রাজধানীর দুই সিগন্যালে এআই ক্যামেরা বন্ধের খবর গুজব, বলছে ডিএমপি

সংগৃহীত ছবি
রাজধানীর কারওয়ান বাজার ও বাংলামোটর এলাকায় স্থাপিত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) ক্যামেরা স্থগিত বা অচল হয়ে গেছে—এমন দাবি সম্বলিত কিছু ফটোকার্ড ও ছবি সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। তবে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) বলছে, এ ধরনের তথ্য সঠিক নয়। বর্তমানে সব এআই ক্যামেরা সচল রয়েছে এবং স্বাভাবিকভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ফটোকার্ডগুলোতে লেখা ছিল, ‘কারওয়ান বাজারের পর স্থগিত হলো বাংলামোটরের এআই ক্যামেরা’। পোস্টগুলো দ্রুত বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে পড়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়। অনেকেই ধারণা করেন, রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এই দুই এলাকায় প্রযুক্তিনির্ভর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
তবে সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, কারওয়ান বাজার এলাকায় এআই ক্যামেরা ব্যবস্থাপনা সাময়িকভাবে ব্যাহত হলেও সেটি কোনো নীতিগত সিদ্ধান্ত বা কার্যক্রম স্থগিতের কারণে নয়। মূলত বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ লাইনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু কারিগরি কাজ চলাকালে ক্যামেরা ব্যবস্থার সংযোগ তার কেটে যায়। এতে সাময়িকভাবে ক্যামেরাগুলোর কার্যক্রম বন্ধ হয়ে পড়ে। পরে ত্রুটি মেরামত করে আবারও ক্যামেরাগুলো সচল করা হয়।
ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগের অতিরিক্ত কমিশনার আনিছুর রহমান গণমাধ্যমকে বলেছেন, ‘বৈদ্যুতিক লাইনে কাজ করার সময় সংশ্লিষ্ট কর্মীরা ভুলবশত ক্যামেরা ব্যবস্থার তার কেটে ফেলেন। ফলে প্রায় দুই দিন এআইভিত্তিক নজরদারি ব্যবস্থা বন্ধ ছিল। পরে ক্ষতিগ্রস্ত সংযোগ পুনঃস্থাপন এবং কারিগরি ত্রুটি সমাধানে কিছু সময় লাগে।’
তিনি বলেছন, ‘এআই ক্যামেরা স্থগিত করা হয়েছে—এমন তথ্য সঠিক নয়। লাইনের কাজের সময় তার কেটে যাওয়ার কারণে সাময়িকভাবে সমস্যা তৈরি হয়েছিল। সেটি মেরামত করা হয়েছে। বর্তমানে সব ক্যামেরা পুরোপুরি সচল রয়েছে এবং নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনা করছে।’
সংশ্লিষ্টরা জানান, রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ মোড় ও সড়কে যান চলাচল পর্যবেক্ষণ, ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন শনাক্তকরণ এবং আধুনিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে এআই ক্যামেরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। প্রযুক্তিনির্ভর এই ব্যবস্থার মাধ্যমে যানবাহনের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ, বিভিন্ন ধরনের ট্রাফিক অপরাধ শনাক্ত এবং তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হচ্ছে।
ক্যামেরা বন্ধ করে টাকা আদায়ের অভিযোগ
এদিকে সড়কে বসানো এআই প্রযুক্তির ক্যামেরাগুলো ম্যানুয়ালি বন্ধ ও সচল করা যায় বলে অভিযোগ উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করা হচ্ছে, ক্যামেরা বন্ধ করে ট্রাফিক পুলিশ সদস্যরা গাড়ি আটকিয়ে অবৈধভাবে অর্থ আদায় করছেন।
ফেসবুকের ‘ট্রাফিক এলার্ট’ গ্রুপে এস এম নাহিদুর রহমান নামের একজন গতকাল বৃহস্পতিবার বিকাল ৩টা ৯ মিনিটে একটি পোস্ট দেন। সেখানে তিনি দাবি করেন, বাংলামোটরে সিগন্যাল অতিক্রমের সময় সবুজ বাতির পর হলুদ না জ্বলে সরাসরি লাল বাতি জ্বলে ওঠে। পরে ট্রাফিক পুলিশ তাকে আটক করে এবং ৬ হাজার টাকার মামলার ভয় দেখিয়ে ৫০০ টাকা নিয়ে ছেড়ে দেয়।
পোস্টে তিনি লিখেছেন, ‘আজ বুঝলাম, এআই তো এমন ভুল করার কথা না। এতদিন জানতাম, এআই মানুষের চাকরি খেয়ে দেবে। এখন দেখি, আমাদের পুলিশই উল্টো এআইয়ের চাকরি খেয়ে দিয়েছে।’
এ বিষয়ে অতিরিক্ত কমিশনার আনিছুর রহমান বলেছেন, ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যেসব অভিযোগ দেখা যাচ্ছে, সেগুলোর সুনির্দিষ্ট প্রমাণ আমাদের কাছে কেউ দিলে আমরা সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেব। কোনো ট্রাফিক সার্জেন্ট বা সদস্য যদি সিগন্যাল ভঙ্গের মামলার পরিবর্তে অবৈধভাবে অর্থ গ্রহণ করে থাকে, তার প্রমাণ দেখানোর সঙ্গে সঙ্গে তাকে ঘটনাস্থলেই সাময়িক বরখাস্ত (সাসপেন্ড) করা হবে। এ বিষয়ে আমাদের অবস্থান জিরো টলারেন্স।’
তিনি আরও বলেছেন, ‘ভিডিও ফুটেজ, ছবি বা অন্য কোনো গ্রহণযোগ্য প্রমাণ পাওয়া গেলে আমরা তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবো। অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট সদস্যের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
উল্লেখ্য, রাজধানীতে ট্রাফিক শৃঙ্খলা ফেরাতে ডিএমপি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ট্রাফিক সিগন্যাল ও ক্রসিংয়ে উন্নত প্রযুক্তির এআই ক্যামেরা স্থাপন করেছে। এসব ক্যামেরার ফুটেজের ভিত্তিতে লাল বাতির সিগন্যাল অমান্য, স্টপ লাইন অতিক্রম, উল্টো পথে চলাচল, যত্রতত্র যাত্রী ওঠানো-নামানো, অবৈধ পার্কিং, লেফট লেন ব্লকসহ বিভিন্ন অপরাধে ডিজিটাল প্রসিকিউশন বা মামলা দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি যানবাহনের মালিক ও চালকের কাছে নোটিশও পাঠানো হচ্ছে।
প্রযুক্তিনির্ভর এই নজরদারি ব্যবস্থার ফলে রাজধানীর সড়কে ইতোমধ্যে ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। ধীরে ধীরে ফিরছে যান চলাচলের শৃঙ্খলা। আইন মানতে বাধ্য হচ্ছেন চালকেরা। আগে যেখানে ট্রাফিক সার্জেন্টদের উপস্থিতিতেও অনেক চালক নিয়ম অমান্য করতেন, সেখানে এআই ক্যামেরার নজরদারিতে তা অনেকাংশে কমে এসেছে।




