দিশাহারা ঢাকায় আশ্বাসেই আটকে মশানিধন

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
রবিবার বেলা ৩টার কিছু পর। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র হানিফ মিলনায়তনে চলছে মিলাদ ও দোয়া মাহফিল। ভেতরে ছিলেন প্রশাসক মো. আব্দুস সালাম। বাইরে তার অপেক্ষায় ছিলেন অনেকে। কিন্তু প্রশাসক কখন বের হবেন, সেদিকে কারও মনোযোগ নেই। সবাই ব্যস্ত মশা তাড়াতে। এই যখন মশকনিধনকারী প্রতিষ্ঠানের ভেতরের চিত্র, তখন সাধারণ ঢাকাবাসী মশার যন্ত্রণায় কতটা নাকাল, তা বলাই বাহুল্য।
মশার যন্ত্রণার পাশাপাশি বাড়ছে ডেঙ্গুর ভয়ও। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১৮ আগস্ট পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২৫ হাজার ৬০১ জন। মৃত্যু হয়েছে ৭৪ জনের। এর মধ্যে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় আক্রান্ত হয়েছেন ৬ হাজার ৭৫৬ জন এবং মারা গেছেন ৩৩ জন। অর্থাৎ ডেঙ্গুতে মোট মৃত্যুর প্রায় ৪৫ শতাংশই দুই সিটি করপোরেশন এলাকায়। আর দুই সিটির বাইরে ঢাকা বিভাগে মোট আক্রান্ত ৩ হাজার ৪৭৯ এবং মৃত্যু ১ জনের।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, ড্রেন-নালা থেকে শুরু করে অলিগলি, এমনকি ঘরের ভেতরেও মশার উপদ্রব বেড়েছে। কীটতত্ত্ববিদদের মতে, রাজধানীতে এডিস ও কিউলেক্স মশার লার্ভার ঘনত্ব এখন ৩০-এর কোঠায়। গত বছরের তুলনায় এ বছর লার্ভার উপস্থিতি প্রায় তিন গুণ বেড়েছে, যা উদ্বেগজনক— বলছেন বিশেষজ্ঞরা।
নিয়মিত লার্ভিসাইডিং ও ফগিংয়ের কথা বলছে দুই সিটি করপোরেশন। তবে মাঠের বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। পরিদর্শন, লার্ভা খোঁজার নামে ড্রোন ওড়ানো কিংবা চিরুনি অভিযানের ছবি প্রকাশেই যেন সীমাবদ্ধ থাকছে মশকনিধনের বড় অংশ।
তবে দুই সিটির প্রশাসকরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে বলে দাবি করেছেন। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান আগামীর সময়কে বলেছেন, ডেঙ্গুতে যারা মারা গেছেন, তাদের অধিকাংশই ঢাকার বাইরের বাসিন্দা। মশকনিধনে স্বাস্থ্য বিভাগ নিয়মিত কাজ করছে বলেও দাবি করেন তিনি। দুটি নতুন কীটনাশক আনার কথাও জানান। তবে মাঠপর্যায়ে কবে নাগাদ এর প্রয়োগ শুরু হবে, সে বিষয়ে তিনি কোনো আলোকপাত করেননি।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. আব্দুস সালামও সিটি করপোরেশন এলাকায় মশক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে বলে দাবি করেন। তার কার্যালয়ের সামনেই মশার উপদ্রবের কথা জানানো হলে তিনি হেসে আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘আমি তো দেখিনি এমন কিছু। অবশ্য আমাকে দেখে বোধহয় মশা ভয় পায়!’ পরে বিষয়টি খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন তিনি।
বিশেষজ্ঞরা অবশ্য প্রশাসকদের এই দাবির সঙ্গে একমত নন। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. বে-নজির আহমেদ বলেছেন, আগামী ২০ থেকে ৩০ বছর ডেঙ্গু ঢাকাসহ সারা দেশের জন্য বড় মাথাব্যথার কারণ হবে। তার মতে, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা, দক্ষ কীটতত্ত্ববিদ ও আধুনিক ল্যাবের অভাব মশা নিয়ন্ত্রণে বড় বাধা।
তিনি বলেছেন, ঢাকার মতো বড় নগরে অন্তত ২০-৩০ জন কীটতত্ত্ববিদ প্রয়োজন হলেও আছেন মাত্র দু-তিনজন।
ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের মশকনিধন কার্যক্রম সফল না হওয়ার আরেকটি বড় কারণ অশিক্ষিত মশককর্মী বলে উল্লেখ করেছেন ডা. বে-নজির আহমেদ। তার মতে, কীটতত্ত্বে কোনো ডিগ্রি নেই, কীটনাশক সঠিক অনুপাতে মেশানো বা কীটনাশকের গুণাগুণ সম্পর্কে অবগত নন, এমনকি কীটনাশক ছিটানোর মধ্যেও যে একটি বিজ্ঞান আছে, সেটিও তারা জানেন না; এ ধরনের অশিক্ষিত মশককর্মীদের দিয়েই চলছে মশকনিধন কার্যক্রম। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া নামকাওয়াস্তে কাজ করে ঢাকাকে মশামুক্ত করা সম্ভব নয়।
আজকাল রাজধানীতে অনেক মশা থাকাকেই স্বাভাবিক হিসেবে ধরে নেওয়া হচ্ছে। তাই বিদ্রুপ করে এই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বলেছেন— একসময় বিশ্ব মশা দিবসে হয়তো প্রতিপাদ্য হবে ‘মশা আরও বাড়ুক কিংবা মশা দীর্ঘজীবী হোক’।






