নিভে থাকা সিগন্যাল বাতি
এআই ট্রাফিকের চোখ বেঁধে দিচ্ছে যে অন্ধকার
- সম্ভাবনার পথে বড় বাধা অচল সিগন্যাল বাতি
- আগস্টে বসছে আরও ২০০ এআই ক্যামেরা
- সড়কে ফিরছে শৃঙ্খলা, নিয়ম মানছেন ৬০-৮০% চালক
- অটোরিকশা বন্ধ না হলে সুফল মিলবে না বলছেন বিশেষজ্ঞরা

মাঝরাত। ফাঁকা গুলশানের সড়ক। নেই যানবাহনের চাপ, নেই কোনো ট্রাফিক পুলিশও। অথচ লাল বাতি জ্বলতেই থমকে গেল গাড়ি। চালক অপেক্ষা করছেন নিখুঁত নিয়মে, ঠিক জেব্রা ক্রসিংয়ের পেছনে। রাস্তা পুরোপুরি খালি, তবু কেউ সিগন্যাল ভাঙছেন না। সবুজ বাতি জ্বলার পরই শুধু চাকা ঘুরছে গাড়ির। গত কয়েকদিন রাজধানী ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি ট্রাফিক পয়েন্টে ঘুরে দেখা গেছে এমনই চিত্র।
অন্ধকারেও অদৃশ্য চোখ পাহারা দিচ্ছে ঢাকার রাজপথ। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির এই ‘ডিজিটাল প্রহরী’ বদলে দিচ্ছে ঢাকার চিরচেনা বিশৃঙ্খল সড়কব্যবস্থাকে। মামলার ভয়ে মাঝরাতেও এখন চালকদের মাঝে ফিরছে নিয়মের তাড়না। বিজয় সরণি থেকে শাহবাগ— গভীর রাতের বেপরোয়া ঢাকা এখন অনেকটাই সুশৃঙ্খল।
একসময় ট্রাফিক পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে উল্টোপথে চলা কিংবা সিগন্যাল ভাঙা ছিল নিত্যদিনের চিত্র। এখন সেই সুযোগ বন্ধ। রাজধানীর ১৯টি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে বসানো হয়েছে ৩৮টি আধুনিক এআই ক্যামেরা। এ ছাড়া এক্সপ্রেসওয়ের ৮০টিসহ মোট ১১৭টি ক্যামেরা নজর রাখছে দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগ জানিয়েছে, পর্যায়ক্রমে ঢাকার ১২০টি মোড়ে বসানো হবে অন্তত ৭০০ ক্যামেরা। এর মধ্যে আসছে আগস্টেই বসবে ২০০টি। শাহবাগ থেকে উত্তরা ও মতিঝিল এলাকায় নতুন ক্যামেরা বসানোর কাজ চলছে পুরোদমে।
এটি মূলত ‘পিটিজেড’ (প্যান-টিলাট-জুম) প্রযুক্তির ক্যামেরা, যা ৩৬০ ডিগ্রি ঘুরে অনুসরণ করতে পারে চলন্ত গাড়িকে।
এআই প্রযুক্তি মূলত প্রাথমিকভাবে ছয়টি অপরাধ শনাক্ত করছে। সেগুলো হলো— লাল বাতি অমান্য করা (রেড সিগন্যাল ভায়োলেশন), জেব্রা ক্রসিং বা স্টপ লাইন পার হওয়া, উল্টোপথে গাড়ি চালানো, যত্রতত্র গাড়ি থামিয়ে প্রতিবন্ধকতা তৈরি এবং বাম লেন ব্লক করে রাখা।
নিয়ম ভাঙলেই গাড়ির নম্বরপ্লেটসহ ছবি ও ভিডিও চলে যাচ্ছে ডিএমপির সার্ভারে। সেই সার্ভার যুক্ত বিআরটিএর ডেটাবেজের সঙ্গে। মুহূর্তেই মিলে যাচ্ছে মালিকের তথ্য। এরই মধ্যেই প্রায় ১ হাজার ৫০০টি মামলা দেওয়া হয়েছে। সবচেয়ে বেশি নিয়ম ভাঙার ঘটনা ঘটছে বাংলা মোটর ও গুলশান পুলিশ প্লাজা মোড়ে। বাসগুলো বেশি করছে লেন অমান্য, আর প্রাইভেট কার ভাঙছে স্টপ লাইনের নিয়ম।
ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগের সিনিয়র সিস্টেম অ্যানালিস্ট শারমিন আফরোজ জানালেন, সবচেয়ে বেশি মামলা হয়েছে বাসের বিরুদ্ধে। নিয়ম ভাঙার সবচেয়ে বেশি ঘটনা ঘটছে বাংলা মোটর সিগন্যালে। এরপর গুলশান পুলিশ প্লাজার সিগন্যালে। যান চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিতে শুধু বাসের বিরুদ্ধে ২৯ হাজার ১০১টি অভিযোগ শনাক্ত করেছে ক্যামেরা। আর ‘স্টপ লাইন’ ভায়োলেশন বেশি করছে প্রাইভেট কার বা ব্যক্তিগত গাড়ি।
ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মো. আনিছুর রহমান আগামীর সময়কে বলছিলেন, ‘এআই কোন কোন অপরাধ শনাক্ত করবে, সফটওয়্যারে সেগুলোর একটা নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তার ভিত্তিতেই অপরাধ শনাক্ত করে মামলা দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে আমরা দৃশ্যমান সফলতা পাচ্ছি। আমরা দেখেছি, গভীর রাত, ট্রাফিক পুলিশ নেই অথচ যানবাহন সিগন্যাল মেনে চলছে।’
এই পুলিশ কর্মকর্তা জানালেন, ১২০টি ইন্টারসেকশন বা মোড়ে এআই ক্যামেরা বসানো হবে। প্রতিটি মোড়ে গড়ে পাঁচ থেকে সাতটি করে ক্যামেরা প্রয়োজন হয়, সে হিসেবে অন্তত সাড়ে ৬০০ থেকে ৭০০ ক্যামেরা স্থাপন করা হবে। একপর্যায়ে পুরো ঢাকা শহরকে এর আওতায় আনা হবে।
প্রাথমিকভাবে সফটওয়্যারে ছয় ধরনের আইন অমান্যের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বললেন, পরবর্তী সময়ে গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ফোনে কথা বলা, সিটবেল্ট বাঁধাসহ আরও কিছু ফিচার অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
যদিও প্রযুক্তির এই দারুণ সুফলের মধ্যেও রয়ে গেছে বড় কিছু গলদ। কিছু কিছু ইন্টারসেকশন বা মোড়ে সিগন্যাল বাতি বন্ধ থাকায় নিয়মভঙ্গ শনাক্তকরণ থেকে শুরু করে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার অনেক ক্ষেত্রেই মিলছে না কাঙ্ক্ষিত সুফল। সেখানে পুলিশকে হাতের ইশারায় নিয়ন্ত্রণ করতে হয় গাড়ি। সিগন্যাল বাতি বন্ধ থাকলে বিভ্রান্ত হয় এআই ক্যামেরা। ফলে নির্ভুল মামলার জন্য পুলিশকে আবার ম্যানুয়ালি বিশ্লেষণ করতে হচ্ছে ফুটেজ। এ ছাড়া অনেক গাড়ির নম্বরপ্লেট ভাঙা বা অস্পষ্ট থাকায় ডিজিটাল শনাক্তকরণে হচ্ছে সমস্যা।
নগরের বিভিন্ন পয়েন্টে গত কয়েকদিন ঘুরে বেশ কয়েকটি ট্রাফিক সিগন্যাল বাতি বন্ধ দেখা গেছে। গত বুধবার বেলা ১১টা ৪৬ মিনিটে আব্দুল গনি রোডের সিগন্যালে বাতি বন্ধ দেখা গেছে। সেখানে ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করছিলেন পুলিশ সদস্যরা। অথচ ওই সিগন্যালে রয়েছে এআই ক্যামেরা। গত ২৮ জুন বেলা সাড়ে ৩টার দিকে ফার্মগেটের সিগন্যাল বাতি বন্ধ দেখা গেছে। এর বাইরে আরও কয়েকটি সিগন্যালে শুধু রাতেই নয়, দিনের বেলায়ও বন্ধ দেখা যায় সিগন্যাল বাতি।
ট্রাফিক পুলিশের দায়িত্বরত সদস্যরা জানালেন, সিগন্যাল বাতি বন্ধ থাকা পয়েন্টে মামলার ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নিতে বেগ পোহাতে হচ্ছে। নাম প্রকাশে অনাগ্রহী এক সার্জেন্ট বলছিলেন, ‘সিগন্যাল বাতির সঙ্গে এআই ক্যামেরার সফটওয়্যার ঠিক করা। সে অনুযায়ী যদি কাউকে মামলা দেওয়া হয়, পরে সেই ব্যক্তি এসে তো বলবে আপনার সিগন্যাল নেই, আমায় মামলা দিয়েছেন কোন আইনে? তখন তো বলার কিছু থাকবে না।’ এমন পরিস্থিতিতে ফুটেজ সংগ্রহের পর তা আবার ম্যানুয়ালি বিশ্লেষণ করা হচ্ছে বলে জানান ট্রাফিক বিভাগের দায়িত্বশীলরা।
ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগের প্রধান আনিসুর রহমান বলছিলেন, ‘ম্যানুয়ালি বিশ্লেষণের প্রধান কারণ হচ্ছে কাজ করতে গিয়ে কিছু বাস্তব সমস্যা দেখা দিয়েছে। গাড়ির নম্বর প্লেটগুলো সঠিক অবস্থায় নেই। কিছু কিছু ভাঙা। কিছু অস্পষ্ট। সরাসরি ভায়োলেশন থেকে মোবাইল ফোনে মেসেজ বা নোটিস পাঠিয়ে দিলে অনেক ক্ষেত্রে ভুল হয়ে যেতে পারে বা সুষ্ঠু বিচার নাও হতে পারে। সেজন্য ক্যামেরা মামলা দিলেও আমরা ম্যানুয়ালি এটি চেক করছি, যাতে আমাদের কোনো সমস্যা না থাকে।’
প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় আরও স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়বে বলে মনে করেন যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, একই সঙ্গে শৃঙ্খলা ফেরাতে ঢাকার মূল সড়ক থেকে অটোরিকশা বন্ধ করা গেলে এআইর ফল পুরোপুরি মিলবে।
যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান আগামীর সময়কে বললেন, ‘বিশ্বের যেসব শহর এআই প্রযুক্তির সুফল পেয়েছে, তারা পুরো ট্রাফিক ইকোসিস্টেম বদলে ফেলেছে। ঢাকার মূল সড়ক থেকে অনিবন্ধিত অটোরিকশা ও ইজিবাইক বন্ধ না করলে এআইর পূর্ণ সুফল মিলবে না।’
চালকরাও এখন অভ্যাসের পরিবর্তন টের পাচ্ছেন। নিয়ম ভাঙলে মামলার পাশাপাশি চালকের লাইসেন্সের পয়েন্টও কাটা যাচ্ছে। বাংলা মোটর মোড়ে এই প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা হলো শিকড় পরিবহনের চালক মো. রফিকের। তিনি বললেন, ‘সিগন্যাল পড়ে গেছে, দাঁড়ায়া গেছি। আগে তো এই সিস্টেম ছিল না। মানুষ ইচ্ছা করে এখন দাঁড়ায় মামলার ভয়ে। আগে সবাই সিগন্যাল অমান্য করে চলাফেরা করত, যে যেভাবে পারত চলত। এখন নিয়মশৃঙ্খলার সঙ্গে চলাফেরা করতেছি। চালকদের মধ্যে নিয়ম মানার বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়েছে। ৬০ থেকে ৮০ শতাংশ মানুষ এখন নিয়ম মেনে চলছে।’
বিকল্প পরিবহনের আরেক চালকের সরল স্বীকারোক্তি— ‘সিস্টেম চেঞ্জ হচ্ছে, তাই আমরাও চেঞ্জ হচ্ছি।’
তবে চালকদের দাবি, শুধু নিবন্ধিত যানবাহন আইনের আওতায় আনলেই সমস্যার সমাধান হবে না। অনিবন্ধিত অটোরিকশা ও ইজিবাইক নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে ঢাকা কার্যত অচল হয়ে পড়বে।
রাজধানীর ট্রাফিক ব্যবস্থার আধুনিকায়ন বড় সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে। মধ্যরাতের ফাঁকা রাস্তায় গাড়ির লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার দৃশ্য সুশৃঙ্খল এক দেশের স্বপ্ন দেখায়। কিন্তু সেই স্বপ্নের পায়ে শিকল পরিয়ে রাখছে সিটি করপোরেশন ও ট্রাফিক বিভাগের সমন্বয়হীনতার প্রতীক নিভে থাকা সিগন্যাল বাতিগুলো। অদৃশ্য চোখের কড়া নজরদারি তখনই শতভাগ সফল হবে, যখন তার সামনে আলো জ্বলে উঠবে। নিভে থাকা বাতিগুলোর অন্ধকার দূর করে ঢাকাকে একটি প্রকৃত স্মার্ট ও সুশৃঙ্খল নগরী হিসেবে গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। সিস্টেমের পরিবর্তন যদি চালককে বদলাতে পারে, তবে সেই সিস্টেমকে সচল রাখার দায়িত্ব পুরোপুরি প্রশাসনের।





