চীনের দুয়ার বন্ধ, থেমে নেই ছিজির কথার জাদু

ঝুঁকিপূর্ণ হলেও আকর্ষক হওয়ায়, তাইওয়ানে পারফর্ম করার পরিকল্পনা দিয়েই ছিজির ২০২৬ সালের সফর শুরু হয়
স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থা ও কঠোর সেন্সরশিপের জন্য চীনের কুখ্যাতি বিশ্বজুড়ে। সেখানে সরকারের বিরুদ্ধে একটি শব্দ উচ্চারণ করা মানেই অবধারিত জেল কিংবা গায়েব হয়ে যাওয়া। আর খোদ চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে নিয়ে কৌতুক বা রসিকতা করা? তা তো সাধারণ মানুষের কল্পনারও বাইরে!
কিন্তু ঠিক এই অসম্ভব কাজটিই বুক ঠুকে করে দেখিয়েছেন চীনের একসময়ের এক নম্বর স্ট্যান্ড-আপ কমেডিয়ান ছিজি।
ফলশ্রুতিতে বেইজিং সরকার তাকে নিজ দেশে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেছে, কেড়ে নিয়েছে তার ৪৭ লাখ ভক্তের সোশ্যাল মিডিয়া আইডি। কিন্তু দমে যাননি ৩০ বছর বয়সী এই তরুণ। দেশছাড়া হয়েও এখন বিশ্বমঞ্চে চীনা ভাষায় স্ট্যান্ড-আপ কমেডি করে একের পর এক শো ‘হাউসফুল’ করছেন তিনি।
ছিজির আসল নাম ওয়াং ইউয়েচি। ২০১৫ সালে স্কুলছুট এই তরুণ স্রেফ বাচালতার গুণে ওপেন মাইকে কৌতুক করা শুরু করেন। অসাধারণ রসবোধ আর উপস্থিত বুদ্ধির জোরে রাতারাতি তিনি হয়ে ওঠেন চীনের ওটিটি প্ল্যাটফর্মের ‘সুপারস্টার’।
তার শো-গুলোতে কোটি কোটি ভিউ আসত। কিন্তু বাকি কমেডিয়ানদের মতো ছিজি স্রেফ হালকা রসিকতায় সীমাবদ্ধ ছিলেন না। তিনি চীনের সমসাময়িক সমস্যা, শিশু নির্যাতন কেলেঙ্কারি কিংবা কঠোর লকডাউনের মতো বিষয়গুলো নিজের কৌতুকের মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলতেন।
২০২৩ সালে উত্তর আমেরিকা ট্যুরের সময় তিনি চীনের কড়া সেন্সরশিপ, উইঘুর মুসলিম ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের অধিকার খর্ব হওয়া এবং হংকং-তাইওয়ানের স্বাধীনতা নিয়ে খোলামেলা জোকস বলেন। ব্যস, বেইজিংয়ের লাল চোখ তার ওপর পড়ে। দেশে তার প্রবেশ ও পারফর্ম্যান্সের ওপর অঘোষিত আজীবন নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়।
সম্প্রতি ছিজি এক পোস্টে আক্ষেপ করে লেখেন, ‘চীনে আমার মুখমণ্ডলকে একটি নিষিদ্ধ অঙ্গের মতো দেখা হয়। আমার ছবি শেয়ার করার অপরাধে এক ভক্তের সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট পর্যন্ত ডিলিট করে দেওয়া হয়েছে!’
দীর্ঘ বিরতির পর গত এপ্রিল থেকে ছিজি শুরু করেছেন তার নতুন এশিয়ান ট্যুর। টোকিও, তাইপেই ও কুয়ালালামপুরের পর সম্প্রতি সিঙ্গাপুর ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির অডিটোরিয়ামে শো করেন তিনি। অডিটোরিয়াম ঠাসা চীনা শ্রোতাদের সামনে মঞ্চে এসেই শি জিনপিংয়ের দীর্ঘ শাসনকাল নিয়ে একটি মোক্ষম জোকস ছাড়েন ছিজি।
তবে সরাসরি জিনপিংয়ের নাম নেননি তিনি; কৌশলে চীনের ফার্স্ট লেডি ও বিখ্যাত গায়িকা পেং লিউয়ানের নাম টেনে তাকে সম্বোধন করেন ‘পেং লিউয়ানের স্বামী’ হিসেবে!
চীনের ক্ষমতাধর প্রেসিডেন্টকে নিয়ে এমন খোলামেলা রসিকতা শুনে সিঙ্গাপুরের অডিটোরিয়ামে হাসির রোল পড়ে যায়। ম্যান্ডারিন ভাষায় এক শ্রোতা চিৎকার করে ওঠেন, ‘ছিজি, তুমি তো মঞ্চে আগুন লাগিয়ে দিয়েছ!’
চীনের সবচেয়ে বড় ‘রেড লাইন’ বা শত্রু রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত তাইওয়ানেও শো করেছেন ছিজি। এই বিষয়ে তিনি বলেছেন, ‘এর আগে কোনো চীনা কমেডিয়ান তাইওয়ানে পারফর্ম করার সাহস দেখায়নি। যদি কোনো কিছু ঝুঁকিপূর্ণ বা বিপজ্জনক মনে হয়, তবেই আমার তা করতে ভালো লাগে।’
বিবিসি-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ছিজি জানান, চীনের কঠোর করোনা লকডাউনের সময় কোটি কোটি মানুষের অসহায়ত্ব ও খাবার-ওষুধের হাহাকার তাকে ভেতরে ভেতরে বদলে দিয়েছিল। একজন সেলিব্রিটি হিসেবে তিনি সাধারণ মানুষের কষ্টের পোস্ট শেয়ার করলেও চীনা সেন্সররা তা প্রতিবার মুছে দিত।
ছিজি বলেছেন, ‘সেই সময় নিজের জনপ্রিয়তাকে খুব অর্থহীন আর অসহায় মনে হয়েছিল। তখনই বুঝলাম, এই দেশে আর কোনো আনন্দ অবশিষ্ট নেই।’
বর্তমানে চীন ছেড়ে প্রবাসে থাকা এই তরুণ কমেডিয়ান এখন অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড ও উত্তর আমেরিকায় তার এই সফরের পরিধি বাড়াচ্ছেন। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, চীনের ওটিটি দুনিয়া এখন বড্ড অগভীর ও সংকীর্ণ হয়ে গেছে, তাই দেশে নিষিদ্ধ হওয়া নিয়ে তার মনে কোনো আফসোস বা আক্ষেপ নেই।





