জরায়ুমুখ ক্যানসার প্রতিরোধে টিকা কেন জরুরি

নারীদের সব ধরনের ক্যানসারের মধ্যে জরায়ুমুখ ক্যানসার দ্বিতীয়। তবে জরায়ুমুখ ক্যানসারের একটি বিশেষ দিক হলো, সঠিক সময়ে সচেতনতা, টিকাদান এবং নিয়মিত স্ক্রিনিংয়ের মাধ্যমে এই রোগের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
জরায়ুমুখ ক্যানসারের অন্যতম প্রধান কারণ হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস বা HPV সংক্রমণ।
HPV সংক্রমণ কী?
এইচপিভি অত্যন্ত সাধারণ একটি ভাইরাস। এর কিছু উচ্চ ঝুঁকির ধরন দীর্ঘদিন শরীরে অবস্থান করলে জরায়ুমুখের কোষে অস্বাভাবিক পরিবর্তন ঘটাতে পারে। সময়ের সঙ্গে চিকিৎসাহীন অবস্থায় এসব পরিবর্তন ক্যানসারে রূপ নিতে পারে।
কারা বেশি ঝুঁকিতে?
কিছু নারীর জরায়ুমুখ ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অন্যদের তুলনায় বেশি। যেমন:
যাদের খুব কম বয়সে, অর্থাৎ ১৮ বছরের আগে বিয়ে হয়েছে,
যারা বেশিসংখ্যক সন্তান জন্মদান করেছেন,
যাদের একাধিক যৌনসঙ্গী রয়েছে,
একটানা ১০ বছরের বেশি সময় জন্মনিরোধক ওষুধ সেবন করেন যারা ও
যাদের একই সঙ্গে এইচপিভি, এইচআইভি অথবা ক্ল্যামিডিয়া সংক্রমণ রয়েছে। এইচপিভি যৌনমিলন এবং ত্বক থেকে ত্বকের সংস্পর্শের মাধ্যমে ছড়াতে পারে।
এ ছাড়া আক্রান্ত মায়ের কাছ থেকে শিশুর শরীরে সরাসরি সংক্রমণ হতে পারে।
এইচপিভি সংক্রমণের কারণে নারীদের মধ্যে জরায়ুমুখ ক্যানসার,
মুখ ও মুখগহ্বরের ক্যানসার, ভ্যাজাইনাল ক্যানসার, ভালভাল ক্যানসার, জেনিটাল ওয়ার্ট হতে পারে।
পুরুষদের ক্ষেত্রেও এইচপিভি সংক্রমণের কারণে এনাল ক্যানালের ক্যানসার ও পেনাইল ক্যানসার হতে পারে।
জরায়ুমুখ ক্যানসারের লক্ষণ
জরায়ুমুখ ক্যানসারের শুরুতে সাধারণত তেমন কোনো লক্ষণ দেখা যায় না। তবে পরবর্তী সময়ে কিছু লক্ষণ দেখা দিতে পারে। যেমন:
মেনোপজ বা মাসিক বন্ধ হওয়ার পরে রক্তস্রাব হওয়া, সহবাসের পরে রক্তস্রাব হওয়া ও দুর্গন্ধযুক্ত সাদা স্রাব যাওয়া।
প্রতিরোধের উপায়
জরায়ুমুখ ক্যানসার প্রতিরোধে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। এইচপিভি সংক্রমণের সংস্পর্শে আসার আগেই টিকা নেওয়া, নিয়মিত স্ক্রিনিংয়ের মাধ্যমে এইচপিভি আক্রান্তদের শনাক্ত করা, বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ করা এবং বেশিসংখ্যক সন্তান জন্মদান থেকে বিরত থাকা প্রয়োজন।
এ ছাড়া একটানা দীর্ঘ সময় গর্ভনিরোধক পিল খাওয়া থেকে বিরত থাকা, নিরাপদ যৌনমিলন এবং কনডম ব্যবহারও গুরুত্বপূর্ণ।
এইচপিভি ভ্যাকসিনের ভূমিকা
জরায়ুমুখ ক্যানসার প্রতিরোধে এইচপিভি টিকা গ্রহণের মাধ্যমে জরায়ুমুখের ক্যানসারের ঝুঁকি প্রায় ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব।
ভাইরাস শনাক্তকরণ: এইচপিভি-১৬ ও এইচপিভি-১৮ নামক দুটি প্রধান উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ভাইরাস বিশ্বব্যাপী ৭০ শতাংশের বেশি জরায়ুমুখ ক্যানসারের জন্য দায়ী।
কাদের এই টিকা দেওয়া যাবে?
সাধারণত এইচপিভি সংক্রমণের সংস্পর্শে আসার আগেই টিকা নিলে এর কার্যকারিতা সর্বোচ্চ হয়। অর্থাৎ যৌনজীবন শুরু হওয়ার আগেই এই টিকা নেওয়া উচিত। এর উপযুক্ত সময়গুলো হলো:
৯ থেকে ১৫ বছর বয়সীদের জন্য: ২টি ডোজ।
১৫ থেকে ২৬ বছর বয়সীদের জন্য: ৩টি ডোজ।
২৬ থেকে ৪৫ বছর বয়সীদের জন্য: ৩টি ডোজ।
টিকার পাশাপাশি নিয়মিত স্ক্রিনিং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। VIA টেস্ট, প্যাপস (PAP’S) টেস্ট অথবা এইচপিভি ডিএনএ টেস্টের মাধ্যমে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা উচিত।
লেখক: গাইনি বিশেষজ্ঞ এবং সার্জন
গাইনি অ্যান্ড অবস ডিপার্টমেন্ট
ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল






