একসময়ের শিক্ষক, এবার জাতির অভিভাবক

২৩তম রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর
ছাত্রনেতা থেকে শিক্ষক, এরপর রাজনীতির মাঠে লড়াকু নেতা। তৃণমূলের রাজনীতি পেরিয়ে পৌর চেয়ারম্যান, সংসদ সদস্য, মন্ত্রী এবং বিএনপির মহাসচিবের দায়িত্ব সামলে এবার দেশের রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ৩৫ বছর পর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোটাভুটিতে তিনি পেয়েছেন ২৫৫ ভোট। তার প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্য সমর্থিত প্রার্থী কর্নেল (অব.) অলি আহমদ পেয়েছেন ৮৮ ভোট।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে মোট ভোটার ছিলেন ৩৪৯ জন সংসদ সদস্য। তাদের মধ্যে ভোট দিয়েছেন ৩৪৩ জন। ভোটদানে বিরত ছিলেন ছয়জন। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুর ২টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত সংসদ ভবনে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়।
আজ শুক্রবার সন্ধ্যায় বঙ্গভবনে নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতিকে শপথ পড়ান জাতীয় সংসদের ভারপ্রাপ্ত স্পিকার কায়সার কামাল।
বঙ্গভবনের বাসিন্দা হওয়ার মধ্য দিয়ে দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের আরেকটি অধ্যায়ে প্রবেশ করলেন মির্জা ফখরুল। শিক্ষকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করলেও সাধারণ মানুষের অধিকার ও রাজনীতির প্রতি আকর্ষণ তাকে শেষ পর্যন্ত রাজপথে নিয়ে আসে।
ছাত্রনেতা থেকে শিক্ষক
১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁও শহরের কালিবাড়ি এলাকায় জন্ম মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের। তার বাবা মির্জা রুহুল আমিন ছিলেন আইনজীবী, পাকিস্তান প্রাদেশিক আইনসভার দুইবারের সদস্য এবং বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ সদস্য। এরশাদ সরকারের মন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন তিনি। মা মির্জা ফাতেমা আমিন।
ছোটবেলা থেকেই মেধাবী ছাত্র হিসেবে পরিচিত ছিলেন মির্জা ফখরুল। ঠাকুরগাঁওয়ে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা শেষে ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
ঢাবিতে পড়াশোনার সময়ই সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে পড়েন বাম ধারার ছাত্ররাজনীতিতে। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি এবং এসএম হলের নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক ছিলেন তিনি। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময়ও ছাত্রনেতা হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
শিক্ষাজীবন শেষে যোগ দেন শিক্ষকতায়। কর্মজীবনের শুরুতে ঢাকা কলেজের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক ছিলেন তিনি। তবে রাজনীতি ও সাধারণ মানুষের অধিকার নিয়ে কাজ করার আকাঙ্ক্ষা তাকে শিক্ষকতার নিরাপদ পেশা থেকে দূরে নিয়ে যায়। ১৯৮৬ সালে চাকরি ছেড়ে সক্রিয় হন রাজনীতিতে।
তৃণমূল থেকে জাতীয় রাজনীতিতে
রাজনীতিতে তার আনুষ্ঠানিক পথচলা শুরু হয়েছিল আবদুল হামিদ খান ভাসানীর ন্যাপে। পরে যোগ দেন বিএনপিতে। ১৯৭৯ সালে জিয়াউর রহমানের শাসনামলে তৎকালীন উপপ্রধানমন্ত্রী এস এ বারীর একান্ত সচিবের দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৮৮ সালে ঠাকুরগাঁও পৌরসভা নির্বাচনে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। এরপর ধীরে ধীরে জেলা ও কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে নিজের অবস্থান তৈরি করেন। ১৯৯২ সালে ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি হন। পরে বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব এবং ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করেন।
২০১১ সাল থেকে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করেন মির্জা ফখরুল। ২০১৬ সালে দলের ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলে তিনি মহাসচিব নির্বাচিত হন। বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে আসার আগে জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের প্রথম সহসভাপতি এবং পরে সভাপতির দায়িত্বও পালন করেছেন।
আন্দোলনের মাঠে দৃশ্যমান নেতৃত্ব
বিএনপির দীর্ঘ রাজনৈতিক সংকটের সময় দলের গুরুত্বপূর্ণ মুখ হয়ে ওঠেন মির্জা ফখরুল। এক-এগারোর পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতি থেকে আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনামল—বিভিন্ন সময়ে দলীয় কর্মসূচি ও আন্দোলনে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন মির্জা ফখরুল।
বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া দীর্ঘ সময় কারাগারে থাকাকালে এবং পরে অসুস্থতার কারণে সক্রিয় রাজনীতি থেকে দূরে থাকলে দেশে থেকেই দলের নেতৃত্বে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন মির্জা ফখরুল। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানও দীর্ঘদিন দেশের বাইরে থাকায় বিএনপির আন্দোলন ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে দৃশ্যমান নেতৃত্ব দেন মির্জা ফখরুল।
রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে তাকে একাধিকবার কারাবরণও করতে হয়েছে। দলের শীর্ষ দুই নেতার অনুপস্থিতিতে বিএনপির সংকট মোকাবিলা এবং আওয়ামী লীগবিরোধী আন্দোলন গড়ে তুলতে মির্জা ফখরুলের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
সংসদ ও মন্ত্রিসভায়
২০০১ সালে অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে ধানের শীষ প্রতীকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন মির্জা ফখরুল। একই সময়ে খালেদা জিয়ার সরকারে কৃষি এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।
২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ ও বগুড়া-৬ আসনে প্রার্থী হন তিনি। বগুড়া-৬ আসন থেকে নির্বাচিত হলেও ভোট কারচুপির অভিযোগ তুলে বিএনপি সংসদে যোগ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলে তিনি শপথ নেননি। পরবর্তী সময়ে এ ঘটনা সংসদীয় রাজনীতিতে আলোচিত হয়ে ওঠে।
পরবর্তী সময়ে মির্জা ফখরুল স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বও পালন করেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পাশের আসনটি তার জন্য নির্ধারিত হয়েছে।
এবার রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে
দীর্ঘ শিক্ষকতা, তৃণমূলের রাজনীতি, দলীয় নেতৃত্ব, সংসদ ও মন্ত্রিসভার দায়িত্ব—সব মিলিয়ে কয়েক দশকের রাজনৈতিক পথ পেরিয়ে এবার দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে বসছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ২৫৫ ভোটের জয় তাকে দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতির মর্যাদায় নিয়ে এসেছে। একসময় শ্রেণিকক্ষে অর্থনীতি পড়ানো শিক্ষক থেকে এখন রাষ্ট্রের সাংবিধানিক অভিভাবকের দায়িত্বে তিনি। রাজনৈতিক জীবনের দীর্ঘ পথচলায় এটি সবচেয়ে বড় অধ্যায় তার।
ব্যক্তিজীবন
ব্যক্তিজীবনে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর স্ত্রী রাহাত আরা বেগম এবং দুই মেয়ে মির্জা শামারুহ ও মির্জা সাফারুহকে নিয়ে তার পরিবার।
রাহাত আরা বেগম একটি বেসরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের উচ্চপদে দায়িত্ব পালন করেছেন। বড় মেয়ে মির্জা শামারুহ অস্ট্রেলিয়ায় বসবাস করছেন এবং সিডনিতে পোস্ট-ডক্টরাল ফেলো হিসেবে কর্মরত। ছোট মেয়ে মির্জা সাফারুহ ঢাকার একটি ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলে শিক্ষকতা করছেন।








