আগামীর সময়

পদ্মা ব্যারেজ নিয়ে নতুন সরকারও দোটানায়

পদ্মা ব্যারেজ নিয়ে নতুন সরকারও দোটানায়

পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প নিয়ে দোটানায় নতুন সরকার। সব প্রস্তুতি শেষ হলেও আগামী জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে উপস্থাপন হবে কিনা এখনও অনিশ্চিত। তবে সিদ্ধান্ত নিতে আগামীকাল সোমবার বৈঠকে বসবেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে বৈঠকটি হওয়ার কথা।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানাচ্ছে, প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি ২৫ লাখ টাকা। প্রধানমন্ত্রী ও একনেক চেয়ারপারসন তারেক রহমানের সভাপতিত্বে আগামী ৬ এপ্রিল নতুন সরকারের প্রথম একনেক বৈঠক হবে। নির্বাচনী ইশতেহার এবং গুরুত্বের সঙ্গে মিল থাকলেও কেন প্রকল্পটি একনেকে নেওয়া হচ্ছে না তা প্রশ্নের সৃষ্টি করেছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের উচ্চপদস্ত এক কর্মকর্তা আগামীর সময়কে বলছিলেন, ‘প্রকল্পটি একনেকে উপস্থাপনের জন্য প্রস্তুতি নিতে গত সপ্তাহে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী সম্মতি দিয়েছিলেন। কিন্তু অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আপাতত তালিকায় না রাখতে নির্দেশ দেন। এ অবস্থায় আগামীকাল ডাকা হয়েছে জরুরি পর্যালোচনা বৈঠক।’

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, পদ্মা ব্যারেজ (১ম পর্যায়) প্রকল্পটি প্রস্তাব করেছে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়। একনেকে অনুমোদন পেলে চলতি বছর থেকে শুরু করে ২০৩৩ সালের জুনের মধ্যে এটি বাস্তবায়ন করবে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)।

পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়েছে, শুষ্ক মৌসুমে পদ্মা নদীতে পানি সংরক্ষণ করে পানির প্রবাহ বাড়ানো হবে। এর মাধ্যমে পদ্মা নির্ভর এলাকায় নদী ব্যবস্থা পুনরুজ্জীবিতকরণসহ লবণাক্ততার অনুপ্রবেশ কমানো, সুন্দরবন ইকো-সিস্টেমের ভারসাম্য পুনরুদ্ধার, নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন ও জলাবদ্ধতা কমানো এবং সেচ সুবিধা বাড়ানো হবে।

প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য সম্পর্কে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের (সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাট) পাঁচটি নদী ব্যবস্থা (হিসনা-মাথাভাঙ্গা, গড়াই-মধুমতি, চন্দনা-বারাশিয়া, বড়াল ও ইছামতি) পুনরুজ্জীবনের মাধ্যমে লবণাক্ত পানির অনুপ্রবেশ হ্রাস করে স্বাদু পানির সরবরাহ নিশ্চিত করা। এর মাধ্যমে সুন্দরবনের ইকো-সিস্টেমের প্রাকৃতিক ভারসাম্য পুনঃপ্রতিষ্ঠা হবে। পাশাপাশি জীববৈচিত্র্য ও বনসম্পদ সংরক্ষণ, জলাবদ্ধতা নিরসন এবং নদীগুলো থেকে পলি অপসারণের মাধ্যমে যশোরের ভবদহসহ আশপাশের এলাকার পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়নও এই প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত।

পরিকল্পনা কমিশন সূত্র জানায়, প্রস্তাবিত প্রকল্পটির ওপর গত ১৫ জানুয়ারি প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা হয়েছিল। ওই সভার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) সংশোধন করে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়।

প্রকল্পটির মোট ব্যয় ধরা হয়েছিল ৫০ হাজার ৪৪ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। তবে পুরো প্রকল্পটি এক ধাপে বাস্তবায়ন করলে প্রয়োজনীয় অর্থায়ন নিশ্চিত করা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং তদারকি ও সমন্বয়ের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর ফলে প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব ও ব্যয় বাড়ার ঝুঁকিও বাড়তে পারে।

অন্যদিকে, প্রকল্পে প্রস্তাবিত বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণের পর সংশ্লিষ্ট নদী ব্যবস্থা জলাধার থেকে প্রাপ্ত প্রবাহের সঙ্গে ধীরে ধীরে হাইড্রোলজিক্যাল ও মরফোলজিক্যালভাবে অভিযোজিত হওয়ার কথা। তাই খননসহ সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমগুলো পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়নের সুযোগ রয়েছে।

এসব চিন্তা করে প্রকল্প কার্যক্রম পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে প্রকল্পটি দুই ধাপে বাস্তবায়নের জন্য পিইসি সভায় সুপারিশ করা হয়েছে।

প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রথম পর্যায়ে ব্যারেজের মূল অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি হিসনা-মাথাভাঙ্গা ও গড়াই-মধুমতি নদী ব্যবস্থা পুনঃখননের কাজ সম্পন্ন হবে। দ্বিতীয় পর্যায়ে প্রয়োজনভিত্তিক অতিরিক্ত ও সহায়ক অবকাঠামো নির্মাণ এবং অবশিষ্ট নদী ব্যবস্থা— চন্দনা-বারাশিয়া, বড়াল ও ইছামতি পুনরুদ্ধারের কার্যক্রম অন্তর্ভুক্ত হবে। এছাড়া প্রথম পর্যায়েই মূল ব্যারেজ ও গড়াই অফটেক স্ট্রাকচারে দুটি জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা রাখা হয়েছে, যার মাধ্যমে কোনো জ্বালানি ব্যয় ছাড়াই প্রায় ১১৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হবে।

প্রসঙ্গত, ষাটের দশক থেকেই পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প বাস্তবায়নের বিষয়টি বিবেচনা করছে বাংলাদেশ। ১৯৬০ থেকে ২০০০ সালের মধ্যে অনেকবারই প্রাক-সম্ভাব্যতা সমীক্ষা হয়েছে। পরে ২০০৯ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে বিস্তৃত সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ও প্রকৌশল নকশা প্রণয়ন হয়।

বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট সরকার, আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার, এমনকি সর্বশেষ অন্তর্বর্তী সরকারও প্রকল্পটি নিয়ে দোটানায় ছিল। গত জানুয়ারিতে সাবেক পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ জানিয়েছিলেন, অন্তবর্তী সরকার তাড়াহুড়ো করে পদ্মা ব্যারাজের মতো বড় প্রকল্প অনুমোদন দিতে চায়নি।

    শেয়ার করুন: