কাঁচাবাজারে স্বস্তি, উল্টো চিত্র নিত্যপণ্যে

ছবি: আগামীর সময়
টানা বৃষ্টির কারণে চলতি মাসের শুরু থেকেই রাজধানীর বাজারে কাঁচা সবজির দাম ছিল ঊর্ধ্বমুখী। তবে আবহাওয়ার উন্নতি এবং সরবরাহ বাড়ায় ধীরে ধীরে কমতে শুরু করেছে সবজির দাম। কাঁচাবাজারে দামের এই পতনে ক্রেতাদের মাঝে কিছুটা স্বস্তি ফিরলেও ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে নিত্যপ্রয়োজনীয় অন্যান্য পণ্যে। দিন, সপ্তাহ ও মাসের ব্যবধানে চাল, চিনি, আটা, ডিম ও দুধের মতো নিত্যপণ্যের দাম ক্রমাগত বাড়ছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর কারওয়ান বাজার, হাতিরপুল ও রায়সাহেব বাজার ঘুরে বাজারদর ও কেনাকাটার এমন চিত্র দেখা যায়।
কারওয়ান বাজারে বাজার করতে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী নুহাস উদ্দীন বলছিলেন, ‘গত সপ্তাহের তুলনায় সবজির দাম কিছুটা কমেছে, যা কিছুটা স্বস্তি দিচ্ছে। কিন্তু আটা, চিনি ও দুধের দাম আবার নতুন করে বাড়ছে। এসব নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বাড়তে থাকলে সবজির দাম কমার সুফল সাধারণ মানুষ পায় না। ফলে পকেটের টানাটানি থেকেই যাচ্ছে।’
বাজার ঘুরে দেখা গেছে, সপ্তাহের ব্যবধানে অধিকাংশ সবজির দাম কেজিতে ১০ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত কমেছে। গতকাল প্রতি কেজি পটল বিক্রি হতে দেখা গেছে ৫০ টাকায় যা গত সপ্তাহে ছিল ৭০ টাকায়। শসা বিক্রি হচ্ছে ৫০ টাকায়, গত সপ্তাহে যা ছিল ৬০ টাকা, করলা ৭০ টাকা, বরবটি ৭০ টাকা, ধুন্দল ৬০ টাকা, ঝিঙে ৭০ টাকা এবং চিচিঙ্গা ৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
টানা বৃষ্টিতে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছিল কাঁচা মরিচ ও বেগুনের বাজারে। লাগামহীনভাবে বেড়ে কাঁচা মরিচের কেজি ৪০০ টাকা এবং বেগুন ১৫০ টাকায় ঠেকেছিল। সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ায় কাঁচা মরিচের দাম কমে বর্তমানে ১২০ টাকায় এবং বেগুন ৫০ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
এছাড়া বাজারে কাঁকরোল ৭০ টাকা, গাজর ১০০ টাকা, পেঁপে ৩০ টাকা, ঢ্যাঁড়শ ৫০ টাকা, টমেটো ১২০ টাকা, কচু ৭০ টাকা, মিষ্টি কুমড়া ৫০ টাকা, কাঁচা কলা হালিতে ৩০ টাকা, প্রতি পিস লাউ ৬০ টাকা এবং কচুর লতি ৭০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে।
আলুর দাম ৩০ টাকা এবং পেঁয়াজ ৫০ টাকা কেজিতে অপরিবর্তিত রয়েছে। মৌসুম শেষ হওয়ায় শীতকালীন সবজি শিম বিক্রি হচ্ছে ১৬০ টাকা কেজিতে, যা গত সপ্তাহে ছিল ২০০ টাকা।
রায়সাহেব বাজারের সবজি বিক্রেতা মো. মিলন জানালেন, গত মাসে বৈরি আবহাওয়ার কারণে সরবরাহ কম থাকায় দাম চড়া ছিল। বৃষ্টি কমায় এখন আড়তে সরবরাহ বেড়েছে, ফলে দামও কমছে। দাম হাতের নাগালে আসায় ক্রেতারাও এখন আগের চেয়ে বেশি পরিমাণে কেনাকাটা করছেন।
কাঁচাবাজারে সামান্য স্বস্তি মিললেও বিপরীত চিত্র চাল, চিনি, আটা ও দুধের বাজারে। বর্তমানে বাজারে চিনি প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ১৩০ টাকায়, যা গত সপ্তাহে ছিল ১১০ টাকা। মাসের শুরুতে যে আটা ৫৫ টাকা কেজিতে পাওয়া যেত, তা এখন বিক্রি হচ্ছে ৬৫ টাকায়।
সাধারণ চালের দামে বড় ধরনের পরিবর্তন না থাকলেও চড়া দামেই বিক্রি হচ্ছে পোলাও চাল। বাজারে খোলা পোলাওর চাল ১৯০ থেকে ২০০ টাকা এবং প্যাকেটজাত পোলাওর চাল ২২০ থেকে ২৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া বিভিন্ন ব্র্যান্ডের তরল দুধ প্রতি লিটার বিক্রি হচ্ছে ১১০ টাকায়, যা কিছুদিন আগেও ছিল ১০০ টাকা।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মেহেদি হাসান ক্ষোভ প্রকাশ করে বললেন, ‘মেসে থেকে পড়াশোনা করি। ডিম, দুধ, চিনি ও চাল আমাদের প্রাত্যহিক খরচের বড় অংশ। সবজির দাম কমলেও নিত্যপণ্যের দাম যেভাবে লাফিয়ে বাড়ছে, তাতে আমাদের মতো শিক্ষার্থীদের মাসিক বাজেটে বড় ধরনের টান পড়ছে।’
নিত্যপণ্যের দাম বাড়ার বিষয়ে খুচরা ব্যবসায়ী মো. রায়হানের ভাষ্য, ‘আমাদের বেশি দামে কিনে বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। কোম্পানিগুলো এক সপ্তাহের ব্যবধানে ৫০ কেজির চিনির বস্তায় প্রায় এক হাজার টাকা বাড়িয়েছে। ফলে খুচরা পর্যায়ে দাম বাড়ানো ছাড়া আমাদের কোনো উপায় নেই।’
বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, কাঁচাবাজারের অস্থিরতা মৌসুম ও আবহাওয়ার ওপর নির্ভরশীল হলেও আটা, চিনি বা দুধের মতো নিত্যপণ্যের দামের লাগামহীন বৃদ্ধি কেবল সরবরাহ সংকটের কারণে নয়। কর্পোরেট সিন্ডিকেট, পাইকারি পর্যায়ের অসাধু দালালি এবং তদারকির অভাবই এর জন্য প্রধানত দায়ী। খুচরা পর্যায়ে শুধু অভিযান না চালিয়ে আমদানিকারক ও মিল মালিকদের উৎপাদন ও বিক্রয়মূল্য নিয়মিত মনিটরিং এবং টিসিবির মাধ্যমে নিত্যপণ্যের খোলা বাজারে সরবরাহ বৃদ্ধি করা গেলে সাধারণ ক্রেতারা এই অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ভোগ থেকে রেহাই পেতে পারেন।






