বেকার স্ট্রিটে এখনো আসে চিঠি

লন্ডনের বেকার স্ট্রিটে তখন গভীর রাত। বাইরে কুয়াশা। গ্যাসবাতির হলদে আলোয় রাস্তা যেন আধা-স্বপ্নের মতো ভাসছে। দূরে ঘোড়ার গাড়ির চাকা কাঁপিয়ে চলে গেল। ঠিক তখনই ২২১ বি নম্বর ফ্ল্যাটের ভেতর থেকে ভেসে এলো বেহালার সুর। টেবিল জুড়ে রাসায়নিক শিশি, সংবাদপত্র, ছাইভর্তি পাইপ আর দেয়ালে গুলির দাগ। হঠাৎ দরজায় কড়া নাড়ল কেউ। শোনা গেল গম্ভীর একটি কণ্ঠ, ‘ভেতরে এসো, ওয়াটসন’।
পৃথিবীর কোটি কোটি পাঠকের মতো আমরাও সঙ্গে সঙ্গে ঢুকে পড়ি রহস্যের জগতে। যে জগতের রাজা এক অদ্ভুত মানুষ, শার্লক হোমস। আজ তার স্রষ্টা স্যার আর্থার কোনান ডয়েলের জন্মদিন। ১৮৫৯ সালের ২২ মে স্কটল্যান্ডের এডিনবরায় জন্ম নেওয়া এই মানুষটি এমন এক গোয়েন্দা সৃষ্টি করেছিলেন, যিনি কাল্পনিক হয়েও বাস্তবের অনেক মানুষের চেয়ে বেশি জীবন্ত। এতটাই যে, আজও পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে মানুষ চিঠি পাঠায় ২২১ বি বেকার স্ট্রিটে।
আমার নিজেরও গোয়েন্দা কাহিনির জগতে গভীরভাবে ঢুকে পড়ার পেছনে বড় ভূমিকা হোমসের। ক্লাস ফাইভ কিংবা সিক্সে পড়ার সময় সেবা প্রকাশনী থেকে বের হওয়া সাইন অব ফোর পড়েই প্রথম পরিচয়। তারপর কুয়াশা, খুন, রহস্য, লন্ডনের আঁধার গলি আর যুক্তির বিদ্যুৎ গতির ঝলক— সব মিলিয়ে এক অন্য পৃথিবীতে ঢুকে পড়লাম।
শার্লক হোমসকে প্রথম দেখা যায় ১৮৮৭ সালে প্রকাশিত আ স্টাডি ইন স্কারলেট উপন্যাসে। কয়েক বছরের মধ্যে চরিত্রটি জনপ্রিয়তার তুঙ্গে ওঠে। বিশেষ করে, দ্য স্ট্র্যান্ড সাময়িকীতে ছোটগল্প ছাপা শুরুর পর। পাঠকরা অপেক্ষা করতেন নতুন কিস্তির জন্য। ট্রেনের কামরা, চায়ের দোকান, বিশ্ববিদ্যালয়— সবখানে আলোচনা একটাই, হোমস এবার কোন রহস্য ভাঙবেন।
কিন্তু জনপ্রিয়তার শিখরে থাকা অবস্থায়ই ডয়েল বিরক্ত হয়ে উঠলেন নিজের সৃষ্ট চরিত্রে। তার মনে হচ্ছিল, পাঠকরা তার অন্য লেখা ভুলে শুধু হোমস নিয়েই কথা বলছেন। তাই ১৮৯৩ সালে দ্য ফাইনাল প্রবলেম গল্পে সুইজারল্যান্ডের রাইখেনবাখ জলপ্রপাতের ধারে অধ্যাপক মোরিয়ার্টির সঙ্গে লড়াইয়ে হোমসকে ‘মেরে ফেললেন’ তিনি।
এরপর যা হলো, সাহিত্য ইতিহাসে তার তুলনা কমই আছে। পাঠকরা ক্ষুব্ধ হয়ে উঠলেন। কেউ কালো ব্যাজ পরলেন, কেউ শোকসভা করলেন। হাজার হাজার চিঠি যেতে লাগল লেখকের কাছে। শেষ পর্যন্ত পাঠকের চাপে নতি স্বীকার করতেই হলো ডয়েলকে। আর সেই প্রত্যাবর্তনের সবচেয়ে বিখ্যাত দরজা হয়ে এলো দ্য হাউন্ড অব দ্য বাস্কারভিলস। ১৯০১-০২ সালে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়। ইংল্যান্ডের ডেভনের ডর্টমুরের ভুতুড়ে প্রান্তর, কুয়াশাঢাকা জলাভূমি আর অশুভ এক দানবাকৃতি কুকুরের কিংবদন্তি— সব মিলিয়ে এটি হয়ে ওঠে গোয়েন্দা সাহিত্যের অন্যতম সেরা উপন্যাস।
