ঢাকায় ওসিকে কোপ, লালমনিরহাটে এসপি ডিসির গাড়িতে হামলা

লালমনিরহাটের আদিতমারীতে শিশুহত্যার জেরে আক্রান্ত প্রশাসন। ছবি: আগামীর সময়
লালমনিরহাটের আদিতমারীতে এক শিশুকে হত্যার ঘটনা থেকে সৃষ্ট বিক্ষোভ ও সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ওসিসহ অন্তত ২০ জন। একই সঙ্গে জেলা প্রশাসকের গাড়িসহ অন্তত সাতটি গাড়ি ভাঙচুর করেছে বিক্ষুব্ধ জনতা। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে আদিতমারী উপজেলার ভেলাবাড়ি ইউনিয়নের ফলিমারী গ্রামে ঘটে এসব ঘটনা। একই দিন বিকালে ঢাকার মোহাম্মদপুরে এক বিকাশ এজেন্টকে কুপিয়ে টাকা লুটের মামলার আসামিদের ধরতে গেলে পুলিশের ওপর চালানো হয় হামলা। এতে দুর্বৃত্তদের চাপাতির কোপে আহত হয়েছেন আদাবর থানার ওসিসহ দুই কর্মকর্তা।
ফলিমারী গ্রাম রণক্ষেত্র হওয়ার ঘটনার শুরু গত সোমবার বিকালে। তখন থেকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না নন্দিনী নামে সাত বছরের এক শিশুকে। গতকাল মঙ্গলবার সকালে বাড়ির পাশের একটি ভুট্টাক্ষেতের নরম মাটি পরিবারের সদস্যদের সন্দেহ হয়। মাটি খুঁড়ে শিশুটির বস্তাবন্দি মরদেহ উদ্ধার করেন স্থানীয়রা। খবর পেয়ে পুলিশ গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে লালমনিরহাট সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠায়।
স্থানীয় একজন জানিয়েছেন, সোমবার সন্ধ্যায় বিধান চন্দ্র রায় (২২) নামে এক যুবককে ওই ভুট্টাক্ষেত থেকে কোদাল নিয়ে ফিরতে দেখেছিলেন তিনি। সেই সন্দেহে তার বাড়িতে যায় বিক্ষুব্ধ জনতা। তারা ওই বাড়ি ভাঙচুর করে এবং বিধানকে আটক করে। ঘটনাস্থলে থাকা পুলিশ বিধানকে হেফাজতে নেয়। কিন্তু স্থানীয়রা বিধানকে ছিনিয়ে নিয়ে নিজেরাই বিচার করার দাবি করতে থাকে। বিধানসহ পুলিশকে অবরুদ্ধ করে রাখে। এতে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন লালমনিরহাটের পুলিশ সুপার আসাদুজ্জামান এবং ঘটনাস্থলে যাওয়া ক্রাইম সিন ইউনিটের সদস্যরাও। একে একে সদর থানা, কালীগঞ্জ থানা, ডিবি থানা পুলিশ, ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ঘটনাস্থলে গিয়ে তাদের উদ্ধারের চেষ্টা করে। বিক্ষুব্ধ জনতা তাদেরও অবরুদ্ধ করলে গোটা গ্রামই পরিণত হয় রণক্ষেত্রে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে ফলিমারী যান জেলা প্রশাসক রাশেদুল হক প্রধান, বিজিবি ১৫ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মেহেদী ইমামসহ জেলা-উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা। একপর্যায়ে তাদেরও অবরুদ্ধ করা হয়। এ সময় থেমে থেমে প্রশাসনের ওপর হামলা চালায় বিক্ষুব্ধ জনতা।
অবশেষে সাউন্ড গ্রেনেড ছুড়ে জনতাকে ছত্রভঙ্গ করে অভিযুক্ত বিধান ও তার বাবাকে নিয়ে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে প্রশাসনের লোকজন। শেষ সময়েও প্রশাসনের গাড়ি লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছোড়া হয়। এতে আদিতমারী থানার ওসি নাজমুল হকসহ ২০ জন আহত হন। আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে গোটা এলাকায়।
লালমনিরহাটের পুলিশ সুপার আসাদুজ্জামান জানালেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ছুড়তে হয়েছে তিন রাউন্ড সাউন্ড গ্রেনেড। বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। ভাঙচুর করা হয়েছে বেশ কয়েকটি গাড়িও। এ ঘটনায় ওসিকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। এ ছাড়া নন্দিনী হত্যার ঘটনায় মামলা এবং অভিযুক্ত বিধান চন্দ্র ও তার বাবাকে আটক করা হয়েছে বলেও জানালেন তিনি। সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার ঘটনা তদন্তে জেলা পুলিশ ও জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে তিন সদস্যবিশিষ্ট আলাদা দুটি কমিটি গঠনের কথাও জানালেন পুলিশ সুপার। এ বিষয়ে মামলা হবে, সেটাও বললেন।
অন্যদিকে গতকাল সকালে আদাবরের শেখেরটেক ৭ নম্বর সড়কের মাথায় এক বিকাশ এজেন্টকে কুপিয়ে সাড়ে ৩ লাখ টাকা লুট করেছে ছিনতাইকারীরা। বিকালে এ ঘটনায় জড়িতদের ধরতে ঢাকা উদ্যান এলাকায় অভিযান চালায় পুলিশ। তখন পুলিশের ওপর চাপাতি দিয়ে হামলা করে সন্ত্রাসীরা। এতে আহত হন আদাবর থানার ওসি জাহিদুল ইসলাম ও এসআই তরুণ।
ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার (এডিসি) ফজলুর রহমান আগামীর সময়কে বললেন, ‘অভিযানে গিয়ে ঢাকা উদ্যানের কাছে আমাদের একটি দল আক্রান্ত হয়। আসামিরা পুলিশ দেখে ওসি ও একজন এসআইয়ের ওপর হামলা চালায়। এ সময় পুলিশের পাল্টা গুলিতে একজন গুলিবিদ্ধ হয়। এ ঘটনায় চারজনকে আটক করেছে পুলিশ।’
তারা হলেন আমির (কানা আমির হিসেবে পরিচিত), রুবেল (চোরা রুবেল হিসেবে পরিচিত), আরিফ হোসেন জয় ও আবুল কাসেম। তাদের মধ্যে আমির গুলিবিদ্ধ হয়েছেন।
ঘটনার বর্ণনা দিয়ে একই বিভাগের এডিসি জুয়েল রানা জানিয়েছেন, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে তারা জানতে পারেন এই ছিনতাইয়ের সঙ্গে মোহাম্মদপুরের ‘কবজি কাটা আনোয়ার’ গ্রুপের সদস্যরা জড়িত। তাদের ধরতে আদাবর থানার ওসির নেতৃত্বে একটি দল ঢাকা উদ্যানে গেলে তাদের ওপর হামলা চালানো হয়। পরে পুলিশও পাল্টা গুলি চালায় এবং চারজনকে আটক করে।




