বিদেশে হেনস্তার বিচার কতটা সম্ভব
- দূতাবাসগুলোর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
- বিচার সম্ভব দেশে ও বিদেশে

সংগৃহীত ছবি
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পক্ষে অবস্থান নেওয়া বাংলাদেশি রাজনৈতিক নেতা ও সাংস্কৃতিক কর্মীরা হেনস্তার মুখে পড়ার বেশ কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে বিদেশের মাটিতে। দেশের বাইরে সংঘটিত হওয়ায় এসবে জড়িত হিসেবে যাদের নাম এসেছে, তাদের সরাসরি আইনের আওতায় এনে বিচার করার কাজটিও কঠিন। ফলে অধিকাংশ ঘটনাই থেকে যাচ্ছে প্রতিকারহীন। এতে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হচ্ছে বলে মনে করছেন আইনজ্ঞরা।
তাদের ভাষ্য, দূতাবাসগুলো হেনস্তার এসব ঘটনা রোধ বা প্রতিকারে যথাযথ ভূমিকা পালনে ব্যর্থ হচ্ছে। আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ আছে দেশি-বিদেশি আইনে। কিন্তু এসব বিষয়ে সরকার কী ভূমিকা গ্রহণ করছে, তা স্পষ্ট নয়।
গত সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের জন এফ কেনেডি বিমানবন্দরে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে হেনস্তার ঘটনা ঘটে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, অধ্যাপক ইউনূসের দিকে তেড়ে গিয়ে কয়েকজন লোক উচ্চ স্বরে স্লোগান দিচ্ছেন। এ সময় তাকে উদ্দেশ্য করে ‘ইউ আর আ টেররিস্ট’ এবং ‘হোয়াই ইউ কাম হেয়ার’ বলে চিৎকার করতে শোনা যায়। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কয়েকজন প্রবাসী কর্মী ও সমর্থকের বিরুদ্ধে তাকে হেনস্তার অভিযোগ উঠেছে।
এর আগে ২০২৫ সালে জাতিসংঘের ৮০তম অধিবেশনে যোগ দিতে যুক্তরাষ্ট্রে গেলে নিউ ইয়র্কের জন এফ কেনেডি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হেনস্তা করা হয় জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্য সচিব আখতার হোসেনকে। তাকে লক্ষ্য করে ছোড়া হয় ডিম। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা মিজানুর রহমানকে ডিম ছুড়তে দেখা গেছে।
২০২৪ সালের নভেম্বরে সুইজারল্যান্ডের জেনেভা বিমানবন্দরে তৎকালীন আইন, বিচার ও প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুলকে হেনস্তার ঘটনা ঘটে। এ ছাড়া চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে ইতালিতে হামলা ও হেনস্তার শিকার হন অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধন। তাকে পানি, কোমলপানীয় ও ডিম ছুড়ে মারা হয়, শারীরিকভাবেও করা হয় লাঞ্ছিত। হামলার পর স্থানীয় থানায় অভিযোগ করেন তিনি।
বাঁধনের অভিযোগ, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার আন্দোলনে তার সক্রিয় ভূমিকার কারণেই তাকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়। হামলাকারীদের কয়েকজন নিজেদের আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের (নিষিদ্ধ) কর্মী এবং ‘বঙ্গবন্ধুর সৈনিক’ হিসেবে পরিচয় দেন বলে ভাষ্য বাঁধনের।
দেশের বাইরে হওয়া এসব ঘটনায় জড়িত হিসেবে যাদের নাম এসেছে, তারা সহজেই পার পেয়ে যাচ্ছেন। যারা বিদেশে বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নেন, তারা মূলত স্বল্প সময়ের জন্য গিয়ে থাকেন। কিন্তু এসব হেনস্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গেলে যে আর্থিক ও সময়ের প্রস্তুতির প্রয়োজন, তা অনেক ক্ষেত্রেই থাকে না। এতে পার পেয়ে যাচ্ছেন অভিযুক্তরা। ফলে ঘটছে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি।
