পৃথিবীর আর কোথায় আছে ?
‘ঢাকার রিকশায় ভ্রমণ করে বরাবরই পেয়েছি মানুষের গল্প, শহরের গন্ধ’

শিল্পীর ক্যানভাসে ঢাকার রিকশাভ্রমণ -আবু সালেহ টিটু
আমি সাতাশটি দেশ ভ্রমণ করেছি— শীতের আল্পাইন গ্রাম থেকে মরুভূমির রাতের আকাশ, উন্নত মেগা-শহরের সড়ক থেকে ছোট দ্বীপের পুকুরপাড়— সবকিছু দেখেছি। তবুও ঢাকার রিকশা সফর আমাকে এখনো এমনভাবে স্পন্দিত করে যে, সেই কথা মনে পড়লে শহরের গন্ধ, শব্দ, রঙ— সব ফিরে ফিরে আসে।
দিনটি ছিল কুড়ি বছর বাদে বাংলাদেশে ফেরার। আরামদায়ক সেই বিকালে হোটেল রুমের জানালা দিয়ে নিচে দেখছিলাম। অ্যাপে দ্রুত গাড়ি বা সিএনজি পাওয়া যায় বটে, কিন্তু বহুদিন পর রিকশায় চড়ার খুব ইচ্ছে হলো। নিচে নেমে রাস্তা পার হচ্ছি, হঠাৎ দেখি এক রিকশাচালক আমাকে ডাকছেন— ‘ভাই, রিকশা নেবেন?’ উষ্ণ ভঙ্গিতে বলা কথাটি শুনে অধুনা অচেনা শহরে চালককে বেশ আপন লাগল। ঢাকার প্যাডেলচালিত রিকশা আমার পছন্দের বাহন— একটু ধীরগতি, কিন্তু এর একটা অলস সৌন্দর্য আছে।
বছর বিশেক আগে ঢাকার রিকশার পেছনে থাকত চিত্রনায়ক-নায়িকা, পশু-পাখি বা ধর্মীয় কোনো ছবি। যেটা এখন প্রায় উধাও। শহর জুড়ে আজ ব্যাটারি রিকশার প্রবল প্রতাপ, যার উৎকট হর্নের শব্দে কানের বারোটা বাজার উপক্রম। চালকের বয়স আনুমানিক পঞ্চাশ-পঞ্চান্ন, চেহারায় এমন এক ক্লান্তি যা অনেক গল্পের ইঙ্গিত দেয়। তিনি নিজের নাম বললেন মোজাম্মেল— বছর দশেক আগে গ্রাম থেকে ঢাকা এসেছেন। ছেলেমেয়ের পড়াশোনার খরচ অনেক বেড়ে গেছে— বলে একটু হেসে উঠলেন। কথাগুলো শোনার সঙ্গে সঙ্গে আমার ভেতরে এক অদ্ভুত ঘনিষ্ঠতা জেগে উঠল; প্রলম্বিত প্রবাসজীবনের সব ক্লান্তি মুছে গিয়ে ইচ্ছে করল কফিশপে বসে কফি খেতে খেতে চালকের কথা শুনতে থাকি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা আর হলো না।
মোজাম্মেল গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার পর বিদায় জানাতে গিয়ে বললাম, ‘আগামীতে যদি ঢাকায় আসি, রিকশায় ঘুরলে নিশ্চয়ই আরও অনেক নতুন নতুন গল্প পাব, কিন্তু প্যাডেল রিকশা পাব তো?’ মোজাম্মেল নিরুত্তর রইলেন!
ঢাকা সম্ভবত বিশ্বের একমাত্র মেগাসিটি, যেখানে মনুষ্যচালিত রিকশা শহরবাসীর দৈনন্দিন চলাচলের অন্যতম প্রধান বাহন। গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস ২০১৪-এ ঢাকাকে ‘রিকশার নগরী’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়; এখানে বৈধ ও অবৈধ মিলে প্রায় ১৫ লাখ রিকশা চলাচল করে, যার মধ্যে আনুমানিক চার লাখ রিকশা ব্যাটারিচালিত।
বহু বছরের ভ্রমণজীবনে বহু মনোহর মুহূর্ত এসেছে, কিন্তু ঢাকার রিকশায় ভ্রমণ করে বরাবরই পেয়েছি মানুষের গল্প, শহরের গন্ধ, আর অপ্রত্যাশিত সদয়তা— এ তিনটি মিলেই তো ভ্রমণের আসল সৌন্দর্য।
(লেখক: যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত এই বাংলাদেশি ঘুরে বেড়িয়েছেন বিশ্বের সাতাশটি দেশ)






