টিপ
বিন্দুতে সিন্ধু

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
‘আয় আয় চাঁদ মামা টিপ দিয়ে যা/ চাঁদের কপালে চাঁদ টিপ দিয়ে যা’— শৈশবে এই ছড়া শোনেনি এমন বাঙালি খুঁজে পাওয়া কঠিন। মায়েরা তার সন্তানের কপালে কাজল দিয়ে টিপ পরিয়ে আসছেন যুগ যুগ ধরে। আবার বাঙালি নারীর সাজে পূর্ণতা আনতে ছোট্ট এই অনুষঙ্গই যথেষ্ট। দৈনন্দিন হোক কিংবা অপ্রত্যাশিত, দেশীয় পোশাকের সঙ্গে বাঙালি নারীর পছন্দের তালিকার শীর্ষে টিপ। সাজে আর কিছু ব্যবহার না করেও অনেক সময় একটি টিপ কপালে চড়িয়েই ঘর থেকে বেরিয়ে পড়া যায়।
পুরনো ফ্ল্যাটের আয়নায় টিপের রাশি দেখে বোঝা যায়, কিছুদিন আগেও ঘরটিতে বিচরণ ছিল সাজসচেতন কোনো মানুষের। ছোট্ট অথচ তাৎপর্যপূর্ণ এই টিপ ব্যবহারের রয়েছে দীর্ঘ অতীত।
টিপের রকমফের ও স্থানিক ইতিহাস
স্থানভেদে টিপের রয়েছে অনেক নাম। টিপ, ফোঁটা, বিন্দি, পোট্টু বা বট্টু, তিলক, কুমকুম, পুন্ড্রা, টিক্কা আরও নানা কিছু। পাঁচ আঙুলের অগ্রভাগের সাহায্যে পরা হয় বলে একে ডাকা হয় টিপ। বিন্দি শব্দটি এসেছে সংস্কৃত শব্দ ‘বিন্দু’ থেকে।
শস্যবীজ তিলের আকারের কারণে মনে করা হয়, তিল থেকে প্রচলিত হয়েছে তিলক শব্দটি। অনেকে আবার মনে করেন, তিলক মানে হলো লাল রং। যদিও ইতিহাসে স্থানভেদে নানান রঙের তিলকের প্রচলন দেখতে পাওয়া যায়।
রাজপ্রাসাদের ছাদে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন এক চৈনিক রাজকন্যা। ঘুমন্ত অবস্থায় পামের একটি ফুল তার কপালে এসে অনেকক্ষণ ধরে লেপ্টে থাকে।
বাঙালি মেয়েদের ঐতিহ্যবাহী প্রসাধনী হলেও বাইরেও রয়েছে টিপ পরার প্রচলন। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং এর বাইরেও কপালে টিপ পরার কিংবা কপালে নকশা করার প্রচলন রয়েছে। বাংলাদেশসহ ভারত, পাকিস্তানের কিছু অঞ্চল, নেপাল, ভুটান এবং শ্রীলঙ্কায় স্থান ও রীতিভেদে মানুষ ভিন্ন ভিন্ন ধরনের টিপ পরে থাকেন।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বালিনিজ, ফিলিপিনো, জাভানিজ, ইন্দোনেশীয়, মালয়েশীয়, সিঙ্গাপুরিয়ান, ভিয়েতনামি এবং বার্মিজ অঞ্চলের অনেকের মাঝেও টিপ পরার রীতি আছে। কিছু দেশের সংস্কৃতি এবং হিন্দু, বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মমতে বিয়েতে নারী-পুরুষ উভয়কেই টিপ পরতে দেখা যায়। সৌন্দর্য বাড়ানোর পাশাপাশি টিপের রয়েছে আধ্যাত্মিক গুরুত্ব।
ঠোঁটের আড়ালে রাজনীতি
০৮ মার্চ ২০২৬
