ভুয়া ভিডিওর মাধ্যমে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক নিয়ে আন্তর্জাতিক অপপ্রচার

ছবি: আগামীর সময়
ইরান পতনের পর ভারত প্রতিবেশী রাষ্ট্র পাকিস্তান, আফগানিস্তান, বাংলাদেশ ও নেপাল দখল করে ‘অখণ্ড ভারত’ প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করছে—এমন একটি চাঞ্চল্যকর দাবি সহকারে ভারতীয় সেনাবাহিনীর মেজর জেনারেল সি. এস. মান–এর একটি ভিডিও সম্প্রতি ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে। ভাইরাল হওয়া ৩১ সেকেন্ডের ভিডিওটিতে সংশ্লিষ্ট সেনা কর্মকর্তাকে ইংরেজিতে একটি ভূ-রাজনৈতিক পরিকল্পনার কথা বলতে শোনা যায়, যেখানে ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রকে জড়িয়ে হুমকি দেওয়া হচ্ছে।
তবে তথ্য অনুসন্ধানে দেখা গেছে, প্রচারিত এই দাবি ও ভিডিওটি সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বানোয়াট। মূলত এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে কণ্ঠ ও ভাষা বিকৃত করে এই ‘ডিপফেক’ ভিডিওটি তৈরি করা হয়েছে।
অনুসন্ধান ও আসল উৎস
ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটির সত্যতা ও মূল উৎস যাচাইয়ে রিভার্স ইমেজ সার্চের সহায়তা নেওয়া হয়। অনুসন্ধানে দেখা যায়, ভাইরাল ক্লিপটির আসল উৎস ২০২৫ সালের ৪ জুলাইয়ের একটি ঘটনা।
ওই দিন ভারতীয় সংবাদ সংস্থা প্রেস ট্রাস্ট অব ইন্ডিয়া (PTI)–এর অফিশিয়াল এক্স (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্টে মূল ভিডিওটি প্রকাশিত হয়েছিল। আসল ভিডিওটি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, মেজর জেনারেল সি. এস. মান সেখানে সামরিক সরঞ্জামে চীনা যন্ত্রাংশ ব্যবহার না করার বিষয়ে ভারতীয় সেনাবাহিনীর কঠোর অবস্থানের কথা বলছিলেন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আসল ভিডিওটিতে তিনি হিন্দি ভাষায় বক্তব্য দিয়েছিলেন, ইংরেজিতে নয়। সে সময় ভারতের মূলধারার বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনেও জানানো হয়েছিল যে, ড্রোনসহ সামরিক সরঞ্জামে চীনা উপাদান ব্যবহার বন্ধের বিষয়েই সেই সংবাদ সম্মেলনটি ছিল।
প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ ও এআই শনাক্তকরণ
ভাইরাল ভিডিওটির অডিও ও ঠোঁটের নড়াচড়ার মধ্যে স্পষ্ট অসামঞ্জস্য লক্ষ্য করা যায়, যা ডিজিটাল কারসাজির প্রাথমিক ইঙ্গিত দেয়। পরবর্তীতে এআই শনাক্তকরণ বিশ্বস্ত টুল ‘হাইভ ডিটেকশন’ –এ ভিডিওটি পরীক্ষা করা হয়। পরীক্ষার ফলাফলে দেখা গেছে, ভিডিওর ইংরেজি অডিওটি প্রায় ৯৮.৮ শতাংশ সম্ভাবনায় কৃত্রিম বা এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে তৈরি। অর্থাৎ, তাঁর আসল হিন্দি কণ্ঠস্বর পরিবর্তন করে কৃত্রিম ইংরেজি কণ্ঠ জুড়ে দেওয়া হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর যৌথ সিদ্ধান্ত
আন্তর্জাতিক ফ্যাক্টচেকিং সংস্থা এএফপি ফ্যাক্টচেক (AFP Fact Check) এবং ভারত সরকারের তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান প্রেস ইনফরমেশন ব্যুরো (PIB)–ও অনুসন্ধানের পর এই ভিডিওটিকে সম্পূর্ণ ভুয়া এবং এআই-নির্মিত ডিপফেক হিসেবে শনাক্ত করে সতর্কতা জারি করেছে।
সামগ্রিক তথ্য-প্রমাণ ও প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ শেষে এটি শতভাগ নিশ্চিত যে, ‘ইরান পতনের পর ভারত প্রতিবেশী দেশগুলো দখল করে অখণ্ড ভারত গড়বে এবং ইসরায়েলকে সহায়তা করবে’—এমন দাবিটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ও ভিত্তিহীন। চীনা সামরিক সরঞ্জাম বর্জনের বিষয়ে দেওয়া একটি পুরোনো হিন্দি বক্তব্যের ভিডিওকে ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে বিকৃত করে, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নষ্টের উদ্দেশ্যে এই বিভ্রান্তিকর গুজবটি ছড়ানো হয়েছে।









