৎসবে। ৫০ রাজ্যের বিরাট সীমানা ঘেরা ৯৮ লাখ ৩৩ হাজার ৫১৭ বর্গকিলোমিটারের বিশাল ভূখন্ডেও জুটছে না অভিবাসী শিশুদের ঠাঁই !
ময়লা রাখার ১৮ লাখ একর জায়গা হয় কিন্তু ৪ লাখ শিশুর নয়! উল্টো ‘পরবাসী’ অপরাধে তুলছে কাঠগড়ায়! জন্মের পরিচয় নিয়ে দিশেহারার মতো ঘুরছে অভিবাসন আদালতের করিডরে । কখনও দেখা যায় খেলনা গাড়ি হাতে ছুটে বেড়ানো এক শিশুকে, কখনও বা মায়ের হাত ছাড়া দশ বছরের একটি ছেলেকে।
বাবা-মায়ের হাত ধরে ভিনদেশ থেকে আসা এসব শিশুদের আশ্রয়ের বদলে ঠেলে ফেলে দিচ্ছে ‘অযাচিত আগন্তুক ‘ অবহেলায়। যে বয়সে স্কুলের খাতায় নতুন অক্ষর শেখার কথা, বন্ধুদের সঙ্গে মাঠে দৌড়নোর কথা, সেই বয়সেই হাজার হাজার শিশুকে দাঁড়াতে হচ্ছে এমন এক আইনি ব্যবস্থার সামনে, যার ভাষা, নিয়ম কিংবা পরিণতি- কিছুই তারা বোঝে না।
যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন সংক্রান্ত সাম্প্রতিক তথ্য বিশ্লেষণে উঠে এসেছে এক উদ্বেগজনক চিত্র। দেশটিতে বর্তমানে বহিষ্কার বা নির্বাসন-সংক্রান্ত মামলার মুখোমুখি ৪ লক্ষ ২৫ হাজারেরও বেশি শিশুর পাশে কোনও আইনজীবী নেই। অর্থাৎ, জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আইনি লড়াইগুলির একটিতে তারা কার্যত একাই লড়ছে।
পরিসংখ্যান বলছে, চলমান অভিবাসন মামলায় জড়িয়ে থাকা প্রায় সাড়ে সাত লক্ষ শিশুর মধ্যে ৫৭ শতাংশের কোনও আইনি প্রতিনিধিত্ব নেই। আদালতের ভাষা, আইনের জটিলতা কিংবা প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে যাদের কোনও ধারণা নেই, তাদেরই অনেককে নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে আদালতের প্রশ্নের উত্তর দিতে হচ্ছে।
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বহিষ্কারের মামলার মুখে থাকা ৭ লক্ষ ৫১ হাজার ৮৬১ শিশুর মধ্যে ৫৭ শতাংশ, অর্থাৎ ৪ লক্ষ ২৫ হাজার ৯৩ জনের কোনও আইনজীবী নেই। তুলনায় প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রেও এই হার উদ্বেগজনক হলেও কিছুটা কম। এখনও নিষ্পত্তি না হওয়া শিশুদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ মামলাই ২০২৩ সালে, তৎকালীন বাইডেন প্রশাসনের সময়ে, ফেডারেল সরকারের উদ্যোগে শুরু হয়েছিল। মামলার নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে এই বৈষম্য আরও স্পষ্ট। গত বছর শেষ হওয়া শিশুদের অভিবাসন মামলার ৬৪ শতাংশই আইনজীবী ছাড়াই পরিচালিত হয়েছে।
মার্কিন বিচার বিভাগের অধীন এক্সিকিউটিভ অফিস ফর ইমিগ্রেশন রিভিউ (ইওআইআর)-এর তথ্য বলছে, ১৮ বছরের কম বয়সি শিশুদের ক্রমবর্ধমান সংখ্যায় আইনজীবী ছাড়া অভিবাসন আদালতে হাজির হতে হচ্ছে। এমন এক সময়ে এই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, যখন ট্রাম্প প্রশাসন বছরে ১০ লক্ষেরও বেশি মানুষকে দেশছাড়া করার লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে এবং অভিবাসন-সংক্রান্ত আইনি সুরক্ষা বা স্বস্তি পাওয়াও ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে। তবে এই শিশুদের মধ্যে কতজন সম্পূর্ণ একা, অর্থাৎ অভিভাবকহীন অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রে এসেছে, তা নির্দিষ্ট করে জানা যায়নি। কারণ ইওআইআর-এর তথ্যভান্ডারে অভিভাবকের সঙ্গে থাকা শিশু এবং একা আসা শিশুর মধ্যে কোনও পৃথক শ্রেণিবিভাগ নেই।