প্রায় ৩৩০০ বছর আগে মাইসিনীয় সভ্যতায় মুখে প্রসাধনী ব্যবহার করার যে নিয়ম ছিল, তা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ব্রোঞ্জ যুগের মেকআপেও কপালে আঁকা হতো রঙিন নকশা।
চীনেও কপালে টিপের মতো একপ্রকার নকশা আঁকার প্রচলন ছিল। এই নকশাকে ‘হুয়া ডিয়ান’ বলে।
কথিত আছে, অনেক আগে রাজপ্রাসাদের ছাদে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন এক চৈনিক রাজকন্যা। সেদেশে পাম ব্লসম অর্থাৎ পাম ফুলের প্রস্ফুটনের ঋতু চলছিল তখন। ঘুমন্ত অবস্থায় পামের একটি ফুল তার কপালে এসে অনেকক্ষণ ধরে লেপ্টে থাকে। এতে সুন্দর নকশা তৈরি হয় ওই রাজকন্যার কপালে।
ধর্মীয় বিশ্বাস অনুসারে তৃতীয় নেত্র হলো সেই বিন্দু বা কেন্দ্র, যার চারপাশে মণ্ডলা তৈরি হয়, যা মহাবিশ্বের প্রতিনিধিত্ব করে
পরে অন্যান্য রাজবংশীয় নারীদের মধ্যেও সৌন্দর্য বাড়ানোর জন্য কপালে ফুল, পাপড়ি, পাতা প্রভৃতির নকশা করার রেওয়াজ চালু হয়। ধারণা করা হয়, চীনে থং রাজবংশ থেকে প্রথম কপালে হুয়া ডিয়ান আঁকার চল শুরু হয়। টিপের অনুরূপ একটি চিহ্ন চীনের শিশুদেরও দেওয়া হয়ে থাকে। স্কুলে প্রথম ভর্তির সময় আঙুলের সাহায্যে কপালে এমন একপ্রকার টিপ দিয়ে বরণ করে নেওয়া হয় তাদের।
ভারতীয় উপমহাদেশ এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে এই টিপ তৃতীয় নেত্র বা জ্ঞাননেত্র বরাবর পরা হয়ে থাকে। হিন্দু, বৌদ্ধ এবং জৈন ধর্মে টিপ অজ্ঞান চক্র বা আজনা চক্রের সঙ্গে যুক্ত। ধর্মীয় বিশ্বাস অনুসারে তৃতীয় নেত্র হলো সেই বিন্দু বা কেন্দ্র, যার চারপাশে মণ্ডলা তৈরি হয়, যা মহাবিশ্বের প্রতিনিধিত্ব করে।
মনে করা হয়, তৃতীয় নয়নের স্থানে টিপ পরলে তা ব্যক্তির জ্ঞান ও প্রজ্ঞা লাভে সাহায্য করে। বৃহত্তর ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে টিপের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব রয়েছে।
অনেক কালচারে কপালের মাঝ বরাবর দুই ভ্রুর মাঝে টিপ পরানো মানে হলো সে ব্যক্তিকে যুদ্ধ, যাত্রা কিংবা জীবনের নতুন পদক্ষেপের জন্য প্রস্তুত করা। আবার অনেকে নিয়ম মেনে পরিবারের মঙ্গল কামনায়, সঙ্গীর দীর্ঘায়ু কামনায়ও সিঁদুর বা কুমকুম পরে থাকেন কপালে।
প্রাচীনকালে শ্রেণি এবং কাজভেদে কপালের টিপের রং ও নকশায় পার্থক্য দেখা যেত। নির্দিষ্ট শ্রেণি এবং পেশার জন্য নির্দিষ্ট রং এবং নকশা বরাদ্দ ছিল। আবার অনেক মতাদর্শের রক্ষণশীলতা মোতাবেক অনুসারীদের দ্বারা টিপকে নিষিদ্ধ হিসেবেও বিবেচনা করা হয়ে থাকে।