হোমস হঠাৎ আকাশ থেকে নামেননি। তার পেছনে ছিলেন বাস্তবের একজন মানুষ ডক্টর জোসেফ বেল।
এডিনবরার মেডিকেল স্কুলে ডয়েলের শিক্ষক ছিলেন বেল। অসাধারণ পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা ছিল তার। রোগীর হাঁটা, উচ্চারণ, হাতের চামড়া কিংবা পোশাক দেখে বলে দিতে পারতেন তিনি কোথা থেকে এসেছেন, কী কাজ করেন, এমনকি কোথায় চাকরি করেছেন। এই যুক্তিভিত্তিক বিশ্লেষণই পরে রক্তমাংস পায় শার্লক হোমসের চরিত্রে।
ডয়েল নিজেও স্বীকার করেছিলেন, হোমসের পেছনে সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা তার শিক্ষক জোসেফ বেল।
আর আছেন বিশ্বস্ত সঙ্গী ডক্টর ওয়াটসন। যুদ্ধফেরত এই চিকিৎসক না থাকলে হোমস হয়তো এত মানবিক হয়ে উঠতেন না। ওয়াটসনের চোখ দিয়েই আমরা দেখি গোয়েন্দাকে।
বাঙালির কাছে শার্লক হোমসের একটা আলাদা গুরুত্ব আছে। কারণ তারই উত্তরসূরি যেন আমাদের ফেলুদা। সত্যজিৎ রায় নিজেও হোমসের বড় ভক্ত ছিলেন। ফেলুদার পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা, যুক্তি, সিগারেট হাতে চিন্তামগ্ন হয়ে থাকা— সবকিছুর ভেতর কোথাও না কোথাও হোমসের ছায়া দেখা যায়। এমনকি ফেলুদাকে তিনি ঘুরিয়েও এনেছেন বেকার স্ট্রিটে।
আর সেই ২২১ বি বেকার স্ট্রিট নিজেই যেন এক কিংবদন্তি। ডয়েল যখন গল্প লিখছিলেন, তখন বাস্তবে এমন কোনো ঠিকানাই ছিল না। পরে লন্ডনে সত্যি সত্যি ২২১ বি নম্বর তৈরি হলে সেখানে আসতে শুরু করে পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে পাঠকের চিঠি। কেউ রহস্য সমাধানের সাহায্য চাইছেন, কেউ আবার শুধু প্রিয় গোয়েন্দাকে শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন।
মজার ঘটনা— এই চিঠির সূত্রে জন্ম একটি গোয়েন্দা সিরিজেরও। বেকার স্ট্রিট লেটারস নামে এই মিস্ট্রি সিরিজের লেখক মাইকেল রবার্টসন। ২০০৯ সালে প্রথম বইটি প্রকাশিত হয়। এ সিরিজের মূল চরিত্র দুই ভাই রেজি ও নাইজেল হিথ লন্ডনের বেকার স্ট্রিটে (২২১ বি) তাদের আইনজীবী ফার্মের অফিস খোলেন। কিন্তু সমস্যা হলো, বিখ্যাত কাল্পনিক গোয়েন্দা শার্লক হোমসের ঠিকানা হওয়ায় বিশ্ব জুড়ে মানুষ এখনো সেখানে চিঠি পাঠান। দুই ভাই একপর্যায়ে এসব চিঠির সূত্রে ভয়ংকর ও রোমাঞ্চকর সব রহস্যে জড়িয়ে পড়েন।
আজও শার্লক হোমস মিউজিয়ামে গেলে মনে হবে হোমস যেন একটু আগেই বেরিয়ে গেছেন। টেবিলে পাইপ পড়ে আছে, দেয়ালে বেহালা, রাসায়নিক বোতল, আতশকাচ— সবকিছুই যেন জীবন্ত।
কুয়াশা নামলে, পুরনো বইয়ের পাতা খুললে কিংবা রাত গভীর হলে এখনো যেন কোথাও থেকে ভেসে আসে সেই কণ্ঠ, ‘এলিমেন্টারি, মাই ডিয়ার ওয়াটসন’।






