সংশয়ে অনিশ্চয়তায় বড় প্রকল্প

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বড় স্থাপনার কীর্তির কৃতিত্ব মেয়াদ শেষে বিএনপি যেসব প্রকল্প দিয়ে নিতে পারে তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে— পাতাল মেট্রোরেল। কিন্তু প্রকল্পটি ঠিক থেমে না গেলেও গতি নেই। পুরোদমে শুরু হলেও শেষ হতে সময় লাগবে প্রায় পাঁচ বছর। আর পেছালে সাত থেকে নয় বছরে ঠেকবে।
শুধু পাতাল মেট্রো নয়, দ্বিতীয় পদ্মা সেতু, ভোলা-বরিশাল সেতু, চট্টগ্রামের পথে উড়াল মহাসড়কসহ প্রস্তাবিত এবং ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের মতো চলমান প্রকল্পও আছে অনেক; যা শেষ করতে পারলে আওয়ামী লীগের সময় হওয়া স্থাপনাগুলোর সঙ্গে টেক্কা দেবে বিএনপির সময়ের স্থাপনা।
উদ্বোধন হওয়া স্থাপনার চেয়ে বেশি প্রকল্প বর্তমানে চলমান। এসব স্থাপনা নির্মাণের কৃতিত্ব কি বিএনপি আগামী নির্বাচনের আগে নিতে পারবে?
ঘোর সংশয় বিশ্লেষকদের। আবার আগের সরকারের করা এসব প্রকল্পের সুফলের পাশাপাশি অর্থনীতির ওপরও চাপ বেড়েছে। রয়েছে বিদেশি ঋণের বোঝা। সেই বাস্তবতাও ফেলে দিচ্ছেন না বিশেষজ্ঞরা। সেই ঋণ পরিশোধের চাপ বর্তমান ও আগামীর সরকারকেই সামাল দিতে হবে।
সময় যত গড়াচ্ছে, প্রকল্পগুলোর নির্মাণ খরচ তত বাড়ছে। উদাহরণ হিসেবে একটি পাতাল মেট্রোর কথা তোলা যাক। পরিকল্পনার সময় সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছিল ৫৬ হাজার কোটি টাকা। দরপত্রেই ৪০ হাজার কোটি টাকা খরচ বেড়েছে। দেরিতে কাজ শুরু হলে ব্যয় আরও দূরে গিয়ে ঠেকতে পারে।
বড় প্রকল্পের আলোচনা কীভাবে এ সরকারের সময় বাস্তবায়ন হবে— এসব নিয়ে আগামীর সময়ের সঙ্গে খোলামেলা কথা বলেছেন সড়ক পরিবহন ও সেতু প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ। তার ভাবনায়, ‘একটা হচ্ছে দাবি, নিজ নিজ এলাকার জন্য মানুষের দাবি থাকেই। আমরাও চাইব আমাদের প্রতিটি সেবা সড়কের হোক বা রেলের হোক, সেবাটা যেন প্রতিটি এলাকায় পৌঁছে দিতে পারি। তবে যেটি হচ্ছে, বড় অনেক প্রকল্প আলোচনায় রয়েছে— এগুলো আমাদের সিদ্ধান্তের আকারের দিকে পৌঁছায়নি যে এটা বাস্তবায়ন করব। তবে আলোচনার মধ্যে আছে।’
‘আমরা সঙ্গে এটাও রাখছি, এগুলো করতে ব্যাপক অর্থের জোগান প্রয়োজন। সেটি জনগণের জন্য লাভজনক কি না, দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট কি না, সেগুলোও বিবেচনায় আনা হচ্ছে। পরে এসব প্রকল্পের মধ্যে কোন প্রকল্প গ্রহণ করব, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে। সম্ভাব্যতা যাচাই, পরিকল্পনা কমিশনের মতামত, আমাদের মন্ত্রণালয়ের ভাবনা, ক্যাবিনেট মিটিং, একনেকসহ কোনো প্রক্রিয়ার মধ্যেই কোনো প্রকল্প এখনো প্রবেশ করেনি’— যোগ করেন তিনি।
প্রশ্ন হচ্ছে— বর্তমান সরকারের সময় কোনো প্রকল্প কি শেষ হওয়া সম্ভব? প্রতিমন্ত্রীর জবাব, ‘ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের কাজ দ্রুত শেষ করার চেষ্টা করছি। এমআরটি-১ ও ৫ দ্রুত করার ব্যবস্থা নিচ্ছি। আমরা এটা (পাতাল মেট্রোরেল) বাস্তবায়ন করতে চাই। জাইকার কিছু দাবিদাওয়া রয়েছে, পর্যালোচনা করা হচ্ছে।’