কবে কখন প্রথম মানুষ কপালে টিপ পরা শুরু করে, এই প্রশ্নের সঠিক উত্তর না জানা গেলেও ধারণা করা হয়, এ অঞ্চলে সিন্ধু সভ্যতার সময়ে মানুষের মাঝে কপালে টিপ পরার প্রচলন ছিল। প্রাচীন পারস্যে, পারস্য উপসাগরসংলগ্ন গালফ দেশগুলোতেও আগে টিপের ব্যবহার ছিল বলে মনে করা হয়।
বিভিন্ন অঞ্চলের গুহাচিত্র, মধ্যযুগীয় ভাস্কর্য ও খোদাইচিত্রে কপালে নকশা আঁকা মানুষ দেখতে পেয়েছেন প্রত্নতাত্ত্বিকেরা।
টিপে ব্যবহৃত উপাদান
সাধারণত কুমকুম বা তিলক হিসেবে হলুদগুঁড়া আর লেবুর রসের মিশ্রণ, ভস্ম, মুলতানি মাটি, চন্দন, বিভিন্ন গাছের নির্যাস ও রঙের ব্যবহার দেখতে পাওয়া যেত। এছাড়াও সময়ের পরিক্রমায় টিপ বা ফোঁটা তৈরিতে পাথর, কাঠ, বিভিন্ন রকমের আঁশ, কাপড়, ধাতু, পুঁতি, প্রাণীর পশম ইত্যাদির ব্যবহার হয়ে থাকে।
টিপ নিয়ে যত বিতর্ক
আকৃতির ক্ষেত্রে গোল টিপ জনপ্রিয় হলেও নব্বইয়ের দশকে টিপের নকশায় বড় ধরনের পরিবর্তন দেখতে পাওয়া গেছে। টিভি সিরিয়াল, নাটক ও সিনেমায়, বিশেষ করে নেতিবাচক চরিত্রের মাঝে জমকালো টিপ পরার প্রচলন শুরু হয়।
তখন লম্বা, প্যাঁচালো, জ্যামিতিক আকৃতির পরীক্ষাধর্মী টিপ ব্যবহারই স্বাভাবিক হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এই প্রচলনে কিছু সময় পরে ভাটা পড়ে আবার। বাংলাদেশে ভিন্ন নকশার টিপের চল একটা সময়ের পর থেমে যেতে দেখা যায়। ফিরে আসে ছিমছাম গোল টিপের একাধিপত্য।
২০২২ সালের এপ্রিল মাসে রাজধানীতে কপালে টিপ পরায় পুলিশ সদস্য কর্তৃক হেনস্থার শিকার হন লতা সমাদ্দার নামের এক শিক্ষিকা
২০১৭-১৮ সালের দিকে গোল টিপের মাঝেই নকশা এঁকে ব্যবহার করার প্রচলন শুরু হয়। জাতীয় দিবস মাথায় রেখে টিপে পতাকার মোটিফ, একুশে ফেব্রুয়ারিতে কালো টিপে সাদা রঙে অ আ ক খ বাংলা বর্ণমালা আঁকা, ফুল, ঐতিহ্যবাহী বাঙালি মোটিফ ফুটে উঠতে থাকে কপালের টিপে। শিল্পীর হাতে টিপ হয়ে ওঠে ছোট অথচ অবারিত এক ক্যানভাস।
মজার ব্যাপার হলো, কেবল ভারতবর্ষেই নয়, নব্বইয়ের দশক এবং এর পরবর্তী সময়ে হলিউডেও শুরু হয়েছিল টিপ পরার ট্রেন্ড। তখন পপ তারকা সেলেনা গোমেজকে তার অনেক স্টেজ পারফরম্যান্স, মিডিয়া সম্মেলন, টক শো এবং নিজের অ্যালবামের গানের ভিডিওতে টিপ পরে দর্শকের সামনে আসতে দেখা যায়।
