নারীর মানসিক স্বাস্থ্য ও আমাদের গৃহপরিবেশ

প্রতীকী ছবি
একটা বাড়ি শুধু ইট-কাঠ-চালার সমষ্টি নয়। যে ঘরে একজন নারী দিনের পর দিন রান্না করেন, পানি বহন করেন, সন্তান লালন করেন সেই ঘরের দম বন্ধ বাতাস, স্যাঁতসেঁতে দেয়াল, অধিক জনবলের শোবার ঘর কিংবা অপরিচ্ছন্ন শৌচাগার নিঃশব্দে তাঁর মনের ওপরও একটা প্রভাব ফেলে। সম্প্রতি প্রকাশিত এক গবেষণায় এই কথাটিকেই পরিসংখ্যানের ভাষায় প্রতিষ্ঠিত করেছে।
দ্য ল্যানসেট রিজিওনাল হেলথ- সাউথইস্ট এশিয়া সাময়িকীতে ‘গৃহপরিবেশগত অবস্থা’ (হাউজহোল্ড এনভায়রনমেন্টাল কন্ডিশন বা এইচইসি) গবেষণাপত্রটি সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে। এই গবেষণাপত্রে ২০২২ সালের বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভের (বিডিএইচএস) তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখানো হয়েছে, গৃহপরিবেশের মান আর নারীর বিষণ্নতা ও উদ্বেগজনিত রোগের ঝুঁকির মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। প্রায় ঊনিশ হাজার বিবাহিত প্রজনন-বয়সী নারীর তথ্য নিয়ে করা এই গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি বিশজনের একজনের কাছাকাছি নারী ক্লিনিক্যালি বিষণ্নতা বা উদ্বেগে ভুগছেন। সংখ্যাটা বিচ্ছিন্ন কোনো তথ্য নয় দেশের প্রায় বাইশ থেকে চব্বিশ লাখ নারীর বাস্তবতা এর ভেতর লুকিয়ে আছে।
সাতটি সূচক দিয়ে এই গবেষণা পরিমাপ করা হয়েছে। ঘরের নির্মাণসামগ্রীর মান, জনবলের আধিক্য, রান্নাজনিত বায়ুদূষণ, বিশুদ্ধ পানির উৎস, পানি শোধনের অভ্যাস, স্যানিটেশন এবং হাত ধোয়ার সুযোগ। উদ্বেগজনক তথ্য হলো, অর্ধেকের বেশি পরিবার এই সাতটির মধ্যে তিন বা তার বেশি ক্ষেত্রে দুর্বল অবস্থায় আছে। প্রায় অর্ধেক পরিবার নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রীতে তৈরি ঘরে বাস করে, চল্লিশ শতাংশের কাছাকাছি পরিবারে স্যানিটেশন ব্যবস্থা দুর্বল, আর প্রায় সমসংখ্যক পরিবারে হাত ধোয়ার উপযুক্ত ব্যবস্থা নেই।
ফলাফলটি গুরুত্বপূর্ণ এবং একই সঙ্গে অস্বস্তিকর। গবেষণায় প্রায় ৫ শতাংশ নারীর মধ্যে সম্ভাব্য বিষণ্নতা এবং ৪.৪ শতাংশের মধ্যে সাধারণ উদ্বেগজনিত সমস্যার লক্ষণ পাওয়া গেছে। আরও উদ্বেগের বিষয়, প্রায় ১.৪ শতাংশ নারীর মধ্যে হালকা বিষণ্নতার লক্ষণ এবং ১.৫ শতাংশের বেশি নারীর মধ্যে হালকা উদ্বেগের লক্ষণ ছিল। প্রায় ২.৪ শতাংশ নারীর মধ্যে বিষণ্নতা ও উদ্বেগ দুটিই একসঙ্গে পাওয়া গেছে। তবে গবেষণাটির সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো, মানসিক স্বাস্থ্যের এই সমস্যাগুলোকে শুধু ব্যক্তিগত বা মনস্তাত্ত্বিক বিষয় হিসেবে দেখা হয়নি। গবেষকরা দেখিয়েছেন, মানুষের বসবাসের পরিবেশও মানসিক স্বাস্থ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
