বিএমডিসির আপিল ঠেকাতে চাপাচাপি দুই মন্ত্রণালয়ের

এখতিয়ারের বাইরে গিয়ে হাইকোর্টের দেওয়া রায়ের বিরুদ্ধে আপিল ঠেকাতে চিঠি দিয়ে চাপ প্রয়োগ করেছে স্বাস্থ্য ও আইন মন্ত্রণালয়। দুই মন্ত্রণালয়ের এই খবরদারিসংক্রান্ত চিঠি ঘেঁটে দেখা গেল, আইন মন্ত্রণালয় স্পষ্ট বলেই দিচ্ছে, আপিল করলে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল পাওয়া না-ও যেতে পারে। অথচ, আপিলের রায় কী হবে, সে সিদ্ধান্ত দেবেন উচ্চ আদালত। সেটি আগে থেকে বলার কোনো সুযোগ কারও নেই।
এ ঘটনা ঘটেছে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিএমডিসি) করা একটি আপিল ঘিরে। মূল ঘটনা জানতে হলে যেতে হবে আরও পেছনে। এক রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৬ সালের ১৩ মার্চ হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ সরকারি ও বেসরকারি মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের (ডেন্টাল) মেডিকেল অ্যাসিসট্যান্টদের মতো স্বতন্ত্রভাবে প্র্যাকটিস রেজিস্ট্রেশন দিতে আদেশ দেন। ৩০ দিনের মধ্যে এই আদেশ কার্যকর করতে বলা হয় বিএমডিসিকে।
এই বিএমডিসি হলো একটি সংবিধিবদ্ধ সংস্থা, যার দায়িত্ব বাংলাদেশে চিকিৎসা শিক্ষার উচ্চমান প্রতিষ্ঠা ও বজায় রাখার পাশাপাশি চিকিৎসা যোগ্যতার স্বীকৃতি দেওয়া। এটি চিকিৎসা পেশার যথাযথ মান নিশ্চিতের মাধ্যমে বাংলাদেশে চিকিৎসকদের দেয় অনুশীলনের নিবন্ধন।
হাইকোর্টের ওই রায়ে সংক্ষুব্ধ হয় বিএমডিসি। ২০১৭ সালে রায়ের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ আদালতে আপিল করে তারা। সেই আপিলই গতকাল বুধবার গ্রহণ করেছেন আপিল বিভাগ। যেখানে বাতিল হয়ে গেছে হাইকোর্টের রায়। ফলে সরকারি ও বেসরকারি মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের (ডেন্টাল) মেডিকেল অ্যাসিসট্যান্টদের মতো স্বতন্ত্রভাবে প্র্যাকটিস রেজিস্ট্রেশন দেওয়ার আর কোনো সুযোগ নেই— জানালেন বিএমডিসির আইনজীবী মোস্তাফিজুর রহমান খান।
কিন্তু বিএমডিসি যেন আপিলটি না করে এবং হাইকোর্টের রায় কার্যকর করে, সে বিষয়ে লিখিতভাবে ‘চাপ’ দেয় আইন মন্ত্রণালয়। সলিসিটর উইং থেকে পাঠানো ওই চিঠি আগামীর সময়ের হাতে এসেছে। সেখানে বলা হয়েছে, ‘হাইকোর্ট বিভাগ কর্তৃক প্রদত্ত রায়টি আইনসম্মত, যথাযথ এবং যৌক্তিক মর্মে প্রতীয়মান হয়। ওই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করা হলে ফলাফল লাভের সম্ভাবনা দেখা যায় না এবং এতে সরকারের মূল্যবান সময় ও আর্থিক ক্ষতির সম্ভাবনা বিদ্যমান বিধায় আপিল বিভাগে আপিল না করে হাইকোর্ট বিভাগ কর্তৃক প্রদত্ত রায়ের আলোকে পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য মতামত/পরামর্শ প্রদান করা হলো।’
চিঠিতে মতাতম বা পরামর্শ বলা হলেও, আসলে সে এখতিয়ার আইন মন্ত্রণালয়ের নেই। যে কেউ চাইলে রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করতেই পারে। এরপর আবার আইন মন্ত্রণালয়ের সলিসিটর উইংয়ের এই মতামতের রেফারেন্স দিয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় আরও একটি চিঠি দেয় বিএমডিসিকে। সেখানেও সলিসিটর উইংয়ের মতামতের ভিত্তিতে পদক্ষেপ নিতে বলা হয়। এসব চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে বিএমডিসির রেজিস্ট্রার ডা. মো. লিয়াকত হোসেন সুপ্রিম কোর্টে তাদের আপিল আর না চালানোর সিদ্ধান্ত নেন। ২০২৪ সালের ১৯ আগস্ট তাদের অ্যাডভোকেট অন রেকর্ডকে উদ্দেশ্য করে তিনি লেখেন, ‘আমি মামলাটি আর চালাব না মর্মে সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’
কিন্তু এর কয়েকদিন পরই ২৫ আগস্ট লিয়াকত হোসেন শাহবাগ থানায় একটি জিডি করেন। সেখানে তিনি জানিয়েছেন, ১৯ আগস্ট ২০০ জন ডেন্টাল টেকনোলজিস্ট বিএমডিসিতে ঢুকে আপিল প্রত্যাহারের জন্য তাকে ভয়ভীতি দেখান, চাপ দেন এবং জোর করে অঙ্গীকারনামা ও প্রত্যাহারের আবেদনপত্র আদায় করেন।
পরে তিনি তার আইনজীবীকে বিষয়টি জানান এবং আপিল চালিয়ে নিতে অনুরোধ করেন। সঙ্গে এটাও যোগ করেন, আগের চিঠিতে জোর করে তার সই নেওয়া হয়েছিল।
ব্যারিস্টার মোস্তাফিজুর রহমান আগামীর সময়কে বলছিলেন, ‘বিএমডিসি একটি সংবিধিবদ্ধ সংস্থা। চিকিৎসা যোগ্যতার স্বীকৃতি কাকে দেওয়া হবে বা কাকে দেওয়া হবে না, তা একমাত্র বিএমডিসির এখতিয়ার। এ ব্যাপারে আপিল ঠেকাতে যেসব চিঠি আইন মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে দেওয়া হয়েছে, তা এখতিয়ারবহির্ভূত।’
উল্লেখ্য, ‘ডিপ্লোমা ইন মেডিকেল টেকনোলজি ডেন্টিস্ট্রি’ ডিগ্রিধারীদের সংগঠন বাংলাদেশ ডেন্টাল পরিষদের সাংগঠনিক সম্পাদক মুহাম্মদ কামাল হোসেন ২০১৬ সালে রিট আবেদনটি করেছিলেন।
এর আগে তারা মেডিকেল অ্যাসিসট্যান্টদের মতো স্বতন্ত্রভাবে প্র্যাকটিস রেজিস্ট্রেশন পেতে এখতিয়ার সম্পন্ন প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের কাছে আবেদন করেন। কিন্তু নিয়ম অনুযায়ী আবেদনটি নাকচ হয়ে গেলে তারা আইনি পথ বেছে নেন।




