তিলোত্তমা নাকি রুটি-রুজির সরাইখানা!
- যে শহর মানুষকে আশ্রয় দেয়, অন্ন দেয়— সেই শহর উৎসবের দিনগুলোতে বড্ড একা হয়ে পড়ে। প্রায় নিঃসঙ্গ হয়ে পড়া ঢাকাকে নিয়ে লিখেছেন শম্পা বিশ্বাস

ঈদের ছুটি শুরু হতেই চিরচেনা রূপ হারিয়েছে রাজধানী ঢাকা। নেই তীব্র যানজট, ভিড়ভাট্টা, চিৎকার-চেঁচামেচি আর কার্বন-ডাইঅক্সাইডের যন্ত্রণা।
ছুটি শুরু হতেই সব পথ গিয়ে মেলে বাস টার্মিনাল, রেলওয়ে স্টেশন আর লঞ্চ ঘাটগুলোয়। লাখ লাখ মানুষ কখনো তীব্র গরম, কখনো হাড়কাঁপানো শীত, জটলা আর ভোগান্তি মাথায় নিয়ে ছুটে যায় গ্রামের বাড়িপানে। পরিসংখ্যান বলছে, দুই ঈদ কেন্দ্র করে প্রতি বছর ঢাকা ছেড়ে যায় প্রায় ৮০ লাখ থেকে ১ কোটি মানুষ।
বিপুল এ জনগোষ্ঠী ঢাকা ছাড়লে রাজধানীর ওপর থেকে অতিরিক্ত বোঝা কমে ঠিকই কিন্তু এ শহরের প্রতিদিনের ধুলোমাখা গাছপালা আর ট্রাফিক সিগন্যালের বাতিগুলো পর্যন্ত তার বাসিন্দাদের খুঁজে বেড়ায়। যাদের কোলাহলে ২৪ ঘণ্টা মুখর থাকে, তারাই এক নিমেষে শহরটিকে ফাঁকা করে চলে যায়; যা প্রতি বছর একটি নির্মম ও চিরন্তন সত্যকে উন্মোচন করে— বসবাসকারী সিংহভাগ মানুষের রুটি-রুজি এ কংক্রিটের অরণ্যে হলেও, তাদের মন ও শিকড় পড়ে থাকে দূর গ্রামে। ফলে প্রশ্ন ওঠে, টাকা উপার্জনের যন্ত্র হিসেবে ব্যবহার করলেও, ঢাকাকে কি আসলেই কেউ মন থেকে ভালোবাসে? নাকি ঢাকা কেবলই টিকে থাকার এক নির্মম সরাইখানা? যাকে সবাই ব্যবহার করে, ভোগ করে কিন্তু ভালোবাসে না।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এবং নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, ঢাকার জনসংখ্যা এখন দুই কোটিরও বেশি। কিন্তু এর মধ্যে স্থায়ী বাসিন্দার সংখ্যা এক-চতুর্থাংশও নয়। বেশিরভাগই ঢাকার অস্থায়ী বা ভাসমান বাসিন্দা। এ ভাসমান সমাজের মধ্যে রয়েছে পেশাজীবী, ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে দিনমজুর; সব শ্রেণির মানুষ। এ শহরের প্রায় ৭৫ শতাংশ মানুষের স্থায়ী বাড়ি ঢাকার বাইরে। বিপুল এ জনগোষ্ঠী ঢাকায় আসে কেবল জীবিকার তাগিদে। ফলে ঈদ কিংবা একটু দীর্ঘ ছুটি পেলেই ঢাকা হয়ে পড়ে প্রায় নিঃসঙ্গ। যে শহর মানুষকে আশ্রয় দেয়, অন্ন দেয়— সেই শহর উৎসবের দিনগুলোতে বড্ড একা হয়ে পড়ে। ফলে অন্যদের কাছে উৎসব সবার মিলনমেলা হলেও ঢাকার কাছে তা নিছকই ছেড়ে যাওয়ার বেদনা। ঢাকায় জন্ম হওয়া ও বেড়ে ওঠা মিরপুরের বাসিন্দা মারুফা আক্তার আগামীর সময়কে বলেছেন, ঢাকাকে আমি ভরপুর দেখতেই ভালোবাসি। ফাঁকা ঢাকার রাস্তাঘাট কেমন মনে হয় অচেনা। অনেকটা গা ছমছম করা ভূতের বাড়ির মতো। ভিন্নমতও আছে। মহানগর প্রজেক্টের কামরুজ্জামান খান জানিয়েছেন, ঢাকা নিয়ে মানুষের মধ্যে ভালোবাসা দেখি না বরং বিতৃষ্ণা আছে। আমরাই এজন্য দায়ী।
ঢাকা নিয়ে মানুষের অনুভূতি দ্বিধাবিভক্ত। তবে পৃথিবীর বহু শহর আজও তাদের বাসিন্দাদের স্মৃতিতে মমতার আশ্রয় হয়ে আছে
ঢাকা নিয়ে মানুষের অনুভূতি দ্বিধাবিভক্ত। তবে পৃথিবীর বহু শহর আজও তাদের বাসিন্দাদের স্মৃতিতে মমতার আশ্রয় হয়ে আছে। সেসব শহর তাদের নাগরিকদের মনে নস্টালজিয়ার উষ্ণতা জাগায়। এইতো পার্শ্ববর্তী পশ্চিমবঙ্গের শহর কলকাতা। সংস্কৃতি ও আবেগের ফারাক থাকলেও পাঠক বা নগরবিদদের মনে প্রায়ই একটি তুলনা চলে আসে— পশ্চিমবঙ্গের কলকাতা আর আমাদের ঢাকা! দুই শহরই দুই বাংলার প্রাণকেন্দ্র। কিন্তু কলকাতার মানুষ যেভাবে তাদের শহরকে মন থেকে ভালোবাসে, তাতে যে আবেগ মিশ্রিত থাকে; ঢাকায় তার বড্ড অভাব!
