ট্রাইব্যুনালে এসআই নজরুল
ওই রাতে কবির মোল্লা ও টিপুর রক্তাক্ত মরদেহ দেখেছি

ফাইল ছবি
২০১৫ সালে বরিশালে ছাত্রদল নেতা টিপু হাওলাদার ও কবির মোল্লাকে ‘ক্রসফায়ারে’ হত্যার ঘটনায় করা মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জবানবন্দি দিয়েছেন আগৈলঝাড়া থানার তৎকালীন এসআই মো. নজরুল ইসলাম মজুমদার।
আজ বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন বিচারিক প্যানেল তার জবানবন্দি রেকর্ড করেন।
পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা নজরুল বর্তমানে ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার কোর্ট ইন্সপেক্টর হিসাবে কর্মরত। ২০১৪ সালের জুন থেকে ২০১৫ সালের আগস্ট পর্যন্ত আগৈলঝাড়া থানায় এসআই হিসেবে কর্মরত ছিলেন তিনি।
জবানবন্দিতে নজরুল বলেছেন, ‘ফেব্রুয়ারি ২০, ২০১৫। রাত আনুমানিক ২টা। হঠাৎ আমাদের সামনে দিয়ে বরিশালের পুলিশ সুপারের গাড়ি অতিক্রম করে। তার পেছেনে একটি মাইক্রোবাসও ছিল। আনুমানিক ১৫ মিনিটি পর হঠাৎ করে পর পর কয়েক রাউন্ড গুলির শব্দ শুনতে পাই। তখন আমি ও অফিসার্স ইনচার্জ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে রাস্তার ওপর কবির মোল্লা ও টিপু হাওলাদারের রক্তাক্ত মৃতদেহ পড়ে থাকতে দেখি। ঘটনাস্থলে বরিশাল জেলার পুলিশ সুপার এ কে এম এহসানউল্লাহ, উজিরপুর থানার এএসআই মাহাবুল ও জসিমকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখি।’
এসআই নজরুল জানিয়েছেন, ওই রাতে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হওয়ায় পুলিশ সুপার এ কে এম এহসাউল্লাহ তাদের ওপর রাগান্বিত হয়ে বলেছেন, ‘শালা তোরা এখন আসছো কি জন্য? তোরা তো কিছু্ই করতে পারলি না। তোদের থানার সব অফিসার ও ফোর্সকে কবির মোল্লা ও টিপুকে ক্রস ফায়ার দিতে বললাম, কেউ রাজি হয় না। তোরা কীভাবে চাকরি করছ, চাকরি খাইয়াহালামু, এক শালারও এসিআর থাকবে না, এসিআরের বারোটা বাজিয়ে দিবো।’
তার দাবি, ঘটনাস্থলে এএসআই মাহাবুল ও এএসআই জসিমকে দেখিয়ে পুলিশ সুপার বলেছে, ‘ওরা অনেক সাহসী লোক, তোরা ভীতু লোক, তোরা পারলি না, এজন্য দেখ উজিরপুর থানা থেকে তাদেরকে নিয়ে আসছি। তদের পুরস্কৃত করব।’
মানবতাবিরোধী অপরাধের এ মামলায় আসামি চারজন। তাদের মধ্যে গ্রেপ্তার আছেন উজিরপুর থানার সাবেক এএসআই মাহাবুল ইসলাম ও এএসআই জসিম উদ্দিন। অপর দুই আসামি বরিশাল-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ এবং বরিশালের সাবেক এসপি এহসানউল্লাহ পলাতক রয়েছেন।
জবানবন্দিতে এসআই নজরুল উল্লেখ করেন, ২০১৫ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি আগৈলঝাড়া উপজেলার বুধার এলাকায় একটি ফলবাহী পিকআপভ্যানে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় আগৈলঝাড়া থানার এসআই অসীম কুমার সিকদার বাদী হয়ে কবির হোসেন মোল্লা ও টিপু হওলাদারসহ এজহারনামীয় ২৬ জন ও অজ্ঞাতনামা ২৫/৩০ জন আসামির বিরুদ্ধে থানায় মামলা করেন।
বুধবার দেওয়া জবানন্দিতে অসীম কুমার বলেছেন, ‘পুলিশ সুপার এহসানউল্লাহর নির্দেশে একটি প্রস্তুতকৃত এজাহারে তাকে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করা হয় এবং সেই এজাহারের ভিত্তিতে বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা করা হয়।’
মামলার তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় এসআই নজরুলকে। তদন্তকালে পুলিশ সুপার তদন্ত কর্মকর্তা নজরুল ও আগৈলঝাড়ার ওসি মনিরুলকে তার কার্যালয়ে ডাকেন। আসামি ধরতে না পারায় গালিগালাজ করেন তাদের। বলেছেন, ‘তোরা তো জানো, আগৈলঝাড়া থানায় চাকরি করছ, আবুল হাসনাত আব্দুল্লাহর ক্ষমতা সম্পর্কে জানো? এই মামলায় আসামি ধারার জন্য তার চাপ আছে, নির্দেশ আছে, আসামি না ধরতে পারলে কারও চাকরি থাকবে না।’
এরপর তদন্ত কর্মকর্তা নজরুল, বরিশাল ডিবির কর্মকর্তা এসআই খলিলুর রহমানকে নিয়ে ঢাকায় আসেন এবং ডিবির মুখপাত্র অতিরিক্ত ডিআইজি (জয়েন্ট কমিশনার) মনিরুল ইসলামের সঙ্গে দেখা করেন। সেখানে একটি টিমকে আসামিদের গ্রেপ্তারের দায়িত্ব দেওয়া হয়। ওই টিম ২০১৫ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি রাতে অভিযান চালিয়ে ঢাকার আশুলিয়া ও কেরানীগঞ্জ থেকে কবির মোল্লা ও টিপু হাওলাদারকে গ্রেপ্তার করে।
গ্রেপ্তারদের ২০ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ৮ টায় মাইক্রোবাসে করে বরিশালের উদ্দেশে পাঠানো হয়। পথে মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলার ভুরঘাটা এলাকায় বরিশাল ডিবির একটি টিমের কাছে হস্তান্তর করা হয় আসামিদের। আগৈলঝাড়ার ওসি মনিরুল তদন্ত কর্মকর্তা নজরুলকে রাত দেড়টায় সব অফিসার ও ফোর্স নিয়ে থানায় অবস্থান করার নির্দেশ দেন। পরে ওই দিন রাতে ওসি থানায় ডিউটি অফিসার ও সেন্ট্রিকে রেখে বাকি সব অফিসার ও ফোর্স নিয়ে আগৈলঝাড়া উপজেলার বুধার বাইপাস সড়কে যান। সেখানে সবাইকে বিভিন্নস্থানে ডিউটিতে মোতায়েন করা হয়। এরপর রাত আনুমানিক রাত ২টায় দিকে ক্রসফায়ারের ঘটনা ঘটে।
নিহত কবির মোল্লা ও টিপু হাওলাদারের লাশের সুরতহাল রিপোর্ট আগৈলঝাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের দুজন কর্মকর্তা তৈরি করেন। আগৈলঝাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দেবী চন্দ ওই বিষয়ে তদন্ত করে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন। আগৈলঝাড়া থানার করা দুই মামলায় এসআই আক্কাস আলী চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন।
জবানবন্দিতে নজরুল আরও বলেছেন, ‘ঘটনার আগে ও পরে সারা বাংলাদেশেবিরোধী মতকে নির্মূল করার জন্য রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। তারই ধারাবাহিকতায় ঘটে ওই ঘটনা।’





