ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য
‘ক্রসফায়ারে’ রাজি না হওয়ায় অন্য থানা থেকে আনা হয়েছিল পুলিশ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বরিশালের আগৈলঝাড়ায় ২০১৫ সালে ছাত্রদল নেতা টিপু হাওলাদার ও কবির মোল্লাকে ‘ক্রসফায়ারে’ হত্যা নিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে চলছে মামলা। এবার সেই মামলা নিয়ে বিস্ফোরক এক জবানবন্দি দিয়েছেন এক পুলিশ কর্মকর্তা।
তার দাবি, ওই দুই নেতাকে ‘ক্রসফায়ার’ দেওয়ার নির্দেশ পেলেও তা মানতে জানিয়েছিলেন অস্বীকৃতি। একই কারণে রাজি হননি আগৈলঝাড়া থানার অন্য কর্মকর্তারাও। পরে উজিরপুর থানা থেকে দুই পুলিশ সদস্যকে এনে যুক্ত করা হয় অভিযানে।
বুধবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন বিচারিক প্যানেলে এমন বিস্ফরক সাক্ষ্য দিয়েছেন অসীম কুমার সিকদার।
ট্রাইব্যুনাল বলছেন, মামলায় রয়েছেন চারজন আসামি। তাদের মধ্যে গ্রেপ্তার উজিরপুর থানার সাবেক সহকারী উপপরিদর্শক মো. মাহাবুল ইসলাম ও জসিম উদ্দিন। পলাতক অপর দুই আসামি বরিশাল-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ এবং বরিশালের সাবেক পুলিশ সুপার এহসান উল্লাহ।
বর্তমানে বরিশাল সদর নৌ-থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ৪৮ বছরের অসীম কুমার সিকদার। ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০১৫ সালের মে পর্যন্ত আগৈলঝাড়া থানায় উপপরিদর্শক হিসেবে কর্মরত ছিলেন তিনি।
জবানবন্দিতে তিনি বলেন, ২০১৫ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি আগৈলঝাড়া উপজেলায় একটি ফলবাহী পিকআপভ্যানে দেওয়া হয় আগুন। সে-সময় ঘটনাস্থলে যান অসীম কুমার। আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার পর কোনো অভিযোগকারী না থাকায় বাদী হয়ে মামলা করার নির্দেশ দেন তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা।
অসীম কুমারের দাবি, জোর করে সাক্ষর করানো হয় তৎকালীন পুলিশ সুপার এহসান উল্লাহর নির্দেশে প্রস্তুত করা একটি এজাহারে। সেই এজাহারের ভিত্তিতেই বিশেষ ক্ষমতা আইনে করা হয় মামলা রুজু। তার ভাষ্য, মামলার আসামিদের গ্রেপ্তারের জন্য পুলিশের ওপর ছিলব্যাপক চাপ।
তিনি আদালতকে জানান, ঢাকা থেকে দুই আসামিকে গ্রেপ্তার করে আনার পর ২০ ফেব্রুয়ারি আগৈলঝাড়া থানায় আসেন পুলিশ সুপার এহসান উল্লাহ। পরে তাকে ডেকে বলেন, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশেওই দুই আসামিকে ‘ক্রসফায়ার’ দিতে হবে। এবং এ কাজ করতে হবে অসীম কুমারকে।
তবে জবাবে এ পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ‘আমি চাকরি ছেড়ে দিতে রাজি আছি, কিন্তু এ কাজ করতে পারব না।’ এরপর পুলিশ সুপার গালিগালাজ করেন এবং চাকরির ক্ষতির হুমকি দেন বলে দাবি তার।
অসীম কুমার আরও বলেন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে ছিলেন তিনি। অতীতে বিভিন্ন স্থানে সংঘটিত ‘ক্রসফায়ার’-সংক্রান্ত ঘটনা সম্পর্কে জানার কারণে এ ধরনের নির্দেশ মানতে রাজি হননি। তার দাবি, আগৈলঝাড়া থানার অন্য কর্মকর্তাদের কাছেও দেওয়া হয়েছিল একই প্রস্তাব, কিন্তু এতে সম্মত হননি তারাও।
সাক্ষ্যে তিনি বলেন, ২১ ফেব্রুয়ারি রাতে দায়িত্ব পালনকালে দূর থেকে গুলির শব্দ ও আগুনের শিখার মতো কিছু দেখতে পান। পরদিন সকালে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছ থেকে জানতে পারেন, ‘ক্রসফায়ারে’ হত্যা করা হয়েছে গ্রেপ্তার হওয়া আগৈলঝাড়া উপজেলা ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক টিপু হাওলাদার এবং উপজেলা জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থার সাংগঠনিক সম্পাদক কবির মোল্লাকে।
তার ভাষ্য, আগৈলঝাড়া থানার কোনো কর্মকর্তা এ ঘটনায় অংশ নিতে রাজি না হওয়ায় উজিরপুর থানা থেকে সহকারী উপপরিদর্শক মাহাবুল ইসলাম ও জসিম উদ্দিনকে এনে যুক্ত করা হয় অভিযানে।
পরে নিহতদের সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত করে ময়নাতদন্তের জন্য শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়। ময়নাতদন্ত শেষে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয় মরদেহ।
এদিন শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষের সূচনা বক্তব্য উপস্থাপন করেন প্রসিকিউটর সহিদুল ইসলাম সরদার। এ সময় শুনানি পরিচালনা করেন প্রসিকিউটর তাসমিরুল ইসলাম।




