টিকার কাভারেজে ফাঁকফোকর

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
কাগজে-কলমে সরকারের টিকাদান কর্মসূচি ছাড়িয়েছে লক্ষ্যমাত্রা। তবে বাস্তব চিত্র বেশ উদ্বেগজনক। দেশের দুর্গম অঞ্চলগুলোয় বাড়ছে হাম সংক্রমণের ঝুঁকি। বিশেষ করে সুনামগঞ্জ ও মৌলভীবাজারে শিশু মৃত্যুর হার, হামের পরিস্থিতি নিয়ে নতুনভাবে সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে। বেহাল যোগাযোগব্যবস্থা ও নাজুক স্বাস্থ্যসেবার কারণে দেখা দিয়েছে এই সংকট। জনস্বাস্থ্যবিদরা বলছেন, গড় হিসাবের ফাঁকফোকরে টিকার বাইরে রয়ে গেছে বহু শিশু। মহামারী রুখতে এখন ঘরে ঘরে গিয়ে টিকা দেওয়া জরুরি।
পাহাড়ি অঞ্চল, নদীভাঙনকবলিত চর, উপকূলীয় দ্বীপ ও হাওরাঞ্চল মূলত রয়েছে ঝুঁকিতে। সুনামগঞ্জের বড় অংশ জুড়ে হাওর। যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম নৌকা। খরচ ও সচেতনতার অভাবে দরিদ্র অভিভাবকরা শিশুদের নিতে চান না কেন্দ্রে। মৌলভীবাজারের চা বাগান শ্রমিকদের আয় অত্যন্ত কম। সেখানকার স্বাস্থ্যসেবাব্যবস্থাও নাজুক। এমন প্রেক্ষাপটে হাম নির্মূলে প্রয়োজনে স্পিডবোট বা হেলিকপ্টার ব্যবহার করে বাড়ি বাড়ি টিকা পৌঁছানোর তাগিদ জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের।
সরকারের হিসাব বলছে, লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি শিশুকে দেওয়া হয়েছে হামের টিকা। তবে নির্ধারিত বয়সসীমার বাইরেও শিশুদের দেওয়া হয়েছে টিকা। লক্ষ্যমাত্রা কম রাখায় এবং বয়সজনিত শিথিলতার জন্য এমন সফলতা দেখা যাচ্ছে বলে মনে করছেন জনস্বাস্থ্যবিদের অনেকেই। সম্প্রতি সুনামগঞ্জ ও মৌলভীবাজারের মতো ‘হার্ড টু রিচ এরিয়া’য় হামে শিশুমৃত্যুর ঘটনা নতুন সংকট তৈরি করতে পারে— এমন শঙ্কা তাদের।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মুশতাক হোসেন আগামীর সময়কে বললেন, টিকা ক্যাম্পেইনকে শতভাগ সফল করতে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণে আমলে নিতে হবে আরও কিছু সূচক। টিকা দিতে হবে ঘরে ঘরে গিয়ে। দুর্গম হাওর এলাকায় যেতে হবে স্পিডবোট নিয়ে। দরকার হলে হেলিকপ্টার ব্যবহার করতে হবে। এ ছাড়া সম্ভব হবে না হাম নির্মূল।
হামের প্রাদুর্ভাবের পর সরকার দেশের ১৮টি জেলার ঝুঁকিপূর্ণ উপজেলায় গত ৫ এপ্রিল টিকা দেওয়া শুরু করে। এরপর সারা দেশে টিকার ক্যাম্পেইন শুরু হয় ২০ এপ্রিল, যা চলমান আছে। সরকারের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ কোটি ৮০ লাখ ১৫ হাজার ৬৪ শিশুকে হামের টিকার আওতায় নিয়ে আসা। গত রবিবার পর্যন্ত ১ কোটি ৮২ লাখ ২৩ হাজার ৪৪৫ শিশুকে দেওয়া হয়েছে টিকা। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার বেশি শিশু পেয়েছে টিকা।
স্বাভাবিক সময়ে টিকার প্রথম ডোজ ৯ মাসে দেওয়া হতো। হামের প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে টিকা দেওয়ার নির্ধারিত নতুন বয়স ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর। কিন্তু ছয় বছর বয়স পর্যন্ত শিশুদের দেওয়া হয়েছে টিকা।
