রবীন্দ্রনাথ ও তাসনীম সিরাজকে ঘিরে দুই ঘটনায় একই উদ্দেশ্য দেখছেন ৩৭ নাগরিক

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গ্রাফিতিতে কালি লেপনের চেষ্টা এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ইংরেজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক তাসনীম সিরাজ মাহবুবের বিরুদ্ধে এক শিক্ষার্থীর পোশাক নিয়ে ‘কথিত মন্তব্যের’ অভিযোগে শাস্তি দাবির ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ৩৭ জন বিশিষ্ট নাগরিক।
তাদের অভিযোগ, ধর্মীয় বিশ্বাস ও অনুভূতি পুঁজি করে ধর্মান্ধতা উসকে দেওয়ার পরিকল্পিত চেষ্টা চলছে। ঘটনা দুটি বিচ্ছিন্ন হলেও এর উদ্দেশ্য একই। একটি মহল যেকোনো অজুহাতে সামাজিক অস্থিরতা ও সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টিতে তৎপর।
বিবৃতিতে বলা হয়, গত ৭ অক্টোবর ঢাবির ইংরেজি বিভাগের মাস্টার্সের শেষ সেমিস্টারের শিক্ষার্থী সুমি আক্তার ফেসবুকে একটি পোস্ট দেন। সেখানে তিনি অভিযোগ করেন, ক্লাসের শুরুতে সহযোগী অধ্যাপক তাসনীম সিরাজ মাহবুব শিক্ষার্থীদের আর্থিক অবস্থা ও পোশাক নিয়ে মন্তব্য করেন। পরে নিকাব পরা এক শিক্ষার্থীকে তিনি বলেন, এভাবে পর্দা করার প্রয়োজন নেই, মুখ খোলা রাখা যায় এবং হাত-পা ঢাকারও প্রয়োজন নেই। এ ঘটনার পর সুমিসহ আরও দুই শিক্ষার্থী ক্লাস থেকে বের হয়ে যান। পরে একটি ছাত্রসংগঠনের ব্যানারে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়ে তাসনীম সিরাজ মাহবুবের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়। তবে অন্য শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে এ বিষয়ে ভিন্নমতও পাওয়া গেছে বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।
পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ ঘটনার ব্যাখ্যা দিয়েছেন তাসনীম সিরাজ মাহবুব। তিনি জানিয়েছেন, নিকাব পরা এক শিক্ষার্থীকে পোশাক পরিবর্তন করতে, নিকাব খুলতে কিংবা ক্লাস ত্যাগ করতে তিনি নির্দেশ দেননি। বরং শিক্ষার্থীর চোখ দেখতে না পাওয়ায় তাকে শনাক্ত করা ও কার্যকর যোগাযোগ স্থাপনে অসুবিধা হচ্ছিল। এ কারণে তিনি নিজের অস্বস্তির কথা জানিয়েছিলেন।
তার বক্তব্য উদ্ধৃত করে বিবৃতিতে বলা হয়, প্রায় ৩৪ বছরের শিক্ষকতা জীবনে শিক্ষার্থীরা তার ধর্মীয় বিশ্বাস, মূল্যবোধ ও আচরণ সম্পর্কে জানেন। কোনো শিক্ষার্থীর ধর্মীয় বিশ্বাস বা পোশাক অবমাননা করার প্রশ্নই আসে না। ক্লাস শেষে কোনো শিক্ষার্থী কষ্ট পেয়ে থাকলে দুঃখপ্রকাশ করার জন্য তিনি ওই শিক্ষার্থীকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু শিক্ষার্থী তার সঙ্গে দেখা না করে বিষয়টি রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের চেষ্টা করেছেন বলে তিনি মনে করেন।
বিবৃতিতে গত ৯ অক্টোবরের আরেকটি ঘটনা উল্লেখ করে বলা হয়, ‘রাষ্ট্র সংলাপ ফোরাম’-এর ব্যানারে কয়েকজন যুবক ও এক তরুণী ‘ভারতীয় আগ্রাসনের’ প্রতিবাদের নামে শিল্পকলা একাডেমির দেয়ালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গ্রাফিতিতে কালি লেপনের চেষ্টা করে। তবে ঘটনাস্থলে থাকা পুলিশ তাদের নিবৃত্ত করে।
