শেষ শিফটের সাইরেন

আঁকা : ফারজিন
বন্ধ হয়ে যাওয়া এক পাটকল ঘিরে শোনা যায় অদ্ভুত সব ঘটনা। রাতে হঠাৎ কেন বেজে ওঠে সাইরেন? বেশ কয়েক বছর আগে মারা যাওয়া মানুষ কীভাবে দরজা খুলে দিতে বলেন? লিখেছেন লুৎফুল কায়সার
রাজশাহীর বিখ্যাত সেই পাটকল যখন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তখন চারপাশের দৃশ্য এখনকার মতো ছিল না। কিছু কারণে মিলটিন নাম গোপন রাখছি। সত্তরের দশকে প্রায় ঊনপঞ্চাশ একর জায়গার ওপর গড়ে ওঠা বিশাল পাটকলটি ধীরে ধীরে এলাকার প্রাণকেন্দ্র হয়ে ওঠে। ভোরের সাইরেন শুনে শ্রমিকরা ঘর থেকে বেরিয়ে আসত, পাটের গন্ধে ভারী হয়ে থাকত বাতাস আর বিশাল মেশিনগুলোর অবিরাম গর্জনে কেঁপে উঠত কারখানার দেয়াল।
মিলের পুরনো শ্রমিকদের স্মৃতিচারণায় মিলটি নিয়ে অদ্ভুত এবং অপার্থিব একটি ঘটনা উঠে আসে। সেটি ঘটে আশির দশকের শেষদিকে।
আবদুল কাদের (ছদ্মনাম) তখন প্রায় ২০ বছর ধরে ওই পাটকলে কাজ করছিল। বয়স পঁয়তাল্লিশ পেরোলেও তার শরীর ছিল শক্তপোক্ত। রাতের শিফটে কাজ করতেই বেশি স্বচ্ছন্দ বোধ করত। কারখানার অন্ধকার, মেশিনের শব্দ কিংবা গভীর রাতে একা একা গুদামঘরের পাশ দিয়ে হাঁটা— কিছুতেই ভয় পেত না সে।
তবে মিলের একটি জায়গা নিয়ে তার মধ্যে একটু অস্বস্তি ছিল। জায়গাটা হলো পুরনো পাটের গুদাম। সেটি কারখানার উত্তর প্রান্তে ছিল। বহু বছর ধরে সেখানে নিয়মিত কাজ হতো না। ভাঙা মেশিন, পুরনো কাঠের বাক্স আর ব্যবহার অযোগ্য পাটের বস্তা সেখানে পড়ে থাকত। শ্রমিকদের মধ্যে গুজব ছিল, প্রায় ১০ বছর আগে সেখানে এক শ্রমিক দুর্ঘটনায় মারা গিয়েছিল।
১৯৮৭ সালের এক শীতের রাত। রাতের শিফটে কাজ করছে কাদের। চারপাশে মেশিনের শব্দ ছাড়া আর কিছুই শোনা যাচ্ছিল না। হঠাৎ সাইরেন বেজে উঠল। কাদের চমকে উঠে ঘড়ির দিকে তাকাল। ২টা ৫। এ সময়ে সাইরেন বাজানোর কোনো কারণ নেই।
শিফট বদলের সাইরেন বাজত নির্দিষ্ট সময়ে। তার ওপর পুরনো সাইরেনটি বেশ কিছুদিন ধরেই নষ্ট ছিল। কয়েকজন শ্রমিকও কাজ থামিয়ে একে অন্যের মুখের দিকে তাকাল।
সাইরেনটা থেমে গেল। কেউ কিছু বলল না। কাদের আবার কাজে ফিরে গেল। প্রায় ১০ মিনিট পর সে একটা শব্দ শুনল।
ঘষট... ঘষট... ঘষট...
ঘষট... ঘষট... ঘষট... যেন ভারী কোনো বস্তা মেঝের ওপর টেনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে
যেন ভারী কোনো বস্তা মেঝের ওপর টেনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। শব্দটা আসছিল পুরনো গুদামের দিক থেকে। কাদের টর্চ হাতে নিয়ে এগিয়ে গেল। গুদামের দরজায় বড় তালা ঝুলছিল। দরজার কাছে পৌঁছাতেই শব্দটা বন্ধ হয়ে গেল। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে বলল, ‘কে ওখানে?’
কোনো উত্তর এলো না। সে আবার বলল, ‘কেউ আছেন?’
