জামালপুর পৌর পানি শোধনাগার
মেলেনি এক ফোঁটা পানি ৮ কোটি টাকা জলে
- বিশুদ্ধ পানির চাহিদা পূরণে নেওয়া হয় প্রকল্পটি
- নির্মাণের পাঁচ বছরেও হয়নি চালু
- বেশ কিছু যন্ত্রাংশে পড়েছে মরিচা

চালু হয়নি সাড়ে ৮ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত পানি শোধনাগার। ছবি: আগামীর সময়
জামালপুর পৌর শহরের বগাবাঈদ এলাকায় দূর থেকে চোখে পড়ে বিশাল আকৃতির পানির ট্যাংক। দেখে মনে হতে পারে এটি কোনো আধুনিক নগরসেবার প্রতীক, যা প্রতিদিন হাজারো মানুষের বিশুদ্ধ পানির চাহিদা পূরণ করছে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। ট্যাংকের নিচে তালাবদ্ধ স্থাপনা, ভেতরে ধুলায় ঢাকা যন্ত্রপাতি, কোথাও কোথাও মরিচার দাগ— আর পাঁচ বছর ধরে বন্ধ পড়ে থাকা একটি প্রকল্পের নীরব সাক্ষ্য।
পৌরবাসীর বিশুদ্ধ পানির সংকট নিরসনে প্রায় সাড়ে ৮ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত পানি শোধনাগার চালু হয়নি আজও। ফলে যে প্রকল্প থেকে নাগরিকদের নিরাপদ পানি পাওয়ার কথা ছিল, সেটি এখন স্থানীয়দের কাছে উন্নয়ন পরিকল্পনার কার্যকারিতা ও জবাবদিহি নিয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রকল্পের তথ্য বলছে, শুষ্ক মৌসুমে জামালপুর পৌর এলাকার মানুষের বিশুদ্ধ পানির চাহিদা পূরণের লক্ষ্য নিয়ে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর বাস্তবায়ন করে প্রকল্পটি। এর আওতায় নির্মাণ করা হয় প্রায় ৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে পানি শোধনাগার এবং ৩ কোটি ৪ লাখ টাকা ব্যয়ে ৬৮০ কিউবিক মিটার ধারণক্ষমতার একটি ওভারহেড পানির ট্যাংক।
গোপালগঞ্জের মেসার্স শরিফ অ্যান্ড সন্স নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ২০২১ সালে কাজ শেষ করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে বুঝিয়ে দেয় প্রকল্পটি। কিন্তু এখন পর্যন্ত পৌরবাসী এক ফোঁটা বিশুদ্ধ পানিও পাননি।
শোধনাগারের ভবনে দীর্ঘদিনের অব্যবহারের চিহ্ন স্পষ্ট। কক্ষ জুড়ে ধুলাবালি। বেশ কিছু যন্ত্রাংশে পড়েছে মরিচা। প্রধান যন্ত্রপাতি রয়েছে পলিথিনে মোড়ানো অবস্থায়। প্রকল্প এলাকা রক্ষণাবেক্ষণের অভাবও চোখে পড়ে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় থেকেই ছিল অনিয়ম। নিম্নমানের কাজ এবং দায়িত্বশীলদের গাফিলতির কারণেই এত বড় বিনিয়োগ রূপ নিতে পারেনি কার্যকর সেবায়।
পৌরসভার বগাবাঈদ এলাকার বাসিন্দা মহসিন উদ্দিন বলেছেন, ‘কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত প্রকল্প থেকে পৌরবাসী পায়নি কোনো সুবিধা।’
তার ভাষায়, এত টাকা ব্যয় হলো, কিন্তু আমরা পেলাম না এক ফোঁটা পানিও। তাহলে প্রকল্পের উদ্দেশ্য কী ছিল? বিষয়টি তদন্ত করে জড়িতদের জবাবদিহির আওতায় আনা উচিত বলে মনে করেন তিনি।
জামালপুরে শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট নতুন নয়। অনেক এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় নলকূপে পর্যাপ্ত পানি পাওয়া যায় না। অনেক পরিবারকে প্রতিদিন পানির জন্য যেতে হয় এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়ি। এই বাস্তবতায় বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ প্রকল্পটি মানুষের কাছে বড় আশার প্রতীক ছিল। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে সেটি অচল থাকায় বাড়ছে হতাশা।
অবশ্য পৌরসভার কর্মকর্তারা বলছেন, মূল সমস্যার একটি হলো পাইপলাইন। পৌরসভার নির্বাহী কর্মকর্তা মো. হাফিজুর রহমানের মতে, প্রকল্পে ব্যবহৃত পাইপলাইন নিম্নমানের হওয়ায় পানির চাপ সহ্য করতে পারে না। পানি সরবরাহ শুরু করলে বিভিন্ন স্থানে ফেটে যায় পাইপ। নতুন করে বগাবাঈদ থেকে বিজয় চত্বর হয়ে বিসিক এলাকা পর্যন্ত প্রায় চার কিলোমিটার পাইপলাইন নির্মাণ করা গেলে সমস্যার সমাধান হতে পারে।
নতুন করে চার কিলোমিটার পাইপলাইন নির্মাণ করা গেলে হতে পারে সমস্যার সমাধান।
মো. হাফিজুর রহমান, নির্বাহী কর্মকর্তা, জামালপুর পৌরসভা
‘এ বিষয়ে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের কাছে আবেদন করার পরিকল্পনাও রয়েছে। নতুন সংযোগ স্থাপন করা গেলে পানি সরবরাহ চালু করা সম্ভব’— বলেছেন এই কর্মকর্তা।
তবে পৌরসভার বাসিন্দাদের প্রশ্ন, যদি পাইপলাইনের সক্ষমতা নিয়ে সমস্যা থেকেই থাকে, তাহলে প্রকল্প বাস্তবায়ন ও হস্তান্তরের আগে তা কেন শনাক্ত করা হয়নি? তাদের অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে প্রকল্প বাস্তবায়নের গুণগত মান এবং তদারকির বিষয়টি। প্রকল্পটি চালু না হওয়ার পেছনে কারিগরি সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন পর্যায়ের ব্যর্থতাও রয়েছে— দাবি করেন তারা।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হয় জামালপুর জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মোহাম্মদ জামাল হোসেনের সঙ্গে। তিনি পরে কথা বলবেন বলে জানান। তবে পরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও পাওয়া যায়নি তার বক্তব্য।
দেশের বিভিন্ন এলাকায় অবকাঠামো নির্মাণের পর তা ব্যবহার না হওয়ার অভিযোগ নতুন নয়। তবে জামালপুরের এই প্রকল্পের ক্ষেত্রে প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ, এটি সরাসরি মানুষের মৌলিক চাহিদা— বিশুদ্ধ পানির সঙ্গে সম্পর্কিত।