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ আগামীর সময়কে বললেন, ‘ক্রিমিনাল অফেন্সের সাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো— যেখানে অপরাধ সংঘটিত হবে, সেই টেরিটরির আইনি কাঠামোয় বিচার হবে। ফলে যদি কেউ মনে করেন যে, তাকে দেশের বাইরে কেউ হেনস্তা করেছে, তবে যেখানে ঘটনা ঘটবে সেই দেশের আইন অনুসারে তার বিচার হবে। তবে বাংলাদেশি কোনো নাগরিক যদি বিদেশে কোনো ফৌজদারি অপরাধ করে, সেক্ষেত্রে বাংলাদেশে এর বিচারের সুযোগ রেখেছে বাংলাদেশের পেনাল কোড।’
এই আইনজীবীর মতে, একই অপরাধে দুবার বা দুই জায়গায় বিচার হতে পারে না। তবে কোনো বাংলাদেশি যদি অন্য দেশে অপরাধ করে এবং সেখানে কোনো বিচার না হয়, সেক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকারও ব্যবস্থা নিতে পারবে, পেনাল কোডে এমন সুযোগ রাখা হয়েছে।
‘বিদেশে বিচারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকারের বেশি কিছু করার থাকে না। তারা ল ফার্ম নিয়োগ দিতে পারে বা সংশ্লিষ্ট দেশের সরকারের কাছে দ্রুত ও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ জানাতে পারে’— যোগ করলেন মনজিল মোরসেদ।
সুপ্রিম কোর্টের আরেক জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ব্যারিস্টার ওমর ফারুক আগামীর সময়কে বলছিলেন, ‘দূতাবাসগুলোকে যথাযথ ভূমিকা গ্রহণ করতে হবে। দূতাবাস বাদী হয়ে মামলা করবে। বাংলাদেশি নাগরিক হলে অভিযুক্তকে ধরে দেশে আনতে হবে এবং বিচারের মুখোমুখি করতে হবে। বাংলাদেশি নাগরিকত্ব না থাকলে সংশ্লিষ্ট দেশের আইনে বিচার হবে। তাতে আরও কঠোর শাস্তি হবে।’
তবে দূতাবাসগুলো যথাযথ ভূমিকা গ্রহণ করছে না বলে মনে করেন এই আইনজীবী। বললেন, ‘সরকার বারবার ব্যবস্থা গ্রহণ করার কথা বললেও তারা এখন পর্যন্ত কী পদক্ষেপ নিয়েছে, তা স্পষ্ট নয়। তিনি জানিয়েছেন, এসব ঘটনা স্থায়ীভাবে বন্ধ করতে হবে। আওয়ামী লীগের (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) সময় বিএনপি, আর বিএনপির সময় আওয়ামী লীগ এমন করবে, তাতে দেশের ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষুণ্ন হচ্ছে। এতে বিদেশি বিনিয়োগ কমে যাবে।’
অধ্যাপক ইউনূসকে হেনস্তার ঘটনায় আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান। ইতালিতে অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধন হেনস্তার শিকার হওয়ার পর যে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল, এক্ষেত্রেও তা-ই করা হবে বলে জানিয়েছেন তিনি। গত মঙ্গলবার সচিবালয়ে সরকারের কার্যক্রম জানাতে আয়োজিত নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকরা অধ্যাপক ইউনূসকে হেনস্তার অভিযোগ নিয়ে প্রশ্ন করলে জাহেদ উর রহমান এসব কথা বলেন।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে তথ্য উপদেষ্টা বললেন, ‘অবশ্যই এ অপরাধ যারা করছেন, আমাদের অভিনেত্রী (আজমেরী হক বাঁধন) যে হেনস্তার শিকার হয়েছিলেন, তার পর থেকে যে লিগ্যাল প্রসেস শুরু হয়েছে, আমি সেটার ব্যাপারে জানি। সুতরাং এক্ষেত্রেও এটা হবে। বিদেশে বিভিন্ন জায়গায় থাকা আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীদের বলতে চাই, তারা যদি এ ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা করে, এটা আনচ্যালেঞ্জ যাবে না, প্রশ্নই আসে না।’
বিদেশে কোনো নাগরিক সমস্যায় আক্রান্ত হলে বা কোনো ফৌজদারি আক্রমণের শিকার হলে তাকে সহায়তা করতে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়, সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু বলতে পারেননি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের লিগ্যাল অ্যাফেয়ার্স অনুবিভাগের মহাপরিচালক ড. মো. জাকেরুল আবেদীন। আগামীর সময়কে তিনি বলেছেন, ‘সাধারণত মন্ত্রণালয়গুলোর সঙ্গে লিগ্যাল সার্ভিস প্রোভাইড করার জন্য অনেক সময় ল ফার্ম জড়িত থাকে। সেক্ষেত্রে ল ফার্মের সহযোগিতা নেওয়া হয়।’






