ডার্ক ওয়েবের সিল্ক রোড

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
২০১১ সালে যাত্রা শুরু করা সিল্ক রোডকে অনেকে ডার্ক ওয়েবের ‘অ্যামাজন অব ক্রাইম’ বলেও আখ্যা দেন। বিশেষ করে মাদক-বাণিজ্যের জন্য সাইটটি দ্রুত কুখ্যাত হয়ে ওঠে। বিস্তারিত লিখেছেন ইমরানুর রহমান
এই সিল্ক রোড ছিল এমন একটি অনলাইন মার্কেটপ্লেস, যেখানে ব্যবহারকারীরা পরিচয় গোপন রেখে অবৈধ পণ্য কেনাবেচা করতে পারতেন। মাদক, অস্ত্র, জাল নথি, হ্যাকিং সরঞ্জামসহ বিভিন্ন অবৈধ সেবার কথা তদন্তে উঠে আসে।
সাইটটি পরিচালনার জন্য ব্যবহার করা হতো টর নেটওয়ার্ক। টর এমন একটি প্রযুক্তি, যা ব্যবহারকারীর অবস্থান ও পরিচয় গোপন রাখতে সহায়তা করে। এ গোপনীয়তাই সিল্ক রোডকে দ্রুত জনপ্রিয় করে তোলে। সাধারণ ওয়েব ব্রাউজার দিয়ে সাইটটিতে প্রবেশ করা যেত না। বিশেষ সফটওয়্যার ব্যবহার করতে হতো আর লেনদেনের প্রধান মাধ্যম ছিল বিটকয়েন।
সিল্ক রোডের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক রস উলব্রিখট। তিনি অনলাইনে ‘ড্রেড পাইরেট রবার্টস’ ছদ্মনাম ব্যবহার করতেন।
সাইটটি চালুর পর অল্প সময়ের মধ্যেই এর ব্যবহারকারী সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকে। বিভিন্ন দেশের বিক্রেতারা সেখানে নিজেদের পণ্য তালিকাভুক্ত করতেন। ক্রেতারা রিভিউ দিতেন, বিক্রেতাদের রেটিং করতেন এবং নিরাপদ ডেলিভারির কৌশল নিয়ে আলোচনা করতেন। পুরো প্রক্রিয়াটি দেখতে অনেকটা বৈধ ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মের মতো হলেও বাস্তবে এটি ছিল আন্তর্জাতিক আইনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
এফবিআই, ডিইএ এবং আরও কয়েকটি সংস্থা সিল্ক রোড নিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে গোপনে তদন্ত চালায়
বিশ্ব জুড়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ধীরে ধীরে সিল্ক রোডের কার্যক্রমের দিকে নজর দিতে শুরু করে। যুক্তরাষ্ট্রের এফবিআই, ডিইএ এবং আরও কয়েকটি সংস্থা দীর্ঘ সময় ধরে গোপনে তদন্ত চালায়। তদন্তকারীরা বুঝতে পারেন, শুধু ওয়েবসাইট বন্ধ করলেই হবে না; এর পেছনে থাকা প্রযুক্তি, আর্থিক লেনদেন ও পরিচালনাকারীদের শনাক্ত করাও জরুরি।
২০১৩ সালের অক্টোবরে সানফ্রান্সিসকোর একটি পাবলিক লাইব্রেরি থেকে গ্রেপ্তার করা হয় রস উলব্রিখটকে। অভিযোগ অনুযায়ী, গ্রেপ্তারের সময় তিনি ল্যাপটপে সিল্ক রোডের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে সক্রিয় ছিলেন। এরপর যুক্তরাষ্ট্র সরকার সাইটটি জব্দ করে। তদন্তে বলা হয়, সিল্ক রোডের মাধ্যমে কয়েক বছরে বিপুল অবৈধ লেনদেন সংঘটিত হয়েছে এবং এর মাধ্যমে কোটি কোটি ডলারের বিটকয়েন হাতবদল হয়েছে।
রস উলব্রিখটের বিচার আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। ২০১৫ সালে তাকে একাধিক অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করা হয় এবং যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। যদিও দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় এসে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাকে ক্ষমা করে দেন।
সিল্ক রোড বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরও ডার্ক ওয়েবের অপরাধ জগৎ থেমে থাকেনি। বরং পরে আরও অনেক মার্কেটপ্লেস গড়ে ওঠে। কিছু সাইট খুব দ্রুত বন্ধ হয়ে যায়, আবার কিছু আন্তর্জাতিক অভিযানে নিষ্ক্রিয় করা হয়। তবে সিল্ক রোডই প্রথম দেখিয়ে দিয়েছিল, গোপন নেটওয়ার্ক, এনক্রিপশন এবং ক্রিপ্টোকারেন্সির সমন্বয়ে কীভাবে বৈশ্বিক অপরাধের নতুন অবকাঠামো তৈরি হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সিল্ক রোড শুধু একটি অপরাধভিত্তিক ওয়েবসাইটের গল্প নয়; এটি প্রযুক্তির দ্বিমুখী বাস্তবতারও উদাহরণ। একই প্রযুক্তি একদিকে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা করতে পারে, অন্যদিকে অপরাধীদের জন্যও নিরাপদ আশ্রয় তৈরি করতে পারে। ফলে প্রযুক্তির ব্যবহার, নিয়ন্ত্রণ এবং নৈতিক সীমা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়।
বর্তমানে ডার্ক ওয়েব নিয়ে বিশ্ব জুড়ে নজরদারি আগের তুলনায় অনেক বেশি। বিভিন্ন দেশ সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় বিশেষ ইউনিট গঠন করেছে। ক্রিপ্টোকারেন্সির লেনদেন পর্যবেক্ষণের প্রযুক্তিও উন্নত হয়েছে। কিন্তু সিল্ক রোডের ঘটনা এখনো প্রযুক্তি ও অপরাধবিষয়ক আলোচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে স্থান পায়।