এই শিশুদের গল্প কেবল সংখ্যার গল্প নয়। এর মধ্যে রয়েছে ভেনেজুয়েলা থেকে আসা দশ বছরের এক শিশুর গল্পও। কয়েক বছর আগে মায়ের সঙ্গে আমেরিকায় এসেছিল সে। পরিবারের আশ্রয়ের আবেদন এখনও নিষ্পত্তি হয়নি। কিন্তু মা প্রশাসনের হেফাজতে যাওয়ার পর তাকে একাই আদালতে হাজির হতে হয়েছে। যে দেশে ফেরত পাঠানোর কথা বলা হচ্ছে, সেই দেশ সম্পর্কে তার কোনও স্মৃতিই নেই। সেখানে তার পরিচিত কেউও নেই।
শুধু সে-ই নয়, অভিবাসন অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলির অভিজ্ঞতা বলছে, আদালতের তালিকায় এমন শিশু রয়েছে যাদের বয়স চার, তিন, এমনকি তারও কম। কখনও কোনও আইনজীবীকে শুনানির সময় কোলে শিশু নিয়ে দাঁড়াতে হয়েছে। কখনও আদালতের মেঝেতে খেলতে খেলতেই একটি শিশু তার নাম ডাকার অপেক্ষা করেছে। দৃশ্যগুলি যেন এক অদ্ভুত বৈপরীত্যের প্রতীক - যেখানে শৈশব এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মীদের মতে, এই পরিস্থিতির সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হল আইনি সহায়তার অভাব।
তথ্য বলছে, যেসব শিশুর পাশে আইনজীবী থাকে, তাদের পক্ষে কোনও না কোনও ধরনের আইনি সুরক্ষা পাওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি। আশ্রয়, বিশেষ সুরক্ষা বা অন্য কোনও বৈধ উপায়ে দেশে থাকার সুযোগ তারা তুলনামূলকভাবে বেশি পায়। বিপরীতে, আইনজীবীহীন শিশুদের ক্ষেত্রে বহিষ্কার বা স্বেচ্ছায় দেশত্যাগের নির্দেশের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
অভিবাসন আদালতের সাবেক বিচারকদের অনেকেই প্রকাশ্যে উদ্বেগ জানিয়েছেন। তাদের মতে, শিশুদের মামলার জন্য প্রয়োজন সময়, ধৈর্য এবং বিশেষ সংবেদনশীলতা। কারণ একটি শিশু আদালতের কাঠামো বোঝে না, প্রশ্নের তাৎপর্য বোঝে না, এমনকি অনেক সময় সে জানেই না কেন তাকে সেখানে আনা হয়েছে।
কিন্তু বাস্তব চিত্র ক্রমশ বদলাচ্ছে। প্রশাসনের ওপর দ্রুত মামলা নিষ্পত্তির চাপ বাড়ছে। ফলে অনেক ক্ষেত্রে একের পর এক মামলার শুনানি চলছে স্বল্প সময়ে। একই দিনে বিপুল সংখ্যক মানুষের মামলা তালিকাভুক্ত হচ্ছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলির অভিযোগ, এই তাড়াহুড়োর মধ্যে ন্যায়বিচারের মৌলিক নীতিই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আরও একটি উদ্বেগের বিষয় হল আইনি সহায়তা প্রকল্পগুলির অনিশ্চয়তা। বহু স্বেচ্ছাসেবী ও অলাভজনক সংস্থা দীর্ঘদিন ধরে অভিবাসী শিশুদের বিনামূল্যে আইনি সহায়তা দিয়ে আসছে।
কিন্তু সাম্প্রতিক প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও অর্থায়নের জটিলতার কারণে সেই পরিষেবাগুলিও চাপের মুখে। এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে শিশুদের ওপর। কারণ একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষও অভিবাসন আইনের জটিলতা সামলাতে হিমশিম খান। সেখানে একটি শিশুর পক্ষে আইনজীবী ছাড়া নিজের অবস্থান তুলে ধরা কার্যত অসম্ভব। অভিবাসন প্রশ্নটি মার্কিন রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু।
সীমান্ত নিরাপত্তা, অবৈধ অনুপ্রবেশ, আশ্রয়নীতি- সবই রাজনৈতিক মতভেদের বিষয়। কিন্তু শিশুদের প্রশ্নে বিতর্কের ভাষা বদলে যায়। কারণ এখানে কেবল আইনের প্রয়োগ নয়, মানবিকতার প্রশ্নও জড়িয়ে থাকে। একটি শিশু যখন আদালতে দাঁড়ায়, তখন সে কোনও রাজনৈতিক স্লোগানের প্রতিনিধি নয়। সে কোনও নির্বাচনী ইস্যুও নয়। সে কেবল একটি শিশু- যার ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা এবং জীবনের পরবর্তী অধ্যায় নির্ভর করছে কয়েকটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ওপর!
লেখক: কলকাতা প্রতিনিধি । আগামীর সময়