টিকার লক্ষ্যমাত্রা কম রাখলে কাভারেজ বেশি হবে বলে মনে করেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মুশতাক হোসেন। রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক এই প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা বলছেন, জরুরি পরিস্থিতির কারণে হামের টিকার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণে মাইক্রোপ্ল্যানিংয়ের ঘাটতি রয়েছে। ঠিকমতো হিসাব করা সম্ভব হয়নি। তৃতীয়পক্ষ হিসেবে ইউনিসেফ যে হিসাব দেবে, তা সমন্বয় করতে হবে।
সরকারের তথ্য বলছে, কোনো কোনো বিভাগে টিকার লক্ষ্যমাত্রা শতভাগের বেশি। তবে বিভাগ হিসেবে সিলেটের কাভারেজ কিছুটা কম। সিলেট সিটি করপোরেশনেও টিকার হার একই রকম। আলাদাভাবে সুনামগঞ্জ বা মৌলভীবাজারের টিকার কাভারেজের হিসাব পাওয়া যায়নি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে সিলেট বিভাগে মারা গেছে ৪১ শিশু। আক্রান্তের সংখ্যা তিন হাজারের বেশি। সম্প্রতি ‘যে জেলায় হামে মৃত্যু বেশি’ সূচকে কয়েকবার সুনামগঞ্জ ও মৌলভীবাজারের নাম উঠে এসেছে। সবশেষ ২৪ ঘণ্টায় সিলেট বিভাগে তিন শিশু মারা গেছে। এর মধ্যে দুই শিশু মৌলভীবাজারের।
জনস্বাস্থ্যবিদরা বলছেন, কোনো এলাকায় ৯৫ শতাংশ টিকার কাভারেজ হলে হার্ড ইমিউনিটি হয়ে যায়। টিকা দেওয়ার হিসাব গড় করে দেওয়া হয় বলে অনেক সময় ফাঁকফোকর থেকে যায়, সঠিক চিত্র উঠে আসে না। দেশের ‘হার্ড টু রিচ এরিয়া’ বা দুর্গম এলাকায় সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতি অনেক সময় নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে যায়।
দেশের দুর্গম এলাকাগুলো হলো মূলত পার্বত্য অঞ্চল, নদী ভাঙনকবলিত চর, হাওর এবং উপকূলীয় দ্বীপ এলাকা। যেকোনো সংক্রামক রোগ এসব এলাকায় ছড়িয়ে গেলে ভৌগোলিক কারণে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। সুনামঞ্জের একটা বড় অংশ জুড়ে হাওর। অনেক যায়গায় নৌকা ছাড়া পৌঁছানো যায় না। সেখানে পরিবার থেকে শিশুদের টিকা ক্যাম্পে নিয়ে যেতে অনীহা দেখা যায়। সেক্ষেত্রে এসব অঞ্চলের সব শিশুকে টিকার আওতায় নিয়ে আসা বড় চ্যালেঞ্জ। মৌলভীবাজারে রয়েছে চা বাগান। সেখানকার শ্রমিকরা তুলনামূলক কম আয় করেন। স্বাস্থ্যব্যবস্থা নাজুক।
জনস্বাস্থ্যবিদ মোহাম্মদ ইকবাল বলছেন, দুর্গম এলাকায় স্বাস্থ্য সুবিধা কম থাকে। আবার সংক্রমণ ব্যবস্থাপনা কঠিন হওয়ায় ঝুঁকি বেশি। এসব এলাকা চিহ্নিত করে টিকা দিতে হবে। এক্ষেত্রে সরকারের পাশাপাশি স্বাস্থ্যকর্মীদের সদিচ্ছা গুরুত্বপূর্ণ।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের পরিচালক মো. হালিমুর রশীদের ভাষ্য, টিকা পাওয়ার ক্ষেত্রে যেখানে যত পকেটে গ্যাপ আছে, খুঁজে খুঁজে সেখানে টিকা দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া আছে।