এর আগে ৫ অক্টোবর সেগুনবাগিচার ফুটপাত দখলমুক্ত করে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। পরে ফুটপাতসংলগ্ন দেয়ালে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, সত্যজিৎ রায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও কাজী নজরুল ইসলামসহ শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে অবদান রাখা বিশিষ্ট ব্যক্তিদের গ্রাফিতি আঁকা হয়। কিন্তু ৯ অক্টোবর ‘জুলাই রেভ্যুলুশনারি অ্যালায়েন্স’ নামের একটি ফেসবুক পেজ থেকে এসব গ্রাফিতি আঁকার বিষয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। সত্যজিৎ রায় ও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে ‘পশ্চিমবঙ্গের সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব’ আখ্যা দিয়ে তাদের গ্রাফিতি আঁকা নিয়ে আপত্তি জানানো হয়।
বিবৃতিদাতাদের মতে, শিল্প-সংস্কৃতির ওপর এ ধরনের আক্রমণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ। বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সহযোগী অধ্যাপক শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীকে কী বলেছেন, তা নিয়ে অভিযোগ তুলে তার শাস্তি দাবি করা যেমন আপত্তিকর, তেমনি বিশ্বকবি ও বাংলাদেশের জাতীয় সংগীতের রচয়িতা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে অসম্মান করাও সৎ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত নয়, বরং গভীর দুরভিসন্ধিমূলক।
বিবৃতিতে গত শতকের ষাটের দশকে পাকিস্তানি শাসকেরা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে রবীন্দ্রনাথকে মুসলিমবিদ্বেষী হিসেবে চিত্রিত করার অপপ্রচার চালিয়েছিল বলে উল্লেখ করা হয়। একইসঙ্গে দুই ঘটনায় দেশের অধিকার ও সংস্কৃতিসচেতন মানুষ এবং নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীরা বিভ্রান্ত হবেন না বলেও তারা আশা প্রকাশ করেন।
বিবৃতিতে সই করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ, মানবাধিকারকর্মী সুলতানা কামাল, নিজেরা করি’র সমন্বয়কারী খুশী কবির, নারীপক্ষের সদস্য শিরীন পারভিন হক, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান, লেখক ও সাংবাদিক আবু সাঈদ খান, সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জেড আই খান পান্না, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম, আলোকচিত্রী শহিদুল আলম, এএলআরডির নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা, ঢাবি অধ্যাপক ড. সামিনা লুৎফা, ড. গীতি আরা নাসরীন, ড. তানজীমউদ্দিন খান, ড. জোবাইদা নাসরীন ও রোবায়েত ফেরদৌস।
এছাড়াও সই করেছেন লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকস অ্যান্ড পলিটিক্যাল সায়েন্সের ভিজিটিং প্রফেসর ড. স্বপন আদনান, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. নোভা আহমেদ, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. ফিরদৌস আজিম, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ফারাহ তানজীম তিতিল, লেখক রেহনুমা আহমেদ, সাংবাদিক ও গবেষক সায়দিয়া গুলরুখ, সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সুব্রত চৌধুরী, লেখক ও গবেষক পাভেল পার্থ, নৃবিজ্ঞানী ও গবেষক ড. ঈশিতা দস্তিদার, গবেষক ও মানবাধিকারকর্মী সাদাফ নুর, বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মনিন্দ্র কুমার নাথ, নাগরিক উদ্যোগের প্রধান নির্বাহী জাকির হোসেন, মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী সাইদুর রহমান, সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক সালেহ আহমেদ, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক মো. আলমগীর কবির, কবি ও প্রাবন্ধিক শাহেদ কায়েস, কবি ও আদিবাসী সংস্কৃতিকর্মী মিঠুন রাকসাম, কবি ও আদিবাসী কর্মী হাফিজ রশিদ খান, মানবাধিকারকর্মী সাঈদ আহমেদ, দীপায়ন খীসা, অধিকারকর্মী ড. হানা শামস আহমেদ ও মুক্তাশ্রী চাকমা।




