পাবনা
ছোট শিল্পে বড় সংকট

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
‘১০ বছর আগে জমানো কিছু টাকা দিয়ে একটি মেশিন কিনেছিলাম। এখন ১০ জন শ্রমিক খাটছে। কিন্তু কারিগরি ও প্রযুক্তিগত সামান্য সহায়তা না পাওয়ায় জাতীয় অটোমোবাইল খাতে ঢুকতে পারছে না আমাদের তৈরি পণ্য’— আক্ষেপ করে কথাগুলো বলছিলেন পাবনার মনোহরপুরের ‘বাবা ইঞ্জিনিয়ারিং’-এর স্বত্বাধিকারী রবিউল ইসলাম ফরহাদ।
রবিউলের মতো জেলায় শত শত ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার কঠোর পরিশ্রমে গড়ে ওঠা পাবনার লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং বা হালকা প্রকৌশল খাত এখন আছে নানা সংকটে। সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে কিছু ঋণ ও প্রশিক্ষণ মিললেও বিদ্যুৎ-জ্বালানির সংকট, কাঁচামালের অভাব, আধুনিক প্রযুক্তির ঘাটতি এবং ব্যাংকঋণের চড়া সুদের বহুমাত্রিক বেড়াজালে আটকে গেছে এ সম্ভাবনাময় খাতের বিকাশ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নীতিগত সহায়তার অভাব ও দুর্বল বাজার সংযোগের কারণে মাঠপর্যায়ের এই ক্ষুদ্র ও মাঝারি (এসএমই) শিল্পগুলোর প্রকৃত রূপান্তর ঘটছে না।
সংশ্লিষ্ট তথ্যমতে, দেশে লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্পের অভ্যন্তরীণ বাজারের আকার প্রায় ৯০ হাজার কোটি টাকার, যা জাতীয় জিডিপিতে প্রায় ৩ শতাংশ অবদান রাখছে। দেশ জুড়ে ১৭৭টি এসএমই ক্লাস্টারে রয়েছে প্রায় ৭০ হাজার কারখানা। কৃষি, কলকারখানা ও যানবাহনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ তৈরির এই বাজারে পাবনার উদ্যোক্তারাও রাখছেন গুরুত্বপূর্ণ অবদান।
মনোহরপুর ছাড়াও পাবনার কুঠিপাড়া, বিসিক শিল্পনগরী, লস্করপুর, সিংগা, হেমায়েতপুর এলাকায় গড়ে উঠেছে লাইট ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের কারখানা। উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, গাড়ি কলকারখানার যন্ত্রাংশ ছাড়াও তারা তৈরি করছেন ওষুধ ও খাদ্য প্রস্তুত কারখানার অত্যাধুনিক মেশিনও।
কারখানার মালিক ও শ্রমিকদের ভাষ্য, বিদ্যুৎ সংকটের কারণে প্রায়ই বন্ধ থাকে উৎপাদনের চাকা। এর ওপর যোগ হয়েছে চড়া পরিবহন খরচ, কাঁচামাল সংকট ও সহজ শর্তে পুঁজির অভাব। শুধু দেখেই কাজ শিখেছেন অনেক কারিগর। ফলে রয়ে গেছে আধুনিক প্রশিক্ষণের অভাব। এত সক্ষমতা থাকার পরও এখনো কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বা আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পায়নি খাতটি।
জেলার স্বনামধন্য ‘কফিল উদ্দিন ইঞ্জিনিয়ারিং’-এর তৃতীয় প্রজন্মের উদ্যোক্তা গিয়াস উদ্দিন শিপলু। তার কারখানায় বর্তমানে ২৭টি মেশিন সচল থাকলেও কাঁচামাল সংকট, আধুনিক প্রক্রিয়াকরণ সুবিধার অভাব ও স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রপাতির অভাবে ব্যবসা বড় করতে পারছেন না। শিপলু বলেছেন, ‘পাবনা যেহেতু হালকা প্রকৌশলের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হয়ে উঠেছে, তাই এখানে একটি সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় ‘মোল্ডিং সুবিধা’ গড়ে তোলা জরুরি। এতে এ খাতের চিত্র বদলে যাবে।’ তবে চড়া সুদের কারণে ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে অনেকেই ব্যবসার উন্নতির চেয়ে উল্টো বিপদে পড়ছেন বলেও জানিয়েছেন।
এ খাতের প্রসারে ঋণ দেওয়া, প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়নে কাজ করছে এসএমই ফাউন্ডেশন। তাদের তথ্যানুযায়ী, বিআইটিএসি ও স্থানীয় চেম্বার অব কমার্সের সহায়তায় ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন ক্লাস্টারে নিয়মিত কারিগরি প্রশিক্ষণ ও বিপণন মেলার আয়োজন করা হচ্ছে। গত দুই দশকে প্রায় ২০ লাখ মানুষ এ সুবিধার আওতায় এসেছেন।
ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) ফাউন্ডেশনের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক নাজিম হাসান সাত্তার বলেছেন, ‘এসব ক্লাস্টারের অধিকাংশ উদ্যোক্তাই উত্তরাধিকারসূত্রে ব্যবসা পেয়ে থাকেন। ফলে প্রথাগত জ্ঞান থাকলেও তাদের আধুনিক কারিগরি দক্ষতা ও উন্নত ব্যবস্থাপনার অভাব রয়েছে। আমরা ২০০৭ সাল থেকে জরিপ চালিয়ে তাদের দক্ষতা উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছি। উদ্যোক্তা ও কর্মীদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা বাড়ানো এবং পণ্যের সঠিক বিপণন নিশ্চিত করা গেলে আগামী পাঁচ বছরে এই ক্লাস্টারটি বড় শিল্পে রূপ নেবে।’
প্রান্তিক উদ্যোক্তারা বলছেন, ঋণসহায়তা বা মেলা আয়োজনের মতো প্রচলিত উদ্যোগগুলো অবশ্যই প্রশংসনীয়, তবে তা যথেষ্ট নয়। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের বৈশ্বিক বাজারের সঙ্গে যুক্ত করতে না পারলে এবং কাঁচামাল ও আধুনিক প্রযুক্তির জোগান নিশ্চিত করা না গেলে অঙ্কুরেই থমকে থাকবে দেশের বড় এই উৎপাদনশীল খাত। এর জন্য বিশেষায়িত ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন এবং প্রযুক্তি সহায়তাকেন্দ্র গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।




