নিয়ন্ত্রণহীন হামে শিশুমৃত্যু ৬০০ পার
নেই চিকিৎসা প্রটোকল, অভিজ্ঞতার ঘাটতিতে নবীন চিকিৎসকরা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
দুই-তিন সপ্তাহের মধ্যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসবে বলে আশ্বস্ত করেছিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। তবে বাস্তবে হামের সংক্রমণ নিয়েছে আরও ভয়াবহ রূপ। দেশে হাম ও এর উপসর্গে শিশুমৃত্যুর সংখ্যা ৬০০ ছাড়িয়েছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকার শুধু নির্ভর করছে টিকার ওপর, সে তুলনায় হাসপাতালে রোগী ব্যবস্থাপনার দিকে নজর কম। সুনির্দিষ্ট ‘চিকিৎসা প্রটোকল’ না থাকায় রোগীদের সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসকরা। অভিজ্ঞতার অভাবে নবীন চিকিৎসকরা সংকটাপন্ন রোগীদের সঠিক সময়ে করতে পারছেন না রেফার (স্থানান্তর), যার মাশুল দিচ্ছে শিশুরা। সবমিলিয়ে থামছে না মৃত্যুর মিছিল।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর হাম সংক্রমণ পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিদিন প্রতিবেদন প্রকাশ করছে গত ১৫ মার্চ থেকে। সেই প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, দেশে সবশেষ ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে সাত শিশুর। এ নিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়াল ৬০১-এ। মারা যাওয়া শিশুদের মধ্যে ছয় শিশু ঢাকা বিভাগের এবং একজন ময়মনসিংহ বিভাগের। এর মধ্যে হামের উপসর্গে মারা গেছে ৫১১ শিশু। আর হামে নিশ্চিত মৃত্যু হয়েছে ৯০ শিশুর।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে আসা রোগীর সংখ্যা ৭৪ হাজার ৫৭২। সবশেষ ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে আরও ১ হাজার ২১০ জনের শরীরে হামের উপসর্গ দেখা গেছে। অথচ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দায়িত্বশীলরা গত মাসের শুরুতে বলেছিলেন, পরের দুই-তিন সপ্তাহের মধ্যে নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে হাম সংক্রমণ পরিস্থিতি।
রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মুশতাক হোসেন বলছেন, দেশে অনেক বছর পর হামের প্রাদুর্ভাব হয়েছে।
হাজার হাজার রোগী আসছে হাসপাতালে। শিশুমৃত্যুর সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য। নবীন চিকিৎসকরা হাম নিয়ে পড়াশোনা করেছেন। অল্পবিস্তর রোগীও হয়তো পেয়েছেন। কিন্তু সংকটাপন্ন রোগীদের সরাসরি চিকিৎসার অভিজ্ঞতায় রয়েছে ঘাটতি। এতে বাড়তে পারে মৃত্যুর ঘটনা।
রাজধানীতে হামের চিকিৎসা দেওয়া অন্যতম প্রধান দুটি হাসপাতালের চিকিৎসকরা বলছেন, দেশে হামের রোগীদের ব্যবস্থাপনায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা মানা হয়, যা সর্বজনীন। হামের প্রাদুর্ভাবের পর দেশে একটি ‘চিকিৎসা প্রটোকল’ দরকার ছিল। এতে রোগ নির্ণয়ের মানদণ্ড, রোগীর শ্রেণিবিন্যাস, চিকিৎসা পদ্ধতি, ভর্তি ও রেফারালের মানদণ্ড এবং হাম সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আরও সময়োপযোগী নির্দেশনা মিলত। সহজ হতো রোগী ব্যবস্থাপনা, বিশেষ করে সংকটাপন্ন রোগীদের ক্ষেত্রে।
এই চিকিৎসকরা আরও বলছেন, তাদের হাসপাতালে যেসব হামের রোগীরা আসে, তাদের বেশিরভাগেরই অন্য হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার তথ্য আছে। এসব রোগী সংকটাপন্ন অবস্থায় হাসপাতালে আসছে। অনেক ক্ষেত্রেই রোগীরা চিকিৎসা গ্রহণ করার মতো অবস্থায়ও থাকে না। অনেককে সরাসরি ভর্তি করতে হয় নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে।
মাদারীপুর জেলার একটি সরকারি হাসপাতালের এক নবীন চিকিৎসক বলছিলেন, তার উপজেলায় এখন পর্যন্ত দুইশর বেশি হামের রোগী পেয়েছেন। তার চার বছরের কর্মজীবনে এ বছরের আগে হাতেগোনা কয়েক শিশুকে হাম রোগী হিসেবে পেয়েছেন। কিন্তু সেসব শিশুর কারও অবস্থাই সংকটাপন্ন ছিল না। এখন পর্যন্ত এই উপজেলার ৯ শিশু হামে মারা গেছে বলে জানালেন এই চিকিৎসক।
মাদারীপুরের সোহামনি ১০ মাস বয়সে হামে আক্রান্ত হয়ে ঢাকার বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইসস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়। এ হাসপাতালে ভর্তির আগে আরও চারটি হাসপাতালে চিকিৎসা নেয় শিশুটি। সবচেয়ে বেশি সময় ধরে ভর্তি ছিল মাদারীপুর সদর হাসপাতালে। রাজধানীর শিশু হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার সময়ই সোহামনির অবস্থা খারাপ ছিল বলে জানিয়েছিলেন চিকিৎসকরা।
শিশুদের জন্য দেশের সবচেয়ে বড় হাসপাতাল বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট। এ হাসপাতালের ক্রিটিক্যাল কেয়ার পেডিয়াট্রিকস বিভাগের প্রধান চিকিৎসক মো. মাহবুবুল হক বললেন, হাম নিয়ে ভর্তি হওয়া এই হাসপাতালে বেশিরভাগ রোগীর অবস্থাই থাকে সংকটাপন্ন। এসব শিশুকে দেরি করে নিয়ে আসা হয় হাসপাতালে। পাশাপাশি রোগীদের ঠিক সময়ে রেফার করা হয় কি না, তাও দেখা দরকার।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মুশতাক হোসেন বলছিলেন, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে হামে শিশুমৃত্যু কমাতে চিকিৎসা প্রটোকল খুব প্রয়োজন ছিল। সরকারের সদিচ্ছা থাকলে হামের জরুরি পরিস্থিতি আমলে নিয়ে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে এটি তৈরি করা সম্ভব।
এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের পরিচালক মো. হালিমুর রশীদের সঙ্গে। কিন্তু একাধিকবার কল করে ও বার্তা পাঠিয়েও সাড়া মেলেনি তার।




