১৭ বছরের অপেক্ষা শেষে চাকরি, ছয় মাসেও নেই বেতন
- বঞ্চিত ২৭তম বিসিএসের কর্মকর্তারা নিয়োগ হলেও বেতন নেই

সংগৃহীত ছবি
দীর্ঘ ১৭ বছরের আইনি লড়াই, অনিশ্চয়তা, হতাশা আর অপেক্ষার প্রহর গুনে অবশেষে সরকারি চাকরিতে যোগ দিয়েছেন ২৭তম বিসিএসের বঞ্চিত কর্মকর্তারা। সুপ্রিম কোর্টের আদেশে সেই সোনার হরিণ চাকরি মিললেও সামনে এসেছে নতুন সংকট। আদালতের নির্দেশনায় জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণ হলেও যোগদানের ছয় মাস পরও বেতন পাননি অনেকেই।
ফলে সংসার চালাতে হিমশিম খাওয়া অনেক কর্মকর্তা ধার-দেনা করছেন, কেউ নিয়েছেন ঋণ। চাকরি পাওয়ার আনন্দকে ছাপিয়ে এখন তাদের বড় উদ্বেগ হয়ে দাঁড়িয়েছে বেতন-ভাতা প্রাপ্তির অনিশ্চয়তা।
২০০৭ সালে ওয়ান-ইলেভেন সরকারের সময় ২৭তম বিসিএস বাতিল করা হয়। ওই বিসিএসে প্রথম মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন ১ হাজর ১৩৭ জন। সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সংক্ষুব্ধরা আদালতে মামলা করলেও রাজনৈতিক কারণে রায় হয়নি।
২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর উচ্চ আদালত ওই চাকরিপ্রত্যাশীদের নিয়োগ দেওয়ার নির্দেশ দেন। কিন্তু নানা জটিলতা দেখিয়ে তাদের বেতন-ভাতা ছাড় করছে না সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়। দীর্ঘদিনের আইনি লড়াইয়ে বঞ্চিত প্রার্থীরা এটিকে ঐতিহাসিক বিজয় হিসেবে দেখলেও এখন তাদের চোখে-মুখে অন্ধকার।
আদালতের নির্দেশনা বাস্তবায়নে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ২০২৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর প্রথম ধাপে ৬৭৩ জন প্রার্থীকে বিভিন্ন ক্যাডার পদে নিয়োগ দিয়ে গেজেট প্রকাশ করে। পরবর্তীতে ২০২৬ সালের মে মাসে আরও ৯৬ জনকে বিভিন্ন ক্যাডারে নিয়োগ দিয়ে পৃথক প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। ধাপে ধাপে নিয়োগপ্রাপ্ত এসব কর্মকর্তা ইতোমধ্যে নিজ নিজ কর্মস্থলে যোগদান করেছেন। তাদের অনেকেই দীর্ঘদিন অন্য ক্যাডার ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেছেন।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব আবু নাঈম আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘অল্পদিন হলো আমি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যোগদান করেছি। বিষয়টি সম্পর্কে আমি অবগত নই। এর বাইরে বর্তমানে আমি দেশের বাইরে আছি।’
আগামী রবিবার বিষয়টি তাকে মনে করিয়ে দেওয়ার অনুরোধ করেন তিনি।
আদালতের নির্দেশে শুধু নিয়োগই নয়, তাদের জ্যেষ্ঠতার বিষয়টিও সরকার বিবেচনায় নিয়েছে। সম্প্রতি জারি করা প্রজ্ঞাপনে তাদের জ্যেষ্ঠতা মূল ব্যাচের নিয়োগকাল থেকে কার্যকর হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। ফলে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে তারা যাতে বঞ্চিত না হন। সে বিষয়েও ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। কিন্তু নিয়োগ ও জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণের পরও বেতন-ভাতার বিষয়টি ঝুলে আছে।
কর্মকর্তাদের অভিযোগ, যোগদানের পর নিয়মিত দায়িত্ব পালন করলেও এখনও তাদের বেতন ছাড় হয়নি। বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় প্রায় চার মাস আগে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে প্রয়োজনীয় স্পষ্টীকরণ চেয়ে প্রস্তাব পাঠায়। পরে চলতি বছরের এপ্রিল মাসে অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রবিধি শাখা থেকে নথিটি বাস্তবায়ন শাখায় পাঠানো হয়। কিন্তু এরপর থেকে ফাইলটির অগ্রগতি কার্যত থেমে আছে।
সারদায় পুলিশ একাডেমিতে প্রশিক্ষণরত এক ভুক্তভোগী কর্মকর্তা বলেছেন, ‘দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর চাকরি পাওয়ার আনন্দ খুব বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। চাকরিতে যোগদানের পর নতুন কর্মস্থলে বাসাভাড়া, যাতায়াত, সন্তানদের পড়াশোনা ও পারিবারিক ব্যয় মেটাতে গিয়ে আমাদের অনেকেই ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন। কেউ কেউ আত্মীয়-স্বজনের কাছ থেকে ধার করে সংসার চালাচ্ছেন।’
লোক প্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (বিপিএটিসি), সাভারে প্রশিক্ষণরত প্রশাসন ক্যাডারের একজন কর্মকর্তা জানান, সরকার আমাদের জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণ করেছে, চাকরিও দিয়েছে। কিন্তু বেতন ছাড়া একজন কর্মকর্তা কীভাবে স্বাভাবিকভাবে দায়িত্ব পালন করবেন, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, বিষয়টি শুধু প্রশাসনিক জটিলতা নয়, মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্রের দায়িত্ব পালনের জন্য যোগদান করা কর্মকর্তাদের দীর্ঘ সময় বেতনবিহীন রাখা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
ভুক্তভোগী একাধিক কর্মকর্তা জানান, গত ৫ আগস্টের পর ২৮তম থেকে ৪২তম বিসিএসের নিয়োগবঞ্চিতদের ক্ষেত্রেও অনুরূপ একটি জটিলতা সৃষ্টি হয়েছিল। তবে সে সময় মাত্র দুই মাসের মধ্যেই প্রয়োজনীয় স্পষ্টীকরণ দিয়ে সমস্যার সমাধান করা হয়। ফলে ২৭তম বিসিএসের ক্ষেত্রে একই ধরনের বিষয়ে এত দীর্ঘসূত্রতা কেন, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।





