আলোকচিত্রে বাস্তবতার কাব্যিক রূপ

রাশেদ জামানের ছবিতে চরাঞ্চল কোনো ‘পিকচারেস্ক ল্যান্ডস্কেপ’ নয়; এটি মানুষের বসবাসের ভূগোল
আলোকচিত্র
যখন দৃশ্যের নথি থেকে সরে
এসে অনুভূতির ভাষা হয়ে ওঠে,
তখন ক্যামেরা আর শুধু ক্যামেরা
থাকে না, হয়ে ওঠে
তুলি। রাশেদ জামানের ‘দ্য কোয়ায়েট উইদিন’
দেখতে গিয়ে সেই অনুভূতিটাই
হয়। প্রথম দেখায় এগুলো ফটোগ্রাফ নাকি পেইন্টিং— এ
দোদুল্যমানতায় ফেলে দেয় দর্শককে।
একটু স্থির হয়ে তাকালে মনে
হয়, ফ্রেমের ভেতরে যেন কোনো অদৃশ্য
হাত রঙ মেখে রেখেছে।
আলো, রঙ, টেক্সচার, দূরত্ব
ও শূন্যস্থানের ব্যবহারে বাস্তব দৃশ্য ধীরে ধীরে একটি
পেইন্টিংয়ের অভিজ্ঞতায় রূপ নেয়। কিন্তু
এ প্রদর্শনীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক সম্ভবত এর
দৃশ্যসৌন্দর্য নয়, বরং যে
জীবনকে এই সৌন্দর্যের মধ্য
দিয়ে দেখা হয়েছে, সেটি।
রাশেদ জামানের ছবিতে চরাঞ্চল কোনো ‘পিকচারেস্ক ল্যান্ডস্কেপ’ নয়; এটি মানুষের
বসবাসের ভূগোল। নদী, চর, কাদামাটি,
জলাভূমি, নৌকা, মহিষের পাল— সবকিছুর সঙ্গে
জড়িয়ে আছে কৃষকের জীবন,
শ্রম এবং জীবিকার অনিবার্যতা।
এ ভূ-দৃশ্যের সৌন্দর্য
তাই নিছক প্রকৃতির সৌন্দর্য
নয়; এর ভেতরে মিশে
আছে বেঁচে থাকার গল্প। মহিষের পাল সামলানো মানুষ,
জলাভূমির ভেতর দিয়ে চলা
নৌকা, বিস্তীর্ণ চরের ওপর ছড়িয়ে
থাকা পশু কিংবা দূরে
দাঁড়িয়ে থাকা কোনো কৃষক—
এসব দৃশ্য আমাদের নিয়ে যায় এমন
এক জীবনযাপনের কাছে, যার সঙ্গে শহুরে
দর্শকের দূরত্ব ক্রমেই বাড়ছে। এখানে মানুষ প্রকৃতির দর্শক নয়, সে প্রকৃতিরই
অংশ। তার দিনযাপন নির্ভর
করে মাটি, পানি, ঋতু ও পশুর
ওপর। নদী তার পথ,
চর জমি আর মহিষ
জীবিকার অংশ। ফলে প্রকৃতিকে
বাদ দিয়ে এ মানুষকে
বোঝার যেমন উপায় নেই,
তেমনি মানুষকে বাদ দিয়েও এ
ভূদৃশ্য সম্পূর্ণ হয় না। শিল্পীর
ছবিতে মানুষের উপস্থিতি অনেক সময় ক্ষীণ,
এমনকি প্রায় অদৃশ্য। অথচ তার অনুপস্থিতিই
যেন মানুষের উপস্থিতিকে আরও প্রবল করে
তোলে। অর্থাৎ মানুষকে সামনে না এনেও তার
জীবনযাপনকে দৃশ্যমান করে তোলেন রাশেদ
জামান। এ বাস্তব জীবনকে
ধারণ করতে গিয়ে শিল্পী
অবশ্য ‘ডকুমেন্টারি ফটোগ্রাফি’র সরল পথে
হাঁটেননি। তার দৃষ্টির মধ্যে
একজন চিত্রশিল্পীর সংবেদনশীলতা স্পষ্ট। তিনি দৃশ্যকে ব্যাখ্যা
করার চেয়ে তাকে অনুভব
করার মতো করে তোলেন।
দূরত্ব, আলো, রঙ, কুয়াশা
ও ‘নেগেটিভ স্পেস’-এর ব্যবহার ছবিগুলোকে
এক ধরনের ‘পেইন্টারলি কোয়ালিটি’ দেয়। তাই ওপর
থেকে ধারণ করা মহিষের
পালকে কখনো মনে হয়
ক্যানভাসে ছড়িয়ে থাকা ব্রাশস্ট্রোক। আবার
জল, চর ও নৌকার
বিন্যাস দেখে আপনি সেটিকে
‘অ্যাবস্ট্রাক্ট কম্পোজিশন’ হিসেবেও ভাবতে শুরু করবেন। বিশেষ
করে রঙের ব্যবহার ছবিগুলোকে
আলোকচিত্রের পরিচিত বাস্তবতা থেকে একটু সরিয়ে
নেয়। নীল, সবুজ, ধূসর
ও মাটির রঙের মৃদু স্তরগুলো
একে অন্যের মধ্যে মিশে গিয়ে এমন
এক আবহ তৈরি করে,
যেখানে দৃশ্যটি বাস্তব হয়েও স্মৃতির মতো
লাগে। আলো কোনো দৃশ্যকে
শুধু দৃশ্যমান করে না, বরং
তার মেজাজও তৈরি করে। এ
ছাড়া প্রিন্টের নিজস্ব টেক্সচার এই ‘পেইন্টারলি’ অনুভূতিকে
আরও তীব্র করেছে। ছবির পৃষ্ঠে রঙ
ও আলোর যে স্তর
তৈরি হয়েছে, তা দূর থেকে
দেখলে ফটোগ্রাফ নাকি পেইন্টিং— বুঝে
ওঠা মুশকিল
হয়ে যায়।
এ প্রাণবন্ততাই হয়তো ছবিগুলোর সামনে বারবার ফিরে তাকানোর ইচ্ছা তৈরি করে। প্রদর্শনীতে দর্শকদের আচরণেও তার প্রতিফলন দেখা যায়। অনেকেই ছবির সামনে দাঁড়িয়ে নিজেদের ছবি তুলছিলেন। মনে হচ্ছিল, তারা শুধু ছবিকে দেখছেন না, বরং ছবির ভেতরের ভূদৃশ্যের অংশ হয়ে উঠতে চাইছেন। বাস্তবের মানুষ আর ছবির মানুষের জগতের এ সাময়িক মেলবন্ধন প্রদর্শনীস্থলটিকে আরও জীবন্ত ফ্রেমে পরিণত করেছিল। সমকালীন জীবনের দ্রুততা ও অবিরাম শব্দের বিপরীতে ‘দ্য কোয়ায়েট উইদিন’ এক ধরনের বিরতি তৈরি করে। কিন্তু সেই নীরবতা নিছক আনন্দের নয়। এর ভেতরে আছে চরাঞ্চলের মানুষের শ্রম, অপেক্ষা, নির্ভরতা এবং টিকে থাকার গল্প। মাটি ও মানুষের সেই গল্পই রাশেদ জামান ক্যামেরার ফ্রেমে এমনভাবে ধারণ করেছেন, যেখানে বাস্তব জীবন ধীরে ধীরে পেইন্টিংয়ের অনুভূতি অর্জন করে। এটি আমাদের শুধু দেখতে শেখায় না, পরিচিত পৃথিবীর ভেতর লুকিয়ে থাকা অচেনা সৌন্দর্যটুকুও ভাবতে শেখায়— যেখানে মাটি মানুষকে ধারণ করে আর মানুষের শ্রম, স্মৃতি ও জীবনযাপন সেই মাটিকে অর্থ দেয়। সেই সম্পর্কই রাশেদ জামানের নীরব ফ্রেমে কখনো বাস্তব, কখনো কাব্যিক, কখনো প্রায় বিমূর্ত হয়ে আমাদের সামনে ফিরে আসে।






