বেনজীরকে দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া কেমন হবে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
আরও একবার টক অব দ্য টাউন পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজি) বেনজীর আহমেদ। ইন্টারপোলের সহযোগিতায় তাকে গ্রেপ্তার করেছে দুবাই পুলিশ। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলা আছে তার বিরুদ্ধে। অবৈধ সম্পদ অর্জন ও অর্থ পাচারের অভিযোগে একাধিক মামলা করেছিল সংস্থাটি।
এসব অভিযোগের তদন্তের অংশ হিসেবেই পদক্ষেপ নেওয়া হলো বেনজীরের বিরুদ্ধে। কিন্তু তার গ্রেপ্তারের পর থেকেই কূটনৈতিক মহলে আলোচনা, বেনজীরকে দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া কেমন হবে?
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্ভরযোগ্য সূত্র বলছে, বেনজীরকে দ্রুত দেশে ফিরিয়ে এনে আদালতে সোপর্দ করার জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং পুলিশ সদর দপ্তর যৌথভাবে কাজ করছে। বর্তমানে দুবাইয়ের বাংলাদেশ দূতাবাস এ বিষয়ে আমিরাতের সরকারের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছে।
আইন কী বলছে
২০১৪ সালের ২৭ অক্টোবর আমিরাতের সঙ্গে বন্দি বিনিময়সহ তিনটি চুক্তি করে তৎকালীন সরকার। এর মধ্যে দুটি ছিল ‘দণ্ডিত বন্দি বিনিময়’ এবং ‘নিরাপত্তা সহযোগিতা’ সংক্রান্ত চুক্তি।
এই দ্বিপক্ষীয় চুক্তির আইনি কাঠামোর আওতায় বেনজীরকে ফেরত আনা সম্ভব হতে পারে, এমনটাই মনে করছেন বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ।
তারা বলেছেন, আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় কোনো অপরাধী পালিয়ে গেলেও আইনের হাত থেকে মুক্তি পেতে পারে না।
দণ্ডবিধি ১৮৬০-এর ২ ও ৩ ধারা অনুযায়ী, দেশের অভ্যন্তরে বা বিদেশে যেকোনো স্থানে অপরাধ সংঘটনকারী ব্যক্তির বিচার বাংলাদেশের প্রচলিত আইনেই সম্ভব। বিশ্বব্যাপী অপরাধীদের নিজ দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের জন্য কার্যকর রয়েছে বন্দি প্রত্যর্পণ আইন।
বাংলাদেশের বন্দি প্রত্যর্পণ আইন ১৯৭৪-এর ৩ ধারা অনুযায়ী, কোনো দেশের সঙ্গে চুক্তি থাকলে সরকার প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে তাকে চুক্তিভুক্ত রাষ্ট্র ঘোষণা করতে পারে। বর্তমানে ভারতের পাশাপাশি থাইল্যান্ডের সঙ্গে বাংলাদেশের সরাসরি বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তি আছে।
তবে আমিরাতের সঙ্গে যদি সরাসরি পূর্ণাঙ্গ প্রত্যর্পণ চুক্তি না থাকলেও ১৯৭৪ সালের আইনের ৪ ধারা অনুযায়ী, সরকার বিশেষ প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে চুক্তিবিহীন রাষ্ট্রের অপরাধীকেও দেশে ফিরিয়ে আনা বা হস্তান্তরের আইনিব্যবস্থা নিতে পারে।
আরও বিকল্প
আন্তঃরাষ্ট্রীয় অপরাধী প্রত্যর্পণের ক্ষেত্রে অনুসরণ করতে হয় আন্তর্জাতিক আইনের কিছু নির্দিষ্ট শর্ত। প্রথমত, অভিযুক্তের অপরাধটি উভয় দেশের আইনেই অপরাধ হিসেবে গণ্য হতে হয়। দ্বিতীয়ত, অপরাধীকে শুধু সেই নির্দিষ্ট অপরাধের জন্যই বিচার করা যাবে, যার জন্য তাকে প্রত্যর্পণ করা হয়েছে।
তবে কোনো অপরাধী যদি রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থী হন এবং প্রমাণ করতে পারেন তাকে রাজনৈতিক মামলায় জড়ানো হয়েছে, সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্র তাকে ফেরত দিতে বাধ্য থাকে না।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর অনেকেই বিভিন্ন দেশে পালিয়ে আশ্রয় নেন। বেনজীরের বিরুদ্ধে আনা আর্থিক দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের সুনির্দিষ্ট অভিযোগগুলো রাজনৈতিক আশ্রয়ের আওতায় পড়ে না, এটাও মনে করিয়ে দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
আবার আন্তর্জাতিক অপরাধ দমনে চুক্তিহীন বা আংশিক চুক্তিভুক্ত রাষ্ট্রগুলোর মধ্যেও থাকে বন্দি বিনিময়ের একাধিক বিকল্প আইনি পথ। ইন্টারপোলের মাধ্যমে জারি করা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কার্যকর করে এবং দুই দেশের পারস্পরিক আইনি সহায়তা চুক্তির আওতায় অপরাধীকে নিজ দেশে ফেরত আনা যায়।
তা ছাড়া বাংলাদেশ ও আমিরাতের কূটনৈতিক সম্পর্ক সুদীর্ঘ ও বন্ধুত্বপূর্ণ। এর ওপর ভিত্তি করে বিশেষ সরকারি সমঝোতার মাধ্যমেও বেনজীরকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো সম্ভব। তাই তার দ্রুত দেশে ফেরা এবং বিচারের মুখোমুখি হওয়া নির্ভর করছে বিএনপি সরকারের উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক তৎপরতা এবং স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত পদক্ষেপের ওপর।