ম্যাডোনা, গুয়েন স্টেফানির মতো তারকাদেরও তিলক কিংবা টিপ পরা লুকে দেখা গেছে বিভিন্ন সময়ে। তবে নব্বইয়ের দশকে হলিউডে এই টিপ পরার ট্রেন্ড পশ্চিমা এবং ভারতীয় বংশোদ্ভূতদের মাঝে বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল। সম্ভবত এই কারণেই পশ্চিমে টিপের ট্রেন্ড পালে বাতাস পায়নি আর কখনও।
টিপ পরা নিয়ে কম বিতর্কের সৃষ্টি হয়নি বাংলাদেশেও। মতাদর্শিক রক্ষণশীল তর্ক-বিতর্কের সম্মুখীন হওয়া এখনও নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার যেন। কয়েক বছর আগেই, ২০২২ সালের এপ্রিল মাসে রাজধানীতে কপালে টিপ পরায় পুলিশ সদস্য কর্তৃক হেনস্থার শিকার হন লতা সমাদ্দার নামের এক শিক্ষিকা।
এই ঘটনার জের ধরে ব্যক্তি স্বাধীনতা নিয়ে তীব্র বিতর্ক শুরু হয় সোশ্যালে। রাস্তায় হেনস্থার শিকার ওই শিক্ষিকা অভিযোগ করেন, টিপ পরার কারণেই তাকে হয়রানি করা হয়েছিল। এ ঘটনা সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিবাদের জন্ম দেয়। তখন টিপ পরা ছবি শেয়ার করে সংহতি প্রকাশ করেন অনেকেই।
বাংলাদেশের ফ্যাশনসচেতন জনপ্রিয় মুখ ও শিল্পীদের মধ্যেও অনেককে টিপের প্রতি অনুরক্ত হিসেবে দেখা গেছে নানা সময়ে।
রুমিন ফারহানাকে নিয়মিত টিপ ব্যবহার করতে দেখা যায়। সংসদ হোক কিংবা কোনো রাজনৈতিক সম্মেলন, শাড়ির সঙ্গে কাজল আর টিপের চিরায়ত বাঙালি সাজে উপস্থিত হতে দেখা যায় তাকে
একুশে পদক ও মরণোত্তর স্বাধীনতা পদকপ্রাপ্ত ভাস্কর নভেরা আহমেদ, ভাস্কর ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী, সংগীতশিল্পী আবিদা সুলতানা, চিরকূট ব্যান্ডের কণ্ঠশিল্পী শারমিন সুলতানা সুমি, কণ্ঠশিল্পী কৃষ্ণকলি ইসলামসহ অনেক শিল্পী ও অভিনয়শিল্পীকে নিয়মিত টিপ পরতে দেখা যায়।
নতুন কিংবা অগ্রজ অনেক ফ্যাশন ডিজাইনারের কাজেও টিপ নিয়ে নিরীক্ষার প্রবণতা দেখা যায়। তাদের মধ্যে পোশাক ডিজাইনার বিবি রাসেল অন্যতম। ঐতিহ্যবাহী টিপের পাশাপাশি এথনিক ডিজাইনের টিপও বেছে নিতে দেখা যায় তাকে।
২০২৬ সালের শুরুর দিকে শারমিন সুলতানা সুমিকে তার ফেসবুক অ্যাকাউন্টে টিপবিষয়ক একটি লেখা শেয়ার করতে দেখা যায়। নেটিজেনদের অনেকের ধারণা, রাজনৈতিক ও সামাজিক পটপরিবর্তনের দিকে লক্ষ করেই এই পোস্ট করেছিলেন সুমি। তিনি লেখেন, ‘নতুন বছরের রেজল্যুশন, কপালের টিপটা যাতে মাঝখানে ঠিকঠাক পরতে পারি ...’
রাজনৈতিক অঙ্গনের আলোচিত মুখদের মধ্যে রুমিন ফারহানাকে নিয়মিত টিপ ব্যবহার করতে দেখা যায়। সংসদ হোক কিংবা কোনো রাজনৈতিক সম্মেলন, শাড়ির সঙ্গে কাজল আর টিপের চিরায়ত বাঙালি সাজে উপস্থিত হতে দেখা যায় তাকে।