পুরনো উন্নয়নের বুলি, বর্তমান অস্পষ্ট: আওয়ামী লীগ সরকারের রাজনীতির বড় বুলি ছিল ‘উন্নয়ন’। কথায় কথায় শুধু উন্নয়নের কথাই বলত। ‘অর্জন’ তুলে ধরত। যদিও এসব স্থাপনা দিনশেষে মানুষের কাজেই লাগছে। রাখছে দেশের অর্থনীতিতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অবদান। তবে পেছনে ঋণের বোঝাও বেড়েছে।
উল্টো দিকে অবকাঠামো নিয়ে বিএনপি সরকারের রাজনীতি কী হবে— তা স্পষ্ট নয়। বর্তমান সরকারের প্রথম ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনায় বড় অবকাঠামোর কম গুরুত্ব পেয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ ‘স্বৈরাচারের’ তকমা পেলেও সরকারটির করে যাওয়া বড় স্থাপনাগুলো আলোচনায় রয়েছে। সামনের দিনগুলোতেও থাকবে। এ খাতে কৃতিত্বের ভাগ বিএনপিকে নিতে হলে প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর চলমান কাজ শেষ করার পাশাপাশি প্রস্তাবিত বড় কাজগুলোতে সরকারকে হাত দিতে হবে।
প্রকল্পগুলো নিয়ে ‘বিএনপি সরকার সচেতনভাবে হাঁটার চেষ্টা করছে’ বলে মনে করছেন অবকাঠামো ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শামছুল হক। তার কথায়, ‘এতে দেরি হলেও আখেরে ভালো হবে। তবে অনেক বেশি দেরি হলে উন্নয়ন পিছিয়ে যাবে, সেটাও ভাবনায় রাখতে হবে।’
শামছুল হক বলেছেন, ‘বেশ কিছু জায়গায় উন্নয়নকাজ করার দরকার আছে। কিন্তু উন্নয়ন করে দেউলিয়া হওয়ার চেয়ে পরিপক্ব উন্নয়ন বেশি দরকার। আগের (আওয়ামী লীগ) সরকার শুরুতে এমন ছিল না। শেষের দিকে মেগা প্রকল্পের নেশা পেয়েছিল। বর্তমানে আগের ঋণের চাপ থাকবে, এটা ঠিক। পাশাপাশি নতুন বিনিয়োগ যেন পরিকল্পিত হয় সেই ব্যবস্থাও করতে হবে। তা না হলে মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ের দ্রুতগতি হানিফ ফ্লাইওভারে এসে আটকে যাবে।’
মেট্রোর কথা: বর্তমানে আলোচনায় থাকা সবচেয়ে বড় প্রকল্পগুলোর একটি মেট্রোরেল। উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত বর্তমানে এক পথে মেট্রোরেল চলছে। কথা ছিল ২০৩০ সালের মধ্যে পাঁচ পথের ছয় রুটে মেট্রো চলার। সেই কাজ আর এগোচ্ছে না। মেট্রোরেল লাইন-১ ও ৫ (উত্তর) দুটি পাতাল রেলের চলমান নির্মাণকাজ বন্ধ হওয়ার জন্য এ পরিস্থিতি।
দরপত্রের শর্ত অনুযায়ী, আগামী জুনের মধ্যে নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরকার চুক্তি না করলে দরপত্র বাতিল হবে। নতুন করে মূল কাজ শুরু করতে লাগবে দুই বছর। পাঁচ বছরের আগে নির্মাণকাজ শেষ করা অসম্ভব। ফলে নতুন দরপত্র করে মেট্রোর নির্মাণকাজ বর্তমান সরকারের সময় শেষ হবে না।
মেট্রোরেল বাস্তবায়নকারী সরকারি প্রতিষ্ঠান ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের (ডিএমটিসিএল) তথ্য বলছে, সড়ক মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে মেট্রোর সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। এখন প্রধানমন্ত্রীর অফিস থেকে কোনো সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি।
