পদ্মা সেতু
বাণিজ্যে গতি এলেও থমকে শিল্পায়ন
- কৃষি, মৎস্য, পর্যটন ও বন্দরনির্ভর বাণিজ্যে দৃশ্যমান সুফল
- ভাবনার তালে বাস্তবে গড়ে ওঠেনি শিল্পাঞ্চল, দরকার সময়

সংগৃহীত ছবি
ফেরির দীর্ঘ লাইন আর ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার দিন ফুরিয়েছে বহু আগেই। প্রমত্তা পদ্মার বুকে দৃশ্যমান হওয়া সেতু বদলে দিয়েছে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলার ভাগ্য। যাতায়াতে কমেছে সময় ও পরিবহন ব্যয়, বেড়েছে কৃষি ও মৎস্যপণ্য বিপণনের সুযোগ, গতিশীল হয়েছে বন্দরভিত্তিক বাণিজ্য। তবে চার বছর পরও প্রত্যাশা আর প্রাপ্তির মধ্যে রয়ে গেছে অপূর্ণতা।
সরকারের সেতু বিভাগের তথ্য বলছে, দেশের মোট আয়তনের প্রায় ২৯ শতাংশ এলাকায় পড়েছে এই মেগা প্রকল্পের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব। যদিও বাণিজ্যে গতি এলেও শিল্পায়ন আছে থমকে। শিল্পায়ন ও বড় বিনিয়োগের ক্ষেত্রে প্রত্যাশা অনুযায়ী অগ্রগতি দৃশ্যমান নয় এখনো।
বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের তথ্য বলছে, পদ্মা সেতুতে যান চলাচল শুরু হওয়ার পর— অর্থাৎ ২০২২ সালের ২৬ জুন থেকে চলতি বছরের ২২ জুন পর্যন্ত গাড়ি চলেছে ২ কোটি ৬৬ লাখ ৭৯ হাজার ৬৮৭টি। এসব গাড়ি চলার বিপরীতে টোল আদায় হয়েছে ৩ হাজার ৩৮৯ কোটি ৮৭ লাখ ৮৬ হাজার ৯০০ টাকা।
ছোট শিল্পে বড় সংকট
২৪ জুন ২০২৬
পদ্মা সেতুর সবচেয়ে বড় সুফল পাচ্ছেন দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষক ও মৎস্যজীবীরা। সেতু থাকায় সেখানকার সবজি ঢাকা ও চট্টগ্রামের বাজারে পৌঁছাচ্ছে কয়েক ঘণ্টাতেই। আগে ফেরিঘাটে আটকে থেকে পণ্য যেত পচে। এখন আর নেই লোকসানের ঝুঁকি। খুলনার ডুমুরিয়ায় সেতু চালুর পর গড়ে উঠেছে বড় কাঁচাবাজার।
প্রতিদিন প্রায় ১০০ টন সবজি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যায়, যার বড় অংশ ঢাকা ও চট্টগ্রামের বাজারে পৌঁছায় পদ্মা সেতু হয়ে। আগে ফেরিঘাটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকার কারণে পচনশীল পণ্য নষ্ট হতো, ব্যবসায়ীরা থাকতেন লোকসানের ঝুঁকিতে। এখন মাত্র কয়েক ঘণ্টায় পণ্য ঢাকায় পৌঁছানো সম্ভব হওয়ায় কৃষক ও ব্যবসায়ী— লাভবান হচ্ছেন উভয়েই।
মৎস্য খাতেও এসেছে নতুন গতি। খুলনা ও উপকূলীয় অঞ্চলের মাছ দ্রুত রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন বাজারে পৌঁছাচ্ছে। চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহার করে চিংড়ি ও অন্যান্য মৎস্যপণ্য রপ্তানিও বেড়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, মোংলা বন্দরে কনটেইনার বা জাহাজের সীমাবদ্ধতা থাকলেও পদ্মা সেতুর কারণে সহজেই চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহার করা যাচ্ছে, ফলে রপ্তানি কার্যক্রমে এসেছে গতি।
সেতুর ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে পর্যটন খাতেও। সুন্দরবন, কুয়াকাটা, পায়রা ও মোংলাকেন্দ্রিক পর্যটনে তৈরি হয়েছে নতুন সম্ভাবনা। যাতায়াত সহজ হওয়ায় পর্যটকের সংখ্যা বেড়েছে, হোটেল-রিসোর্ট ও পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায় বিনিয়োগও বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সঙ্গে মোংলা সমুদ্রবন্দর, ভোমরা ও বেনাপোল স্থলবন্দর ঘিরে বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডও হয়েছে সম্প্রসারিত। আগে যে পণ্যবাহী ট্রাক ঢাকায় পৌঁছাতে এক দিনের বেশি সময় নিত, এখন তা কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই গন্তব্যে পৌঁছাতে পারছে।