গবেষণায় আরো দেখা গেছে প্রায় অর্ধেক নারী এমন বাড়িতে বসবাস করছিলেন, যার নির্মাণসামগ্রীর মানকে গবেষণায় অপর্যাপ্ত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রায় ১৪ শতাংশ পরিবার ছিল অতিরিক্ত ঘনবসতিপূর্ণ। প্রায় ৩৯ শতাংশ পরিবারের স্যানিটেশন ব্যবস্থা ছিল অপর্যাপ্ত এবং প্রায় ৪৪ শতাংশ পরিবারের পর্যাপ্ত হাত ধোয়ার ব্যবস্থা ছিল না। আরও উল্লেখযোগ্য হলো, প্রায় ৮৯ শতাংশ পরিবার নিরাপদভাবে পানি শোধন করত না। অর্থাৎ, একটি পরিবারের স্বাস্থ্যঝুঁকি অনেক সময় একটি মাত্র সমস্যায় সীমাবদ্ধ নয়। একটির সঙ্গে আরেকটি যুক্ত হয়ে তৈরি হতে পারে দীর্ঘস্থায়ী শারীরিক ও মানসিক চাপ।
এই গবেষণার সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো, রান্নাঘরের ধোঁয়া। অর্থাৎ চুলার পাশে দীর্ঘ সময় কাটানো নারীদের ঘরোয়া বায়ুদূষণের মুখোমুখি হওয়া। এতে বিষণ্নতা ও উদ্বেগ উভয়ের সঙ্গেই স্পষ্টভাবে যুক্ত পাওয়া গেছে। রান্নার ধোঁয়া নিয়ে আলোচনা হলে সাধারণত শ্বাসকষ্ট, নিউমোনিয়া, সিওপিডি কিংবা ফুসফুসের অন্যান্য রোগের কথা বলা হয়। যেসব নারী বেশি মাত্রায় এই ধোঁয়ার সংস্পর্শে আসেন, তাঁদের মধ্যে বিষণ্নতার আশঙ্কা প্রায় ১.৬ গুণ এবং উদ্বেগের আশঙ্কাও একই মাত্রায় বেড়ে যায়। এর পেছনে জৈবিক একটা ব্যাখ্যাও আছে— সূক্ষ্ম বায়ুকণা মস্তিষ্কে প্রদাহ তৈরি করে এবং শরীরের চাপ নিয়ন্ত্রণকারী হরমোন ব্যবস্থাকে বিপর্যস্ত করে দিতে পারে। একইভাবে বেশি জনবল শোবার ঘরে বসবাস উদ্বেগের ঝুঁকি বাড়ায়, আর দুর্বল স্যানিটেশন ব্যবস্থা বিষণ্নতার সঙ্গে সম্পর্কিত। এর একটি সামাজিক ব্যাখ্যা আছে। বাস্তবতায় মনে রাখা দরকার যে, বাংলাদেশে গ্রামীণ ও শহুরে দরিদ্র পরিবারের নারীরাই দিনের সবচেয়ে বেশি সময় ঘরের ভেতরে কাটান। রান্না, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, সন্তান পালনের দায়িত্ব মূলত তাঁদের ওপরই বর্তায়। ফলে ঘরের পরিবেশ যত খারাপ হোক, তার সরাসরি ও দীর্ঘমেয়াদি সংস্পর্শ নারীদেরই সবচেয়ে বেশি পোহাতে হয়। পুরুষতান্ত্রিক গৃহস্থালি বিভাজনের এই বাস্তবতা নারীদের একধরনের বাড়তি ও অদৃশ্য বোঝা বহন করতে বাধ্য করে, যা তাঁদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নীরবে চাপ তৈরি করে। গবেষকরাও এই দৈনন্দিন ঘরোয়া ভূমিকা ও দীর্ঘসময় ঘরে থাকার বিষয়টিকে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছেন।
এই ফলাফল আমাদের প্রচলিত ধারণাকে একটু নাড়া দেয়। এতদিন আমরা মানসিক স্বাস্থ্যের আলোচনায় দারিদ্র্য, শিক্ষা কিংবা কর্মসংস্থানের মতো আর্থসামাজিক নির্ণায়কগুলোকেই প্রধান বিবেচনায় রেখেছি। কিন্তু এই গবেষণা বলছে, আয় বা শিক্ষার প্রভাব বাদ দিয়েও অর্থাৎ এসব বিষয় নিয়ন্ত্রণ করার পরও, শুধু ঘরের ভৌত পরিবেশের কারণেই নারীর মানসিক স্বাস্থ্যের ঝুঁকি বাড়তে পারে। গুরুত্বপূর্ণ ও স্বতন্ত্র এই বিষয়টি এতদিন আমাদের নীতি-আলোচনায় প্রায় অনুপস্থিত ছিল।