এবার ভেতর থেকে একটি কণ্ঠ ভেসে এলো, ‘কাদের ভাই... দরজাটা খুলে দেন।’
কাদেরের শরীরের সমস্ত শক্তি যেন একমুহূর্তে নিঃশেষ হয়ে গেল।
সে কণ্ঠটা চিনতে পেরেছিল সঙ্গে সঙ্গে... ওটা রহিমের কণ্ঠ! তার সঙ্গে বহু বছর কাজ করেছে রহিম। কিন্তু সে তো পাঁচ বছর আগে মারা গিয়েছে! একটি মেশিন দুর্ঘটনায় তার মৃত্যু হয়েছিল। রাতের শিফটে কাজ করছিল সে।
কাদের আর দাঁড়াল না। দৌড়ে সে অন্য শ্রমিকদের কাছে ফিরে গেল। পরদিন সকালে কয়েকজন শ্রমিককে নিয়ে গুদামের দরজা খোলা হলো। ভেতরে কেউ ছিল না।
তবে মেঝের ধুলোর ওপর স্পষ্ট পায়ের ছাপ দেখা গেল। খালি পায়ের ছাপ। সেগুলো গুদামের একেবারে ভেতর থেকে দরজার দিকে এসেছিল। সামনে এসে হঠাৎ শেষ হয়ে গেছে।
কেউ ব্যাপারটাকে গুরুত্ব দিতে চাইল না। কেউ কেউ বলতে লাগল, পুরনো গুদামের মেঝেতে ইঁদুরের দৌড়াদৌড়ির কারণে অমনটা হয়েছে।
কিন্তু এক সপ্তাহ পর আবার সাইরেন বাজল। এবার রাত ৩টা ৫ মিনিটে। সাইরেন থামার পর গুদামের ভেতর থেকে আবার সেই শব্দ শোনা গেল।
ঘষট... ঘষট... ঘষট...
এর পর থেকে প্রায় প্রতি বৃহস্পতিবার একই ঘটনা ঘটতে লাগল। কখনো গুদামের ভেতর থেকে পাট টেনে নেওয়ার শব্দ আসত। কখনো শোনা যেত ভারী মেশিন চলার মতো গর্জন। আবার কখনো অনেক মানুষের চাপা কথাবার্তা।
সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় ছিল, গুদামের কারেন্টের লাইন অনেক আগেই কেটে দেওয়া হয়েছিল... তবু কয়েকজন শ্রমিক দাবি করেছিল, গভীর রাতে তারা গুদামের জানালা দিয়ে হলুদ আলো দেখতে পেয়েছে।
এক বর্ষার রাতে সেই দৃশ্য নিজের চোখে দেখেছিল বৃদ্ধ প্রহরী। বৃষ্টির মধ্যে টহল দিতে গিয়ে সে গুদামের কাছে এসে থেমে গেল। জানালার ফাঁক দিয়ে আলো বেরোচ্ছে।
মজিবর কিছুক্ষণ দ্বিধা করে জানালার কাছে এগিয়ে গেল। তারপর ভেতরে তাকিয়েই স্থির হয়ে গেল। গুদামের ভেতর বহু মানুষ কাজ করছে। সারি সারি শ্রমিক। কারও পরনে পুরনো জামা, কারও গায়ে মলিন গেঞ্জি। তারা সবাই মাথা নিচু করে একই ছন্দে কাজ করে যাচ্ছে। কেউ পাট টানছে, কেউ আঁশ আলাদা করছে, কেউ পুরনো মেশিনের সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
কিন্তু তাদের মুখগুলো যেন অন্ধকারে ঢাকা। মজিবর তখন বুঝতে পারল, সে এমন একটি শিফট দেখছে, যা বহু বছর আগেই শেষ হয়ে গিয়েছে। বয়স হয়েছে মজিবরের, তাই সে ‘অনেক কিছুই’ বোঝে।
হঠাৎ শেষ সারির একজন শ্রমিক কাজ থামিয়ে মাথা তুলল। রহিম! মজিবর ওকে স্পষ্ট চিনতে পারল।
রহিম ধীরে ধীরে জানালার দিকে এগিয়ে এলো। তার মুখটা ছিল পুরো ফ্যাকাশে, চোখের মণি পুরোপুরি স্থির। সে জানালার ওপাশে দাঁড়িয়ে মজিবরের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘শিফট শেষ হয়নি।’
ঠিক তখনই সাইরেন বেজে উঠল। একবার। দুবার। তিনবার।
মজিবর আর কিছু মনে রাখতে পারেনি। সকালে তাকে গুদামের দরজার সামনে অচেতন অবস্থায় পাওয়া গেল।
তারপর বহু বছর কেটে গিয়েছে। মিলের ব্যস্ততা কমেছে, মেশিন থেমেছে, শ্রমিকরা একে একে চলে গিয়েছে। অবশেষে কারখানার শেষ অধ্যায়ও শেষ হয়েছে। বন্ধ হয়ে গিয়েছে সেটি, নির্জন সেই মিলে এখন আর কেউ তেমন একটা যায় না।
কিন্তু এলাকার কোনো কোনো বৃদ্ধ এখনো বলেন, গভীর রাতে পুরনো মিলের আশপাশে দাঁড়ালে কখনো কখনো দূর থেকে সাইরেনের শব্দ শোনা যায়।
সময়টা নাকি সবসময় একই, রাত ৩টা বেজে ৫ মিনিট।
সাইরেন থামার পর কিছুক্ষণ নীরবতা।
তারপর, ঘষট... ঘষট... ঘষট...
যেন অন্ধকার গুদামের ভেতর কেউ এখনো একটি ভারী পাটের বস্তা টেনে নিয়ে যাচ্ছে। আর খুব মন দিয়ে শুনলে, সেই শব্দের ফাঁকে নাকি একটি কণ্ঠও শোনা যায়, ‘কাদের ভাই, দরজাটা খুলে দেন।’
কিন্তু কাদের বহু বছর আগেই মারা গেছে। আর পুরনো গুদামের দরজাটিও বহুদিন ধরে বন্ধ।