তবে শিল্পায়নের ক্ষেত্রে প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। খুলনা, ফরিদপুর, শরীয়তপুরসহ বিভিন্ন জেলায় এখনো বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি। অনেক শিল্পগোষ্ঠী জমি কিনলেও কারখানা স্থাপনের কাজ শুরু হয়নি। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদদের মতে, গ্যাসসংযোগের অভাব, প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর ঘাটতি এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশের সীমাবদ্ধতা বড় বাধা হয়ে আছে।
ফরিদপুরে ব্যবসায়ীরা বলছেন, পদ্মা সেতুর ফলে যোগাযোগ সহজ হলেও শিল্প বিনিয়োগের গতি এখনো মন্থর। গ্যাস ও অন্যান্য সেবা সুবিধা নিশ্চিত না হওয়ায় উদ্যোক্তারা বড় আকারে বিনিয়োগে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। একই চিত্র শরীয়তপুরেও। পদ্মা সেতুর জাজিরা প্রান্তে অবস্থান করেও জেলার সড়ক অবকাঠামো পায়নি কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন। ফলে শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সেভাবে সৃষ্টি হয়নি।
শরীয়তপুরবাসীর আরেকটি বড় প্রত্যাশা ছিল তাঁতপল্লী প্রকল্পকে ঘিরে কর্মসংস্থান সৃষ্টি। কিন্তু প্রকল্পটির বাস্তবায়ন ধীরগতির হওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে রয়েছে হতাশা। ব্যবসায়ীরা মনে করেন, শুধু সেতু নির্মাণই যথেষ্ট নয়; এর সুফল পেতে হলে সংযোগ সড়ক, অর্থনৈতিক অঞ্চল ও শিল্প অবকাঠামোর উন্নয়নও জরুরি।
কুয়াকাটার পর্যটন খাতেও একই ধরনের চিত্র দেখা যাচ্ছে। সেতু চালুর পর পর্যটক বাড়লেও পরিকল্পিত উন্নয়ন, চার লেন সড়ক, বিমানবন্দর ও অন্যান্য অবকাঠামো না থাকায় সম্ভাবনার পুরোটা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। বিনিয়োগকারীদের অনেকেই জটিল অনুমোদন প্রক্রিয়া ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে আগ্রহ হারাচ্ছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিল্পায়ন, বড় বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন পেতে হলে গ্যাস সরবরাহ, উন্নত সড়ক নেটওয়ার্ক, অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। তাদের মতে, পদ্মা সেতুর পূর্ণ অর্থনৈতিক সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ নিতে আরও কিছু সময় প্রয়োজন।
সেতুর চার বছরের বাস্তবতায় সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে শিল্পায়ন। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন সত্ত্বেও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে প্রত্যাশিত হারে বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) খুলনা বিভাগীয় কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৩৭টি নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের নিবন্ধনের বিপরীতে বিনিয়োগ ছিল ১ হাজার ২৯৪ কোটি টাকা। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ২২টি প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ বেড়ে ১১ হাজার ২২০ কোটি টাকায় উঠলেও পরবর্তী বছরগুলোয় সেই ধারা স্থায়ী হয়নি। ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১৭টি প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ নেমে আসে ৭৫৭ কোটি টাকায়। ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জানুয়ারি পর্যন্ত ১৩টি নতুন প্রতিষ্ঠানের বিপরীতে বিনিয়োগ হয় ১ হাজার ১৩৯ কোটি টাকা।