আবার কলকাতা নিয়ে তৈরি হয়েছে কত গান, কবিতা আর সিনেমা। যেখানে কলকাতাকে শুধু একটি শহর নয়, বরং উপস্থাপন করা হয়েছে এক টুকরো অনুভূতি হিসেবে। গায়ক, কবি আর ঔপন্যাসিকরা তাদের সৃষ্টিতে কলকাতাকে একটি জীবন্ত চরিত্র হিসেবে দাঁড় করিয়েছেন। কলকাতা এক অদ্ভুত শহর, এখানে তিলোত্তমা রূপের আড়ালে একটা মন আছে, যা তার বাসিন্দারা বুকে বয়ে বেড়ায়। অন্যদিকে, ঢাকা নিয়ে শিল্প-সাহিত্যে আক্ষেপ আর ক্ষোভের পরিমাণই অনেক বেশি। গণমাধ্যম থেকে শুরু করে সর্বত্র এ শহরকে শুধু যানজট, দূষণ, হত্যা, ছিনতাই, ধর্ষণ, বৈষম্যের শহরের মতো উপমা দেওয়া হয়েছে। ফলে ঢাকা নিয়ে নাগরিক মনে প্রেম নয়, বরং বিরক্তই বেশি। যদিও শিল্প-সাহিত্যে এ ধারা ভাঙা শুরু হয়েছে।
পাখির চোখে ঢাকা শহর -আশরাফুল আলম
ঢাকা কেন তার আবেদন হারিয়েছে; জানতে চেয়েছিলাম নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. আকতার মাহমুদের কাছে। তিনি আগামীর সময়কে বলেছেন, ঢাকাকে ভালোবাসতে না পারার পেছনে অন্যতম কারণ এ শহরের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণ। কোনো মেগাসিটি এমন অগোছালো হতে পারে না। তা ছাড়া বাসযোগ্যতার বৈশ্বিক সূচকে ঢাকা প্রতি বছরই তলানির দিকে থাকে। দূষণ, যানজট, মশা, খেলার মাঠের অভাব, জলাবদ্ধতা ইত্যাদি নানা কারণে মানুষের মনে এ শহরের প্রতি এক ধরনের ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে ঢাকাকে ভালো না বাসার পেছনে মনস্তাত্ত্বিক দিক তুলে ধরেছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. রফিকুল ইসলাম। যেমনটা তিনি বলছিলেন আগামীর সময়কে, নগর উন্নয়নের সঙ্গে কিছু বিষয় কাজ করে। মানুষ নগরে আসে রুটি-রুজির জন্য। কিন্তু এখানে থাকতে থাকতে তাদের শিকড়ের কথাও মনে পড়ে। বাঙালিদের জন্য এটা একটু বেশিই হয়। অন্য দেশেও উৎসব হয়। তবে এত মানুষ তাদের রুটি-রুজির শহর ছেড়ে যায় না। তিনি বিষয়টি ব্যাখ্যা করেন এভাবে— মায়ের কাছ থেকে পড়াশোনা বা চাকরি, নানান কারণে সন্তান দূরে যায়। তাই বলে মায়ের সঙ্গে সম্পর্ক শেষ হয় না। তবে এ অধ্যাপকের পরামর্শ— যোগাযোগব্যবস্থা, বিদ্যুৎ, বিনোদন, যানজট নিরসন করা গেলে এ নগরের প্রতি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাবে।
ঢাকার নাগরিকরা ঢাকাকে ব্যবহার করে টাকা রোজগার করে, সেই উপার্জিত টাকা দিয়েই গ্রামে গিয়ে ঈদ করে। অথচ ঢাকা যখন জলাবদ্ধতায় নাকাল, ডেঙ্গুতে কাঁদে কিংবা ঢাকার খালগুলো যখন দখল হয়ে যায় তখন কেউ ঢাকার পাশে দাঁড়ায় না। তবে এখন সময় এসেছে এ শহরকে শুধু কর্মক্ষেত্র না ভেবে ভালোবাসার। মন থেকে ভালোবাসলে নিশ্চয়ই কোনো একদিন ঈদে বা কোরবানিতে ঢাকা আর ফাঁকা হবে না।







