আগাম জামিন আবেদন শুনছেন না হাইকোর্ট

এখতিয়ার থাকার পরও আগাম জামিন আবেদন গ্রহণ বা শুনানি করা থেকে বিরত রয়েছেন হাইকোর্ট বেঞ্চগুলো। কেন তারা এ বিষয়ে নিজেদের বিরত রাখছেন, তা স্পষ্ট নয়। তবে এতে বেশ বিপাকে পড়েছেন বিচারপ্রার্থীরা। একই সঙ্গে আইনজীবীরাও বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে এসব তথ্য।
আইনজীবীরা বলছেন, বিচারকদের মধ্যে একধরনের সেলফ সেন্সরশিপ কাজ করছে। কিছু বিচারপতির চাকরি চলে যাওয়ায় অনেকেই নিজেদের গুটিয়ে নিয়েছেন। একই কারণে তারা হয়তো আগাম জামিনের আবেদনগুলোও ফিরিয়ে দিচ্ছেন। কিন্তু এতে বিচারপ্রার্থীদের পাশাপাশি সংকটে পড়েছেন আইনজীবীরাও। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে নানা কারণে হয়রানিমূলক মামলা হয়ে থাকে। অনেক ক্ষেত্রেই ঢালাওভাবে বহু মানুষকে আসামি করা হয়। এসব মামলায় গ্রেপ্তার এড়াতে তাই অনেকেই আগাম জামিনের প্রার্থনা করেন।
সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের কার্যতালিকা থেকে দেখা যায়, বর্তমানে হাইকোর্ট বিভাগে ফৌজদারিবিষয়ক মামলাগুলো শুনানির জন্য ২০টি বেঞ্চ আছে। সবারই আগাম জামিনের আবেদন নিষ্পত্তি করার এখতিয়ার রয়েছে। কিন্তু গত ঈদুল আজহার পর মাত্র একটি বা দুটি হাইকোর্ট বেঞ্চ আগাম জামিন আবেদন গ্রহণ ও শুনানি করছেন। তাও সপ্তাহে এক দিন বা আধাবেলা। বাকিরা ফিরিয়ে দিচ্ছেন জামিন প্রার্থীদের।
জানা যায়, যে কয়টি বেঞ্চ আগাম জামিন আবেদন শুনানি করছেন, তারা সাধারণত প্রতি বৃহস্পতিবার দুপুরের পর থেকে এমন আবেদন গ্রহণ ও নিষ্পত্তি করে থাকেন।
আইনজীবীরা বলছেন, বহু মানুষ হয়রানিমূলক মামলায় পড়ছেন। তাকে সুরক্ষা দেবেন মূলত হাইকোর্ট ও সাংবিধানিক কোর্ট। সেখানে যদি আগাম জামিন শুনানি না করা হয়, তাহলে বিচারপ্রার্থীদের জন্য তা বড় ধরনের সংকট সৃষ্টি করবে।
সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র অ্যাডভোকেট শেখ আলী আহমেদ খোকন আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘কেউ শোনেন না। শুধু একটা বেঞ্চ আগাম জামিনের বাতিটা কোনো রকমে নিভু-নিভু অবস্থায় জ্বালিয়ে রেখেছেন। এটা তো হতে পারে না। কারণ এটা ২০ কোটি মানুষের দেশ। এত মানুষ, এত বিচারপ্রার্থী... এটা হতে পারে না।’
দীর্ঘদিন সুপ্রিম কোর্টে আইন পেশায় নিয়োজিত খোকন জানিয়েছেন, ৫, ৭ ও ১০ বছর আগেও দ্রুততার সঙ্গে মামলা ডিসপোজাল (নিষ্পত্তি) হয়েছে। অনেক বিচারপতি ছিলেন, যারা মামলা জমা দিলে তাদের বুঝতে ২ মিনিট, ৩ মিনিট লাগত। এক দিনেই তারা ৫০০-৭০০ মোশন মামলা শুনানি করে ফেলতেন। এতে মানুষ দ্রুততার সঙ্গে বিচার পেতেন।
তার ভাষ্য, ‘হয়তো কেউ জিতেছে, কেউ হাসিমুখে গিয়েছে; কেউ হয়তো জিতে নাই, মনটা খারাপ করে চলে গিয়েছে। কিন্তু সে বিচার তো পেয়েছে। তার বিচার তো নিষ্পত্তি হয়েছে। মানুষ কী চায়? দ্রুততার সঙ্গে তার বিচারটা চায়; কিন্তু এখন আর তা দেখা যাচ্ছে না।’
সংকটের বিষয়টি স্বীকার করে সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ আলী জানালেন, এ বিষয়ে সমাধানের জন্য শিগগির তারা প্রধান বিচারপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ করে লিখিত আবেদন জানাবেন।
বিশেষ পরিস্থিতিতে গ্রেপ্তারের আগেই শর্তসাপেক্ষে আদালত যে জামিন মঞ্জুর করে থাকেন, তাকেই বলা হয় ‘আগাম জামিন’। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার শিহাব উদ্দিন খান বললেন, বাংলাদেশে প্রচলিত ফৌজদারি কার্যবিধিতে আগাম জামিনের কোনো সুস্পষ্ট বিধান নেই। কিন্তু ৪৯৮ ধারায় উল্লিখিত হাইকোর্ট বিভাগ ও দায়রা আদালত যেকোনো ক্ষেত্রে যেকোনো ব্যক্তিকে জামিন মঞ্জুরের নির্দেশ দিতে পারেন। মূলত এ ধারার অধীনেই অভিযুক্ত ব্যক্তিকে ক্ষেত্রবিশেষে আগাম জামিন দেওয়া হয়।
তার মতে, কোনো অভিযুক্ত ব্যক্তি যদি আদালতে জামিন চাওয়ার আগেই গ্রেপ্তারের আতঙ্ক বোধ করেন এবং গ্রেপ্তারের পর কোনো অভিযুক্ত ব্যক্তির হয়রানি কিংবা সম্মানহানির আশঙ্কা থাকে— এমন পরিস্থিতিতে মূলত আগাম জামিন চাওয়া হয়। হাইকোর্ট অন্তর্বর্তী আগাম জামিন বিবেচনা করে থাকেন। ফৌজদারি মামলায় চার্জশিট হওয়ার পর সাধারণত আগাম জামিন বিবেচনা করা হয় না।