খুলনা অঞ্চলের ব্যবসায়ী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, পদ্মা সেতু চালুর পর এ অঞ্চলে শিল্পায়নের নতুন জোয়ার আসবে বলে প্রত্যাশা ছিল। বৃহত্তর খুলনা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির সভাপতি আশরাফ-উজ-জামান আগামীর সময়কে বললেন, ‘সবাই ভেবেছিল পদ্মা সেতুর পর বিনিয়োগ বাড়বে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং আঞ্চলিক বৈষম্য কমবে। কিন্তু বাস্তবে বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি। মহাসড়কের পাশে এখনো অনেক জায়গায় শুধু সাইনবোর্ড দেখা যায়।’
তার মতে, শিল্পে ব্যবহারের জন্য গ্যাস সরবরাহ না থাকা এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশের ঘাটতি বিনিয়োগে বড় বাধা হয়ে রয়েছে। একই ধরনের মত ফরিদপুর চেম্বার অব কমার্সের সাবেক সভাপতি এবি সিদ্দিকী মিতুলের। তিনি বলছিলেন, ‘যোগাযোগের সুবিধা তৈরি হয়েছে, কিন্তু শিল্পায়নের জন্য গ্যাস, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য সেবা নিশ্চিত না হলে উদ্যোক্তারা বড় বিনিয়োগে আগ্রহী হবেন না।’
শরীয়তপুরের চিত্র আরও ভিন্ন। পদ্মা সেতুর জাজিরা প্রান্ত এই জেলায় হলেও স্থানীয়রা বলছেন, জেলার অভ্যন্তরীণ সড়ক অবকাঠামো এখনো পৌঁছায়নি কাঙ্ক্ষিত মানে। শরীয়তপুর চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম বাবুল তালুকদার বললেন, ‘পদ্মা সেতু উদ্বোধনের পর যে পরিমাণ উন্নয়ন হওয়ার কথা ছিল, তা হয়নি। সংযোগ সড়কের কাজ শেষ না হওয়ায় অনেক বিনিয়োগকারী আগ্রহ দেখাচ্ছেন না।’
অন্যদিকে পাটশিল্পনির্ভর খুলনা অঞ্চলের শ্রমিকদেরও প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। পাটকল রক্ষায় সম্মিলিত নাগরিক পরিষদের সভাপতি কুদরত-ই-খুদা জানালেন, ২০২০ সালে খুলনা অঞ্চলের ৯টি রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল বন্ধ হয়ে প্রায় ৩০ হাজার শ্রমিক কর্মহীন হন। তাদের অনেকেই আশা করেছিলেন, পদ্মা সেতু চালুর পর বিদেশি বা বেসরকারি বিনিয়োগে এসব শিল্প আবার সচল হবে। কিন্তু সেই প্রত্যাশা এখনো হয়নি পূরণ।
তবে বন্দর ও বাণিজ্য খাতে ইতিবাচক পরিবর্তনের কথা বলছেন ব্যবসায়ীরা। আমদানি-রপ্তানিকারক সমিতির সহসভাপতি আমিনুল হক বলছিলেন, ‘বেনাপোল ও ভোমরা বন্দর থেকে ঢাকায় পণ্য পরিবহনের সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। আগে যেখানে ২৪ থেকে ৩৬ ঘণ্টা লাগত, এখন ছয় থেকে সাত ঘণ্টার মধ্যে পণ্য পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে। ফলে পরিবহন ব্যয় কমেছে, গতি বেড়েছে ব্যবসার।’
প্রতিবেদনটিতে তথ্য দিয়েছেন এসএম আমিনুল ইসলাম, খুলনা, সঞ্জিব দাস, ফরিদপুর, রাজিব হোসেন রাজন, শরীয়তপুর, মোহসীন আলী, বেনাপোল (যশোর) এবং মাসুদ পারভেজ সাগর, কলাপাড়া (পটুয়াখালী)






