নতুন দরপত্রে ‘অনিশ্চয়তা’ বাড়বে মেট্রোর নির্মাণে
- সরকারকে জাপানের চিঠি

ফাইল ছবি
ঢাকার মেট্রোরেল সম্প্রসারণ প্রকল্পে (এমআরটি) বিলম্ব হলে আরও আন্তর্জাতিক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান প্রকল্প থেকে সরে যেতে পারে বলে সতর্ক করেছে জাপান। প্রকল্পটির ক্রয়প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোকে আশ্বস্ত করতে সরকারের জরুরি হস্তক্ষেপ চেয়েছেন ঢাকায় নিযুক্ত জাপানের রাষ্ট্রদূত সাইদা শিনিচি। গত বুধবার সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলমের কাছে পাঠানো চিঠিতে এ আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
প্রায় দেড় বছর স্থবির থাকার পর নতুন সরকারের অধীনে ঢাকা এমআরটি প্রকল্পের অগ্রগতি আবার শুরু হওয়াকে স্বাগত জানিয়েছে জাপান। একই সঙ্গে ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের (ডিএমটিসিএল) সাম্প্রতিক উদ্যোগে দরদাতাদের জন্য চুক্তি স্বাক্ষরের সম্ভাব্য সময়সূচি নির্ধারণের চেষ্টাকেও ইতিবাচক হিসেবে দেখছে দেশটি। তবে বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতি, বিশেষ করে জাপানি কোম্পানিগুলোর ওপর বাড়তে থাকা চাপ বিবেচনায় নিয়ে প্রকল্পের ক্রয়প্রক্রিয়া দ্রুত এগিয়ে নেওয়া জরুরি— সতর্ক করলেন রাষ্ট্রদূত।
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, প্রকল্পটির দর-কষাকষির অধিকাংশ আলোচনা এখনো পরিচালিত হচ্ছে ২০১৯ সালের উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) অনুযায়ী। কিন্তু গত ছয় বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে নির্মাণসামগ্রীর দাম। এর সঙ্গে চলতি বছরে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার কারণে নতুন করে সৃষ্টি হয়েছে মূল্যচাপ। এ কারণে দরদাতাদের মধ্যে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।
রাষ্ট্রদূত জানিয়েছেন, এরই মধ্যে একটি কোম্পানি প্রকল্প থেকে সরে দাঁড়িয়েছে। পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে গুরুত্বের সঙ্গে ভাবছে আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। বিশেষ করে জুনের মাঝামাঝি তাদের বিড বন্ডের মেয়াদ শেষ হলে আরও জটিল হতে পারে পরিস্থিতি। এ অবস্থায় সংশ্লিষ্ট সব কোম্পানিকে আশ্বস্ত করতে দ্রুত গ্রহণপত্র (লেটার অব অ্যাকসেপ্টেন্স) ইস্যু কিংবা পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে চুক্তি সম্পন্নের দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখাতে হবে।
চিঠিতে আরও বলা হয়, দেরি হতে থাকলে শুধু মূল ঠিকাদার নয়, তাদের উপঠিকাদার (সাব-কন্ট্রাক্টর) ও সরবরাহকারীরাও ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। বর্তমান ব্যয় ও সরবরাহ পরিস্থিতি ধরে রাখা তাদের জন্য দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে। জাপানের রাষ্ট্রদূত বলেছেন, ভবিষ্যতে ব্যয় আরও বাড়ার আশঙ্কা এবং বিদ্যমান ডিপিপির আওতায় আবার দরপত্র আহ্বান করা হলে যে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হবে, তা বিবেচনায় দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়াই উভয় পক্ষের জন্য যৌক্তিক ও লাভজনক। এতে প্রকল্পটি নতুন করে কোনো প্রতিষ্ঠান সরে যাওয়া ছাড়াই এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।
জাপান শুধু সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীকেই নয়, বরং প্রকল্পের অর্থায়ন, কূটনৈতিক সম্পর্ক, প্রশাসনিক সমন্বয় এবং বাস্তবায়নের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত সব গুরুত্বপূর্ণ পক্ষকে দিয়েছে একই বার্তা। অর্থাৎ, মেট্রোরেল প্রকল্পের ক্রয়প্রক্রিয়া দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে এটি ছিল সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে সমন্বিত চাপ ও উদ্বেগ প্রকাশের একটি কূটনৈতিক উদ্যোগ।
চিঠিটি পররাষ্ট্রমন্ত্রী, অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী, স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিব, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব, ডিএমটিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং জাইকা বাংলাদেশ অফিসের প্রধান প্রতিনিধিকেও পাঠানো হয়েছে।
চিঠির জবাবের বিষয়ে জানতে ডিএমটিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাওগাতুল আলমকে কয়েকবার কল দিলেও তিনি রিসিভ করেননি। একই উপায়ে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব মোহাম্মদ জিয়াউল হকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে সাড়া দেননি তিনিও।
জাইকা ঢাকার মেট্রোরেল উন্নয়নের প্রধান উন্নয়ন অংশীদার। রাজধানীর গণপরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নে এমআরটি লাইন-১ এবং এমআরটি লাইন-৫সহ বেশ কয়েকটি প্রকল্পে অর্থায়ন রয়েছে এই সংস্থার।
তবে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেড় বছর ধরে এসব প্রকল্পের ক্রয় ও চুক্তিপ্রক্রিয়া কার্যত স্থবির। সম্প্রতি জাপানের অন্যতম বৃহৎ নির্মাণপ্রতিষ্ঠান কাজিমা করপোরেশন সময়ক্ষেপণ ও বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার কারণ দেখিয়ে একটি বড় প্যাকেজের দরপ্রক্রিয়া থেকে সরে দাঁড়ায়। এরপরই অন্য বিদেশি দরদাতাদের অংশগ্রহণ নিয়েও সৃষ্টি হয় উদ্বেগ।
প্রকল্প বাস্তবায়নে দেরি হওয়ার নেতিবাচক প্রভাব জানতে চাইলে গণপরিবহন বিশেষজ্ঞ বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক মোয়াজ্জেম হোসেন জানালেন, মেট্রোরেল ঢাকার বেহাল গণপরিবহনের আশীর্বাদ। মেট্রোর কাজে হেলাফেলা করা উচিত হচ্ছে না। যত দ্রুত কাজ শুরু করা যাবে, ততই মঙ্গল। প্রকল্পটিতে আরও বিলম্ব হলে ব্যয় বাড়তে পারে একশ শতাংশ পর্যন্ত।




