ভিন দেশের ভূত
আমায় বের করো... আমি নির্দোষ...

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
টরন্টোর শতবর্ষী ওল্ড সিটি হলের ভারী কাঠের দরজাটা যখন পেছনের দিকে ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ করে বন্ধ হলো, তখন রাত প্রায় দুটো। বাইরে কুয়াশার চাদর। সেদিন মধ্যরাতে ৩৩ নম্বর আদালত কক্ষের ভেতরে এসে দাঁড়িয়েছিলেন দুই স্থানীয় সংবাদকর্মী। তাদের হাতে শুধু একটা টর্চলাইট আর অডিও রেকর্ডার।
কানাডার ইতিহাসে ফাঁসির কাঠে ঝোলা শেষ দুই বন্দির বিচারের সাক্ষী এই ৩৩ নম্বর আদালত কক্ষটি নিয়ে শহরের সাংবাদিক মহলে বহু গল্প প্রচলিত। ঘরটার মাঝখানে দাঁড়িয়ে একজন রিপোর্টার ফিসফিস করে বললেন, ‘সবাই তো বলে এখানে নাকি মৃত মানুষের দীর্ঘশ্বাস শোনা যায়, কিন্তু কই, কিছুই তো হচ্ছে না...’
তার কথা শেষ হতে না হতেই ঘরের কোনায় রাখা পুরনো কাঠের টেবিলটায় একটা শব্দ হলো। যেন কেউ অদৃশ্য আঙুল দিয়ে টেবিলে টোকা দিল। দুজনই চমকে সেই অন্ধকার কোনার দিকে টর্চ ফেললেন। কিন্তু সেখানে কিচ্ছু নেই। হঠাৎ করেই ঘরটির তাপমাত্রা যেন কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে গেল। এক কনকনে হিমেল বাতাস তাদের গায়ের পশম খাড়া করে দিল। অডিও রেকর্ডারটা চালু করাই ছিল; তাতে ধরা পড়ল এক অদ্ভুত ভিনদেশি ফিসফিসানি। দরজার বাইরে করিডর থেকে ভেসে জুতার আওয়াজ— টপ... টপ... টপ...। কেউ যেন ভারী বুট জুতো পরে পেছনের সেই ঐতিহাসিক সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠছে। একসময় বিচারক এস. টাপার বিগেলো বা বিচারক পিট উইলচও এই একই সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে ঠিক এ শব্দই শুনেছিলেন। তারা জানিয়েছেন, সিঁড়ি দিয়ে একা নামার সময় পেছনে কেউ হাঁটে এবং হঠাৎ করেই অদৃশ্য কোনো হাত তাদের বিচারকীয় গাউনের পেছনে শক্ত করে টেনে ধরে। আজ এ দুই সাংবাদিক টের পেলেন, তাদের পিঠের পেছনে ঠিক তেমনি কেউ নিঃশব্দে এসে দাঁড়িয়েছে। তারা আর একমুহূর্তও সেখানে দাঁড়ানোর সাহস পেলেন না। ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে কোনোমতে সরঞ্জাম গুটিয়ে দৌড় দিলেন।
কানাডার অন্টারিও প্রদেশের টরন্টো শহরের প্রাণকেন্দ্রে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা পুরনো ওল্ড সিটি হল কোনো সাধারণ ঐতিহাসিক স্থাপনা নয়। ১৮৮৯ থেকে ১৮৯৯ সালের মধ্যে নির্মিত এই ইমারতের নকশা করেছিলেন সেই সময়ের প্রখ্যাত স্থপতি ই জে লেনক্স, যাকে একসময় ‘টরন্টোর নির্মাতা’ বলা হতো। সরকার এখন এ ভবন থেকে সম্পূর্ণভাবে দাপ্তরিক কার্যক্রম গুটিয়ে নিলেও, এর ভেতরকার কংক্রিট আর পাথরের দেয়ালে জমে থাকা রহস্য লেশমাত্রও কমেনি।
ওল্ড সিটি হলের বেসমেন্ট— যেখানে এককালের অন্ধকার প্রিজন সেলগুলো এখনো জাঁকিয়ে বসে আছে। দিনের আলোয় ট্যুরিস্টরা কৌতূহল নিয়ে সেলগুলো দেখলেও, রাতের বেলা এখানকার হাওয়া একদম আলাদা। রাতের ডিউটিতে থাকা এক নিরাপত্তাকর্মী কফি হাতে করিডর দিয়ে যাওয়ার সময় দেখলেন, বহু বছর আগে বন্ধ হয়ে থাকা একটা সেলের লোহার গরাদ ভেতর থেকে কেউ যেন সজোরে ধাক্কা দিচ্ছে। সেখান থেকে ভেসে আসছে চাপা কান্নার আওয়াজ— ‘আমায় বের করো... আমি নির্দোষ...’






