পাঠকের ভয়
মৃত্যুসংকেত পেয়েছিলেন দাদি!

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
নাতিকে বাঁচাতে গিয়ে মৃত্যু হয় দাদির। তবে তার মৃত্যুর কারণটা স্বাভাবিক ছিল না। নিজের ছোটবেলার সেই অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন ফয়জুন নাহার
হবিগঞ্জের এক অজপাড়াগাঁ। আজ থেকে বহু বছর আগের কথা। তখন গ্রামের রাত মানেই ছিল গভীর অন্ধকার, কুয়াশা আর অদ্ভুত সব ভয়। সন্ধ্যা নামলেই মানুষ দরজা-জানালা বন্ধ করে দিত। গ্রামের বয়স্করা বলতেন, কিছু কিছু গাছের নিচে রাতে দাঁড়ানো ভালো না। বিশেষ করে, তেঁতুলগাছ কিংবা পুরনো বাঁশঝাড়— এসব জায়গায় নাকি ‘ওরা’ থাকে।
এখন যে ঘটনাটির কথা বলব, ছোটবেলা থেকে আমার মায়ের মুখে শুনে আসছি। তবে তখন আমার জন্মও হয়নি। আমার বড় ভাই ছিল ছোট্ট শিশু। এক সন্ধ্যায় আমার এক মামা তাকে কোলে নিয়ে উঠানে হাঁটছিলেন। বাড়ির পাশে ছিল একটা বড় জাম্বুরাগাছ। একপর্যায়ে গাছটার নিচে দাঁড়িয়ে মামা গল্প করছিলেন পরিবারের লোকজন ও প্রতিবেশীদের সঙ্গে।
হঠাৎ কোনো কারণ ছাড়াই একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটল। মামার কোল থেকে আমার ভাই ধপাস করে মাটিতে পড়ে গেল। এত দ্রুত ঘটনা ঘটল যে কেউ বুঝতেই পারল না কীভাবে শিশুটি হাত ফসকে পড়ে গেল। মামা সঙ্গে সঙ্গে তাকে কোলে তুলে নিলেন। তখনো সবাই ভাবছিল, হয়তো অসাবধানতায় পড়ে গেছে।
কিন্তু রাত বাড়তেই ভয়ংকর ঘটনা শুরু হলো। আমার ভাইয়ের ঘাড় ফুলতে শুরু করল। ধীরে ধীরে ফুলে এমন অবস্থা হলো যে সে কাঁদতেও পারছিল না ঠিকমতো। জ্বর এলো, শরীর গরম হয়ে উঠল। বাড়ির সবাই ভয়ে অস্থির হয়ে গেল।
সেই সময় গ্রামে ডাক্তার ছিল না বললেই চলে। আমার দাদি নানা ধরনের গাছগাছড়ার ওষুধ জানতেন। আশপাশের মানুষও তার কাছে ঝাড়ফুঁক আর ভেষজ ওষুধ নিতে আসতেন। খবর পেয়ে দাদি এলেন। এখানে বলে রাখা ভালো, আমার নানা ছিলেন জমিদার। মা নানার একমাত্র মেয়ে হওয়ায় ওই বাড়িতেই বাবাসহ সবাই বাস করতাম। এখনো আমাদের বাড়ি ওটাই।
নাতির অবস্থা দেখেই দাদির মুখের রঙ বদলে গেল। তিনি কিছুক্ষণ চুপচাপ তাকিয়ে থেকে আমার মাকে ধীরে বললেন, ‘এটা সাধারণ কিছু না... অন্যকিছুর ছোঁয়া আছে।’
কথাটা শুনে ঘরের সবাই স্তব্ধ হয়ে যায়।
দাদি তখনই বললেন, ‘আমি এখন যাচ্ছি। কাল সকালে আবার আসব। কিছু ওষুধ আনতে হবে।’
পরদিন খুব ভোরে দাদি ফিরে এলেন। তার হাতে ছিল কয়েক ধরনের গাছের শিকড়, পাতা, শুকনো ভেষজ আর একটা তাবিজ। ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে অনেকক্ষণ ধরে কিছু পড়তে লাগলেন। তারপর ওষুধ বেটে নাতি মানে আমার বড় ভাইয়ের ঘাড়ে লাগালেন। তাবিজ পরিয়ে দিলেন।
আশ্চর্যের বিষয়, সেই রাত থেকেই ভাইয়ের জ্বর কমতে শুরু করল। ফুলে থাকা ঘাড়ও ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে লাগল। সবাই তখন আল্লাহর রহমত বলে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।
কিন্তু ভয়ংকর ঘটনা তখনো বাকি ছিল। দুদিন পর হঠাৎ দাদি নিজেই অসুস্থ হয়ে পড়লেন।
প্রথমে জ্বর। তারপর সেই জ্বর অস্বাভাবিকভাবে বাড়তে লাগল। তিনি অস্থির হয়ে উঠছিলেন। শেষে আমার নানিকে খবর পাঠালেন।
নানি এসে দেখেন, দাদি বিছানায় শুয়ে কাঁপছেন। চোখ দুটো ছলছল।
নানি জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী হইছে তোমার?’
দাদি তখন খুব নিচু গলায় বলেছিলেন, ‘যেদিন ওষুধ তুলতে গেছিলাম, সেদিন আমি গা বন্ধ করতে ভুলে গেছিলাম...’
গ্রামের মানুষ বিশ্বাস করত, গভীর রাতে ঝাড়ফুঁক বা ওষুধ তুলতে গেলে নিজেকে কিছু নিয়মে সুরক্ষিত করতে হয়। একে বলা হতো ‘গা বন্ধ করা’।
দাদি কাঁপা গলায় বলতে লাগলেন, “রাতে স্বপ্নে দেখলাম... কেউ একজন দাঁড়িয়ে আছে। সে বলল, ‘তুই তো গা বন্ধ করস নাই। তুই মরবি... কিন্তু তোর নাতি বাঁচবে।’”
তিনি আরও বলেছিলেন, ‘আমার মনে হয় আমি আর বাঁচব না। কিন্তু বাচ্চাটার আর ভয় নেই।’
তারপর থেকেই তার অবস্থা দ্রুত খারাপ হতে লাগল। একসময় তিনি অচেতন হয়ে পড়লেন। দু-তিন দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করার পর সত্যিই তিনি মারা গেলেন।
আর আশ্চর্যের ব্যাপার, ঠিক সেই সময়ের মধ্যেই আমার বড় ভাই পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠে।