দ্বিতীয় পদ্মা সেতু: নতুন করে আবার আলোচনায় দ্বিতীয় পদ্মা সেতু। গত ২৯ মার্চ সড়কমন্ত্রী শেখ রবিউল আলমকে চিঠি দিয়েছেন বিমানমন্ত্রী আফরোজা খানম। তিনি মানিকগঞ্জ থেকে এমপি নির্বাচিত হয়েছেন। আরেকটি পদ্মা সেতুর জোর দাবি তার। দ্বিতীয় পদ্মা সেতুর নির্মাণের সমীক্ষাও হাতে নেয় আওয়ামী সরকার। তখনই আলোচনা হয়েছিল আরেকটি পদ্মা সেতু ‘অপ্রয়োজনীয়’।
পদ্মা ও যমুনা সেতুর মতো অবকাঠামো নির্মাণের ভাবনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন আন্তর্জাতিক নদী বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আইনুন নিশাত। তিনি মনে করছেন, ‘পদ্মায় আরেকটি সেতু নির্মাণ হলে এ নদীর মৃত্যু ঘটবে। স্বাভাবিক নিয়মে পদ্মায় আর সেতু নির্মাণের সুযোগ নেই।’
যদিও বিদ্যমান পদ্মা সেতুর মধ্য দিয়েও রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া এবং মানিকগঞ্জের পাটুরিয়া নৌপথ ব্যবহারকারী বিশাল একটি জনগোষ্ঠীর কমেনি ভোগান্তি। কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ ও পাবনাসহ উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের একাংশের মানুষ এখনো নির্ভরশীল এ রুটের ফেরি পারাপারে।
সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এ সেতুর কথা এখনো বহুদূর। প্রথমে নীতিগত অনুমোদন, তারপর সমীক্ষা, সম্ভাব্যতা যাচাই, নকশা, বিশদ নকশা, অর্থায়ন জোগাড় করাসহ আরও অনেক কিছু করতে হবে। এগুলোর পর নির্মাণকাজ শুরু হবে। যদি পদ্মায় আরেকটি সেতু হয়ও, সেই তরী ঘাটে ভিড়তে অনেক দেরি।
ভোলা-বরিশাল সেতু: আলোচনায় এসেছে ভোলা-বরিশাল সেতু। এটি নির্মাণের গুরুত্ব সংসদে তুলে ধরেছেন ভোলার এমপি আন্দালিব রহমান পার্থ। বরিশাল ও ভোলার মধ্যে সেতু নির্মাণের সম্ভাব্যতা খতিয়ে দেখার প্রথম উদ্যোগ নেওয়া হয় ২০১৩ সালে, যা ২০১৯-এ শেষ হয়।
এরপর অর্থায়নের অভাবে কোনো অগ্রগতি হয়নি। চিন্তাভাবনা করতে করতেই প্রকল্পের সম্ভাব্য খরচ ৯ হাজার ৯২২ কোটি থেকে বেড়ে প্রায় ১৮ হাজার কোটি টাকা হয়েছে।
বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ (বিবিএ) সূত্র বলছে, সেতু নির্মাণের জন্য জরিপ করা হয়েছে। প্রায় ১০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের সম্ভাব্য এ সেতুর কাজ শেষ হলে ভোলা এবং দেশের দক্ষিণাঞ্চলে বসবাসকারীদের আর্থসামাজিক ব্যবস্থার উন্নতি হবে।
সেতু বিভাগের সচিব মোহাম্মদ আব্দুর রউফ বলছেন, ‘আমাদের দিক থেকে কাজ অনেকখানি এগোনো আছে। সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্তের ওপর বাকি কাজ নির্ভর করবে।’
আরও কিছু আগামীর আলাপ: আওয়ামী সরকারের শুরু করে যাওয়া ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের কাজ প্রায় শেষের পথে। বিমানবন্দর থেকে হাতিরঝিল পর্যন্ত একটি অংশে চলছে যান চলাচল। বাকি অংশ শেষ হলে বিমানবন্দর থেকে যান সোজা চলে যেতে পারবে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুতুবখালী।
এটির সঙ্গে আরেকটি নির্মাণাধীন উড়াল মহাসড়ক যুক্ত হবে, ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে। এতে কুতুবখালী থেকে সাভারের আশুলিয়া পর্যন্ত বিনা বাধায় যান চলাচল করতে পারবে। এ সড়কেরও বড় কৃতিত্ব চলে যাবে আওয়ামী সরকারের হাতে।






