কাঠমান্ডুতে বাংলাদেশের আম ও আমজাত পণ্যের উৎসব
- রপ্তানি সম্ভাবনা তুলে ধরল নেপালের বাংলাদেশ দূতাবাস

‘বাংলাদেশ ম্যাঙ্গো ডেলিকেসি’ শীর্ষক বিশেষ আম উৎসবে অতিথিরা। ছবি: সংগৃহীত
নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুতে বাংলাদেশের বিভিন্ন জাতের আম ও আমজাত পণ্যের বৈচিত্র্য এবং রপ্তানি সম্ভাবনা তুলে ধরতে ‘বাংলাদেশ ম্যাঙ্গো ডেলিকেসি’ শীর্ষক বিশেষ আম উৎসবের আয়োজন করেছে বাংলাদেশ দূতাবাস। দূতাবাস-সংলগ্ন উৎসব কুঞ্জ ব্যাংকুয়েট হলে আয়োজিত এ উৎসবে অংশ নেন প্রায় ২৫০ জন অতিথি। তাদের মধ্যে ছিলেন বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক, নেপাল সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, ফল ব্যবসায়ী, আমদানিকারক, ব্যবসায়ী সংগঠনের প্রতিনিধি, চেম্বার নেতৃবৃন্দ, গণমাধ্যমকর্মী এবং অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তি।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন সার্ক সচিবালয়ের মহাসচিব রাষ্ট্রদূত মো. গোলাম সারওয়ার। নেপালের পররাষ্ট্র সচিবের পক্ষে বিশেষ অতিথি ছিলেন দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দক্ষিণ এশিয়া বিভাগের যুগ্মসচিব গহেন্দ্র রাজভাণ্ডারী।
স্বাগত বক্তব্যে কৃষি ও কৃষিভিত্তিক শিল্পে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অগ্রগতির চিত্র তুলে ধরেন বাংলাদেশ দূতাবাসের রাষ্ট্রদূত মো. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে আম কেবল একটি ফল নয়; এটি আমাদের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, কৃষি এবং জীবনযাত্রার অবিচ্ছেদ্য অংশ।’ তিনি জানান, উর্বর পলিমাটি ও অনুকূল জলবায়ুর কারণে বাংলাদেশ বিশ্বের উৎকৃষ্ট আম উৎপাদনকারী দেশগুলোর অন্যতম। খিরসাপাত (হিমসাগর), হারিভাঙ্গা, ল্যাংড়া, ফজলি, গোপালভোগ, আম্রপালি, আশ্বিনা, বানানা ম্যাঙ্গো, কাটিমন, গৌরমতি এবং বিভিন্ন বারি জাতের আমের অনন্য মিষ্টতা, সুবাস, গুণগত মান ও পুষ্টিগুণ বিশ্বজুড়ে সমাদৃত।
রাষ্ট্রদূত আরও বলেন, বাংলাদেশের বিজ্ঞানী ও গবেষকেরা দেরিতে ফলনশীল নতুন বারি আম উদ্ভাবন এবং বিদেশি জাতের সফল অভিযোজনের মাধ্যমে আম গবেষণায় রেখেছেন উল্লেখযোগ্য অবদান। একই সঙ্গে দেশের বেসরকারি খাত আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন আমের জুস, নেকটার, পাল্প, জ্যাম, আচার, চাটনি, শুকনো আম, ক্যান্ডি, ফ্রুট বার, ডেজার্টসহ বিভিন্ন মূল্যসংযোজিত পণ্য উৎপাদনে অর্জন করেছে সফলতা।
সার্ক মহাসচিব রাষ্ট্রদূত মো. গোলাম সারওয়ার দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের আমের ঐতিহ্য ও স্বাদের প্রসঙ্গ তুলে ধরে বলেন, বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও এ অঞ্চলের আম ও আমজাত পণ্যের রপ্তানি এখনও প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। এ ধরনের উদ্যোগের জন্য বাংলাদেশ দূতাবাসকে অভিনন্দন জানান তিনি এবং কৃষিখাতে সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা আরও জোরদারের আহ্বান জানান।
