স্ট্রোকের পরও বিপদ থাকে

ছবি: সাজ্জাদ হোসেন
স্ট্রোক-পরবর্তী জটিলতা কখনো কখনো জীবনহানির কারণ হতে পারে, আবার কিছু রোগীর স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় দীর্ঘস্থায়ী প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। লিখেছেন ডা. হুমায়ুন কবীর হিমু
স্ট্রোক হলে পরিবারের সবার প্রথম চিন্তা থাকে— রোগী বাঁচবেন তো? দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা এবং উপযুক্ত চিকিৎসার মাধ্যমে অনেক রোগীর জীবন রক্ষা করা সম্ভব। কিন্তু এখানেই চিকিৎসা শেষ নয়। বরং স্ট্রোকের পর শুরু হয় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়— জটিলতা প্রতিরোধ, পুনর্বাসন এবং দ্বিতীয়বার স্ট্রোক ঠেকানোর দীর্ঘমেয়াদি লড়াই।
স্ট্রোকের ধরন, মস্তিষ্কের কোন অংশ আক্রান্ত হয়েছে এবং ক্ষতির মাত্রার ওপর নির্ভর করে পরবর্তী জটিলতা ভিন্ন হতে পারে। কখনো কখনো জীবনহানির কারণ হতে পারে, আবার কিছু রোগীর স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় দীর্ঘস্থায়ী প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে।
মস্তিষ্কে ফোলা, রক্তক্ষরণ
বড় আকারের ইস্কেমিক স্ট্রোকে মস্তিষ্কের আক্রান্ত অংশ ফুলে যেতে পারে। একে সেরেব্রাল এডেমা বলা হয়। এতে রোগীর চেতনা কমে যায় এবং গুরুতর অবস্থায় মস্তিষ্কের ওপর চাপ তৈরি হয়ে প্রাণহানি ঘটতে পারে। কোনো ক্ষেত্রে জীবন রক্ষায় অস্ত্রোপচারও প্রয়োজন হতে পারে।
আবার ইস্কেমিক স্ট্রোকের পর আক্রান্ত মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হতে পারে, যাকে হেমোরেজিক ট্রান্সফরমেশন বলা হয়। রোগীর হঠাৎ অবনতি হলে দ্রুত সিটি স্ক্যান বা এমআরআই করে কারণ খুঁজে বের করা জরুরি।
নিউমোনিয়ার ঝুঁকি
স্ট্রোকের পর অনেক রোগীর খাবার বা পানি গিলতে সমস্যা হয়। অসাবধানতায় খাবার ফুসফুসে ঢুকে গেলে এস্পিরেশন নিউমোনিয়া হতে পারে। এতে জ্বর, কাশি, শ্বাসকষ্ট ও রক্তে অক্সিজেন কমে যেতে পারে।
তাই স্ট্রোকের পর রোগীকে মুখে খাবার দেওয়ার আগে গিলতে পারার সক্ষমতা পরীক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ।
শরীর অবশ, চলাফেরায় সমস্যা
শরীরের এক পাশ দুর্বল বা অবশ হয়ে যাওয়া স্ট্রোকের অন্যতম পরিচিত পরিণতি। কারও হাঁটতে সমস্যা হয়, হাতের সূক্ষ্ম কাজ করার ক্ষমতা কমে যায়। দীর্ঘদিন নড়াচড়া না করলে পেশি ও জয়েন্ট শক্ত হয়ে যেতে পারে এবং ব্যথা হতে পারে।
ফিজিওথেরাপি, অকুপেশনাল থেরাপি এবং প্রয়োজন অনুযায়ী হাঁটার সহায়ক যন্ত্র রোগীকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
কথা ও স্মৃতিতে সমস্যা
স্ট্রোকের পর কথা বলতে বা অন্যের কথা বুঝতে সমস্যা হতে পারে। কেউবা স্মৃতি, মনোযোগ, সিদ্ধান্ত নিতে সমস্যায় পড়েন।
স্পিচ ও ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপি, কগনেটিভ রিহ্যাবিলিটেশনের মাধ্যমে অনেক রোগীকে ধীরে ধীরে যোগাযোগ ও দৈনন্দিন কাজে ফিরতে সাহায্য করে।
খিঁচুনি ও রক্ত জমাট
কিছু রোগীর স্ট্রোকের পর খিঁচুনি হতে পারে। বিশেষ করে মস্তিষ্কের বাইরের অংশ বা কর্টেক্স আক্রান্ত হলে কিংবা মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হলে ঝুঁকি বাড়ে। অন্যদিকে দীর্ঘ সময় শুয়ে থাকলে পায়ের গভীর শিরায় রক্ত জমাট বা ডিভিটি (DVT) হতে পারে। এই জমাট রক্ত ফুসফুসে চলে গেলে পালমোনারি এম্বোলিজম হয়ে মৃত্যু হতে পারে। তাই স্ট্রোকের পর ওষুধের পাশাপাশি ফিজিওথেরাপিস্ট, অকুপেশনাল থেরাপিস্ট, স্পিচ ও সয়ালো থেরাপিস্ট, চিকিৎসক, নার্স, পুষ্টিবিদ এবং পরিবারের সদস্যদের সমন্বিত প্রচেষ্টাই রোগীকে যতটা সম্ভব স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে পারে।
দ্বিতীয়বার স্ট্রোক ঠেকানো
প্রথম স্ট্রোকের পর আরেকটি স্ট্রোক প্রতিরোধ করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্ট্রোকের কারণ নির্ণয় করে সে অনুযায়ী অ্যান্টিপ্লাটিলেট, কোলেস্টেরল কমানোর ওষুধ এবং রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করতে হয়।
হঠাৎ অবনতি হলে অপেক্ষা নয়
স্ট্রোকের পর রোগীর হঠাৎ চেতনা কমে গেলে, নতুন করে হাত-পা দুর্বল হলে, কথা জড়িয়ে গেলে, তীব্র মাথাব্যথা, বারবার বমি, খিঁচুনি বা শ্বাসকষ্ট হলে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে।
লেখক: সহযোগী অধ্যাপক
ইন্টারভেনশনাল নিউরোলজি বিভাগ
ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস হাসপাতাল






