বছরের ব্যবধানে সবজির দাম বেড়েছে ৮০ শতাংশ
- অতি বৃষ্টি, সরবরাহ সংকট ও পরিবহন ব্যয়ে চাপে সাধারণ ক্রেতা
- কাকরোলের দাম ২০২৫ সালে ৬০ টাকা হলেও এখন তা ১৩০ টাকা
- টমেটো ৪০ টাকা হলেও এখন ৮০ টাকা
- ঝিঙে ও টমেটোর দাম দ্বিগুণ, করলায়ও বড় উল্লম্ফন

ছবি: ফোকাস বাংলা
সকাল থেকেই ভিড় রাজধানীর কারওয়ানবাজারে সবজির দোকানগুলোতে। হাতে বাজারের ব্যাগ, দোকানে দোকানে ঘুরে দাম যাচাই করছেন ক্রেতা। তবে স্বস্তি নেই তাদের মধ্যে। কারণ, গত এক বছরের ব্যবধানে দেশের সবজির দাম বেড়েছে অনেকটা। বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৫ সালের তুলনায় ২০২৬ সালে বিভিন্ন সবজির দাম গড়ে প্রায় ৮০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। বিশেষ করে টমেটো, কাঁকরোল, ঝিঙে, করলা ও বেগুনের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় সবজির দামে চাপ পড়েছে সবচেয়ে বেশি।
২০২৫ সালে বাজার পরিস্থিতি তুলনামূলক স্থিতিশীল ছিল। মৌসুমি উৎপাদন ভালো হওয়ায় এবং সরবরাহ স্বাভাবিক থাকায় অধিকাংশ সবজি ছিল সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যেই। সেই সময় রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে প্রতি কেজি সবজি ৩০ থেকে ৭০ টাকার মধ্যে বিক্রি হতো। আলু ও পেঁয়াজের মতো কিছু পণ্যের দাম ছিল আরও কম।
কিন্তু চলতি বছরে এসে পুরোপুরি বদলে গেছে সেই চিত্র। বাজারে এখন বেশিরভাগ সবজি বিক্রি হচ্ছে ৬০ থেকে ১২০ টাকা কেজি দরে। বর্তমানে টমেটো ও পটোল বিক্রি হচ্ছে ৮০ টাকা কেজি দরে। আলু ৩৫ টাকা, শসা ১০০ টাকা, কাঁকরোল ১৩০ টাকা, ঝিঙে ৮০ টাকা এবং চিচিঙ্গা বিক্রি হচ্ছে ৯০ টাকা কেজি দরে। করলা ও বেগুনের দাম ৮০ থেকে ৯০ টাকার মধ্যে। এছাড়া লাউ ৭০ টাকা, মিষ্টি কুমড়া ৫০ টাকা এবং গাজর ১২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
অন্যদিকে ২০২৫ সালের মে মাসে বাজারে করলার দাম ছিল ৫০ টাকা কেজি। বেগুন ৬০ থেকে ৮০ টাকা, বরবটি ৬০ টাকা, কচি ৪০ টাকা, লতি ৬০ টাকা, ঢ্যাঁড়শ ৫০ টাকা, কাঁকরোল ৬০ টাকা, ঝিঙে ৪০ টাকা এবং টমেটোর দাম ছিল ৩৫ থেকে ৪০ টাকা।
দুই বছরের বাজারদর তুলনা করলে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি বেড়েছে কাঁকরোলের দাম। গত বছর ৬০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হওয়া কাঁকরোল এখন ১৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা প্রায় ১১৭ শতাংশ বৃদ্ধি। টমেটোর দাম ৪০ টাকা থেকে বেড়ে ৮০ টাকায় পৌঁছেছে, অর্থাৎ দ্বিগুণ হয়েছে। ঝিঙের দামও ৪০ টাকা থেকে বেড়ে ৮০ টাকায় উঠেছে। করলার দাম ৫০ টাকা থেকে বেড়ে বর্তমানে ৮০ থেকে ৯০ টাকার মধ্যে রয়েছে। শতাংশের হিসাবে যা প্রায় ৭০ শতাংশ বৃদ্ধি। তুলনামূলকভাবে বেগুনের দাম কিছুটা কম বেড়েছে। সব মিলিয়ে তুলনাযোগ্য এসব সবজির গড় মূল্যবৃদ্ধি প্রায় ৮০ শতাংশের বেশি বলে বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে।
তবে সব পণ্যের দাম সমানভাবে বাড়েনি। তুলনামূলক স্থিতিশীল রয়েছে আলু ও পেঁয়াজের বাজার। আলুর দাম এখনও ৩০ থেকে ৩৫ টাকার মধ্যেই রয়েছে। পেঁয়াজের দামেও বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা যায়নি। তবে পাতাজাতীয় ও মৌসুমি সবজিতে মূল্যবৃদ্ধির চাপ সবচেয়ে বেশি।
কৃষিবিদরা বলছেন, এবারের মূল্যবৃদ্ধির পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে। অতি বৃষ্টি ও অনিয়মিত আবহাওয়ার কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সবজির ক্ষেত নষ্ট হয়েছে। এতে উৎপাদন কমে যাওয়ায় বাজারে সরবরাহ সংকট তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি পরিবহন ব্যয় ও জ্বালানির দাম বৃদ্ধিও সবজির চূড়ান্ত বাজারদরে প্রভাব ফেলছে। এছাড়া মৌসুমি উৎপাদনের ফাঁকে সরবরাহ কমে যাওয়ায় আরও বেড়ে গেছে দাম।
ঢাকার কাঠালবাগান বাজারের খুচরা বিক্রেতা নুরুল ইসলাম বলেছেন, ‘আগের তুলনায় কৃষক পর্যায় থেকেই বেশি দামে সবজি কিনতে হচ্ছে। ফলে খুচরা বাজারেও দাম বেশি রাখতে হচ্ছে। সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে দ্রুত দাম কমবে না।’
কাওরানবাজারে বাজার করতে আসা অর্ধশত বয়সী মুসলেম উদ্দিন বলেছেন, ‘সবজির বাজার এখন অনেক কঠিন। দামাদামি করেও খুব একটা লাভ হয় না। সবজি কিনতেই টাকা শেষ হয়ে যায়, পরে অন্য জিনিস কেনা কঠিন হয়ে পড়ে।’
মেসে বাজার করে খান সাইমুন ইসলাম। পড়াশোনার পাশাপাশি চাকরি করেন একটা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে। বেতনও তেমন বেশি না। তার কণ্ঠে আক্ষেপ, ‘কাওরানবাজারে কিছুটা কম দামে পাওয়া গেলেও বাসার পাশের ভ্যানগুলোতে প্রতি কেজিতে ৩০ থেকে ৫০ টাকা বেশি রাখা হচ্ছে। কম বেতনে চাকরি করে মেসে থাকা মানুষের জন্য এ খরচ সামলানো কঠিন হয়ে যাচ্ছে।’
কনজ্যুয়েমার এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সহ সভাপতি এস এম নাজের হোসেনের ভাষ্য, বৃষ্টির অজুহাতে সবজির দাম বাড়াচ্ছে ব্যবসায়ীরা। এটা তাদের পুরানো অভ্যাস। বৃষ্টি হলে বৃষ্টি, রোদ হলে রোদের অজুহাতে দাম বাড়ানোর যে সংস্কৃতি চলমান তার প্রভাবে এটা তারা করছে। আর যেহেতু বাজারে কোন সংস্থার তদারকি নাই, ব্যবসায়ীরা এ সুযোগে মানুষের পকেট কাটছে। তবে বর্ষার শেষ সময়ে শীত আসার আগে দাম এমনিতেই একটু বেশি থাকে। শীতকালীন সবজি চলে আসলে দাম কমে যায়।
কৃষিবিদ জাহাঙ্গীর আলম আগামীর সময়কে বলেছেন, বর্তমানে সবজির দাম বৃদ্ধির প্রধান কারণ মৌসুমি উৎপাদন কমে যাওয়া। অতিবৃষ্টির কারণে অনেক ক্ষেত নষ্ট হয়েছে। উৎপাদন ও সরবরাহ স্বাভাবিক হলে বাজারও ধীরে ধীরে স্থিতিশীল হবে।
তিনি আরও বলেছেন, দীর্ঘমেয়াদে এই সংকট মোকাবিলায় কৃষিকে আরও জলবায়ু সহনশীল করতে হবে। একই সঙ্গে বাজার ব্যবস্থাপনা, সংরক্ষণ ও সরবরাহ চেইনে কার্যকর নজরদারি বাড়ানো জরুরি।