বিশেষ অতিথি গহেন্দ্র রাজভাণ্ডারী বাংলাদেশ দূতাবাসকে ব্যতিক্রমী এ আয়োজনের জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, ‘এ উদ্যোগ শুধু বাংলাদেশের আন্তরিকতা ও আতিথেয়তার পরিচয় বহন করে না, বরং দুই বন্ধুত্বপূর্ণ দেশের জনগণের মধ্যে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সেতুবন্ধন গড়ে তুলতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।’ তিনি রাষ্ট্রদূত মো. শফিকুর রহমানের ‘ম্যাঙ্গো ডিপ্লোমেসি’ উদ্যোগের প্রশংসা করেন এবং বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে পারস্পরিক সম্প্রীতি ও বন্ধুত্ব আরও জোরদারে এ ধরনের কার্যক্রম অব্যাহত রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
উৎসবে বাংলাদেশের বিভিন্ন জাতের তাজা আমের পাশাপাশি আমভিত্তিক প্রক্রিয়াজাত নানা পণ্য প্রদর্শন করা হয়। দর্শনার্থীরা বাংলাদেশের আমের স্বাদ, বৈচিত্র্য ও রন্ধনশৈলীর সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পান। একই সঙ্গে আধুনিক উদ্যানতত্ত্ব, টেকসই কৃষি এবং খাদ্য প্রক্রিয়াজাত প্রযুক্তিতে বাংলাদেশের অগ্রগতিও তাঁদের সামনে তুলে ধরা হয়।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের সফল আমচাষি রফিকুল ইসলাম গত ১৫ বছরের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। তিনি বাংলাদেশ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে গুড অ্যাগ্রিকালচারাল প্র্যাকটিসেস (জিএপি) অনুসরণ করে নিরাপদ ও মানসম্মত আম উৎপাদনের বিভিন্ন পদ্ধতি এবং নিজের বাস্তব অভিজ্ঞতা অতিথিদের সামনে উপস্থাপন করেন।
প্রদর্শনীতে রাজশাহীর মৌসুম-পরবর্তী বিভিন্ন জাতের আম, যেমন ফজলি, আম্রপালি, বারি-৪, কাটিমন, গৌরমতি ও আশ্বিনা প্রদর্শন করা হয়। পাশাপাশি বিভিন্ন ব্র্যান্ডের আমের জুস, আচার, ফ্রুট বার, শুকনো আম, চাটনি, জ্যাম ও জেলিসহ নানা ধরনের প্রক্রিয়াজাত আমপণ্যও স্থান পায়। অতিথিদের জন্য আমের কেক, ম্যাঙ্গো স্টিকি রাইস, ম্যাঙ্গো পুডিংসহ বিভিন্ন আমের ডেজার্ট পরিবেশন করা হয়। এ ছাড়া বাংলাদেশে আম চাষ, দেশের সংস্কৃতি, পর্যটন এবং ‘বিউটিফুল বাংলাদেশ’ বিষয়ক প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়।
বাংলাদেশ দূতাবাস জানায়, এ উৎসব শুধু দেশের কৃষি সাফল্য তুলে ধরার উদ্যোগ নয়, বরং বাংলাদেশ ও নেপালের মধ্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোরদারের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এর মাধ্যমে নেপালের ভোক্তাদের মধ্যে বাংলাদেশের আম ও আমজাত পণ্যের প্রতি নতুন আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে। পাশাপাশি দুই দেশের রপ্তানিকারক ও আমদানিকারকদের মধ্যে ব্যবসায়িক অংশীদারত্ব গড়ে তুলে কৃষি ও খাদ্যপণ্যের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য সম্প্রসারণের পথ সুগম করাই এ আয়োজনের অন্যতম লক্ষ্য।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত অতিথিরা বাংলাদেশের আমের স্বাদ, গুণগত মান ও বৈচিত্র্যের ভূয়সী প্রশংসা করেন। শেষে তাদের জন্য ঐতিহ্যবাহী বাংলাদেশি খাবারের আপ্যায়নের আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ দূতাবাস দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও সাংস্কৃতিক বিনিময় সম্প্রসারণে নিজেদের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে এবং আশা প্রকাশ করে, ‘বাংলাদেশ ম্যাঙ্গো ডেলিকেসি’র মতো উদ্যোগ বাংলাদেশ ও নেপালের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্ব ও পারস্পরিক লাভজনক অংশীদারত্বকে আরও সুদৃঢ় করবে।




