আধুনিক ট্রাফিক ব্যবস্থায় ‘লাল-হলুদ-সবুজ বাতি’

ড. আব্দুল জব্বার খাঁন
ঢাকা শহরের বিভিন্ন সড়ক সংযোগস্থলে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) করা নকশায় আধুনিক ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থা স্থাপন করা হচ্ছে। মূল উদ্দেশ্য, পথচারী ও চালকদের ট্রাফিক ব্যবস্থার সঙ্গে অভ্যস্ত করে তোলা। লাল, হলুদ ও সবুজ বাতিনির্ভর ট্রাফিক সিগন্যাল আধুনিক ট্রাফিক ব্যবস্থার প্রথম ধাপ। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ভবিষ্যতে ট্রাফিক ব্যবস্থায় আরো অনেক কিছু যুক্ত হবে।
দীর্ঘদিন ধরে রাজধানীর সড়কগুলোতে ট্রাফিক পুলিশের হাতের ইশারার ওপর নির্ভর করে যানবাহন ও পথচারীদের চলাচল নিয়ন্ত্রিত হয়েছে। ফলে অনেকেই কার্যত সিগন্যাল বাতির অর্থ ও ব্যবহার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন। ট্রাফিক পুলিশের জন্য এটি যেমন শারীরিকভাবে ক্লান্তিকর, তেমনি সড়ক ব্যবহারকারীদের জন্যও হাতের ইশারা সবসময় স্পষ্ট ও দৃশ্যমান থাকে না। ফলে এই পদ্ধতিকে একদিকে অমানবিক, অন্যদিকে অবৈজ্ঞানিক বললেও অত্যুক্তি হবে না।
পাশের দেশ ভারতে প্রায় দেড় দশক আগেই বড় শহরগুলোতে রাস্তায় দাঁড়িয়ে হাতের ইশারায় ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের প্রচলন কমিয়ে আনা হয়। সেখানে বিকল্প হিসেবে সংযোগস্থলের পাশে চারদিক উন্মুক্ত পুলিশ বক্সে বসে ট্রাফিক পুলিশ বিভিন্ন দিকের যানবাহনের চাপ পর্যবেক্ষণ করে ম্যানুয়ালি সিগন্যাল বাতি নিয়ন্ত্রণ করতেন। দীর্ঘ সময় ধরে এই ব্যবস্থা কার্যকরভাবে পরিচালিত হয়েছে।
ঢাকায় বর্তমানে যে ব্যবস্থা চালু করা হচ্ছে, তা মূলত সেই ধারণার একটি উন্নত সংস্করণ। বুয়েটের নকশা করা এই সিস্টেমে প্রতিটি সংযোগস্থলে উন্নতমানের ক্যামেরা সংযুক্ত করা হয়েছে, যা কার্যত ট্রাফিক পুলিশের ‘চোখ’ হিসেবে কাজ করবে। ট্রাফিক পুলিশ সংযোগস্থলের নিকটবর্তী নিয়ন্ত্রণকক্ষ থেকে চারপাশের যানবাহনের চাপ পর্যবেক্ষণ করে প্রয়োজন অনুযায়ী লাল, হলুদ ও সবুজ বাতি পরিচালনা করবেন। ব্যস্ত সময়ে (পিক আওয়ারে) এই নিয়ন্ত্রণ হবে পরিস্থিতিনির্ভর, আর অপেক্ষাকৃত কম ব্যস্ত সময়ে (অফ-পিক আওয়ারে) পূর্বনির্ধারিত টাইমার অনুযায়ী সিগন্যাল পরিচালিত হবে। এই টাইমার নির্ধারণ করা হবে তথ্য-উপাত্ত, পর্যবেক্ষণ ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে।
এখানে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা প্রয়োজন। কিছু সংযোগস্থলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) সমৃদ্ধ ক্যামেরার মাধ্যমে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) যে স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন শনাক্তকরণ ও জরিমানা ব্যবস্থা চালু হয়েছে, তার সঙ্গে বুয়েটের এই সিগন্যাল নিয়ন্ত্রণ প্রকল্পের কোনো সম্পর্ক নেই। দুটি উদ্যোগ সম্পূর্ণ আলাদাভাবে পরিচালিত হচ্ছে।
বুয়েটের সিগন্যাল ব্যবস্থার পরবর্তী ধাপ হবে এআই ও ওয়েবভিত্তিক স্বয়ংক্রিয় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা। সে পর্যায়ে একটি সংযোগস্থলের ট্রাফিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাজ করবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। তবে প্রয়োজন হলে পুলিশ দূরবর্তী স্থান থেকেও ওয়েবভিত্তিক ব্যবস্থার মাধ্যমে হস্তক্ষেপ করতে পারবেন। ফলে ট্রাফিক পুলিশকে আর ঘণ্টার পর ঘণ্টা সড়কে দাঁড়িয়ে সিগন্যাল পরিচালনা করতে হবে না; বরং তারা ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ এবং সড়ক শৃঙ্খলা রক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজে অধিক মনোযোগ দিতে পারবেন।
২০২৩ সালে পরীক্ষামূলকভাবে গুলশান-২ সংযোগস্থলে এই পদ্ধতি চালু করা হয়েছিল। বর্তমানে এ ব্যবস্থাকে আরও বিস্তৃত পরিসরে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তবে আধুনিক বিশ্বের অভিজ্ঞতা বলে, একটি কার্যকর ও সমন্বিত ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থা গড়ে তুলতে শুধু সিগন্যাল স্থাপনই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি ট্রাফিক প্যাটার্ন বিশ্লেষণ, সিমুলেশন, সময়ভিত্তিক রুট ব্যবস্থাপনা, ডেটা-নির্ভর সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং সমন্বিত পরিকল্পনা। ঢাকার মতো একটি জনবহুল মহানগরে প্রতি মিনিটে বিপুল পরিমাণ ট্রাফিক ডেটা তৈরি হয়। এসব তথ্য সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বিশ্লেষণের জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী কম্পিউটেশনাল অবকাঠামো, দক্ষ মানবসম্পদ এবং সর্বোপরি সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও নীতিগত অগ্রাধিকার।
একটি দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা শুধু যান চলাচল সহজ করে না; এটি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, উৎপাদনশীলতা এবং নাগরিক জীবনের মানোন্নয়নেরও অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। তাই ঢাকার আধুনিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় এই উদ্যোগকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনা হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।
লেখক : অধ্যাপক, পুরকৌশল বিভাগ
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)