আমাদের স্বাস্থ্যনীতিতে মানসিক রোগের প্রতিরোধ ও চিকিৎসার আলোচনা সাধারণত মনোসামাজিক কাউন্সেলিং বা ওষুধকেন্দ্রিক সমাধানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু এই গবেষণা যে বার্তা দিচ্ছে তা হলো, পরিচ্ছন্ন রান্নার জ্বালানি সহজলভ্য করা, উন্নত স্যানিটেশন নিশ্চিত করা এবং জনবহুল বসতিতে বাসস্থানের ঘনত্ব কমানোর মতো উদ্যোগও একই সঙ্গে একটি কার্যকর মানসিক স্বাস্থ্য হস্তক্ষেপ হতে পারে। অর্থাৎ গৃহায়ণ, জলবায়ু ও জনস্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাজকে যদি মানসিক স্বাস্থ্য পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত করা যায়, তাহলে তার সুফল দ্বিমুখী হতে পারে।
দেশের লাখো নারী যে ঘরে বসবাস করেন, সেই ঘরের বাতাস কতটা নির্মল, শৌচাগার কতটা নিরাপদ, শোবার ঘরে কতটা জায়গা আছে, এসব প্রশ্ন আজ আর নিছক অবকাঠামোগত প্রশ্ন নয়, এগুলো তাঁদের মনের স্বাস্থ্যেরও প্রশ্ন। উন্নয়নের সংজ্ঞায় যদি আমরা সত্যিই মানুষের সামগ্রিক কল্যাণকে অন্তর্ভুক্ত করতে চাই, তাহলে গৃহপরিবেশের এই নীরব সংকটকে আর অগ্রাহ্য করার সুযোগ নেই।
বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে নীতি ও কর্মসূচির বড় অংশ এখনো চিকিৎসা ও সেবা ব্যবস্থাকেন্দ্রিক। এর প্রয়োজনও অবশ্যই আছে। এজন্য মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, মনোবিজ্ঞানী, কাউন্সেলর, ওষুধ ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবা আরও বাড়াতে হবে। কিন্তু শুধু চিকিৎসা বাড়িয়ে মানসিক স্বাস্থ্যের সব সমস্যা সমাধান করা সম্ভব নয়। যদি একটি পরিবারের পরিবেশই দীর্ঘদিন ধরে মানসিক চাপ তৈরি করে, তাহলে শুধু ওষুধ দিয়ে সমস্যার পুরো সমাধান হবে না।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো, মানসিক স্বাস্থ্য উন্নয়নের জন্য সব সময় বড় হাসপাতাল বা ব্যয়বহুল প্রযুক্তির প্রয়োজন হয় না। অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় পর্যায়ে ছোট ছোট পরিবর্তনও বড় ভূমিকা রাখতে পারে। পরিষ্কার রান্নার ব্যবস্থা, রান্নাঘরের উন্নত বায়ুচলাচল, নিরাপদ পানি, স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট, হাত ধোয়ার জায়গা এবং বসবাসের জায়গার উন্নয়ন, এসবই জনস্বাস্থ্যের বিনিয়োগ। স্থানীয় সরকার, স্বাস্থ্য বিভাগ, নারী ও শিশুবিষয়ক প্রতিষ্ঠান, পানি ও স্যানিটেশন সংশ্লিষ্ট সংস্থা এবং আবাসন পরিকল্পনাকারীদের মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন। একই সঙ্গে কমিউনিটি সংগঠন ও স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকদের যুক্ত করা যেতে পারে। বিশেষ করে গ্রামীণ ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য ঘরভিত্তিক স্বাস্থ্য ও মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা কর্মসূচি কার্যকর হতে পারে। কেবল মানসিক চিকিৎসার ওপর নির্ভর না করে উন্নত স্যানিটেশন, পরিবেশবান্ধব ও ধোঁয়ামুক্ত চুলা এবং আবাসনের মান উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশে প্রায় ২ থেকে ২.৪ মিলিয়ন নারীর মানসিক স্বাস্থ্যের ঝুঁকি কমানো সম্ভব।
লেখক: গবেষক, প্রাবন্ধিক ও সম্পাদক



