অ্যালবাম ছাড়াই আইরিশ কন্যারা মাতাচ্ছেন সারা দুনিয়া

বার্ডসের প্রতিষ্ঠাতা জানান, দলটির লক্ষ্য হলো ঐতিহ্যবাহী আইরিশ সংগীতে নারীদের ঘিরে প্রচলিত ধারণা বদলে দেওয়া
আয়ারল্যান্ডের ঐতিহ্যবাহী গানের দল ‘বার্ড’ এখন লড়ছে এক অবিশ্বাস্য লড়াই। ২০২৪ সালের সেন্ট প্যাট্রিক দিবসে লন্ডনের ট্রাফালগার স্কয়ারে ১০ হাজার মানুষের সামনে যখন তারা প্রথমবার দাঁড়িয়েছিলেন, তখনো দলটির সব সদস্য একসাথে একবারও প্র্যাকটিস করেননি।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই ১১ জন নারী মিউজিশিয়ানের অনেকেরই একে অপরের সাথে মঞ্চে ওঠার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে প্রথম দেখা হয়েছিল। অথচ আজ দুই বছর পর তারা কোনো অ্যালবাম বা রেকর্ড রিলিজ ছাড়াই আয়ারল্যান্ড ও যুক্তরাজ্যের বড় বড় হলরুমের সব টিকিট নিমেষেই শেষ করে দিচ্ছেন। তাদের এই অভাবনীয় সাফল্যের পেছনে মূলত কাজ করছে সরাসরি মঞ্চে গান গাওয়ার অদম্য শক্তি আর মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়া দারুণ সুনাম।
ব্যান্ডের গায়িকা মিধাক্লুগাইন ও'ডোনেল নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে একদম হতবাক হয়ে যান। তিনি মনে করেন যে, শুরুতে সবকিছু বড্ড পাগলামি মনে হলেও এখন তারা যা করছেন তা আগে কখনো স্বপ্নেও ভাবেননি। প্রথম সেই বিশাল শোর পর কয়েক মাস তাদের কোনো কাজ ছিল না, তাই ব্যান্ডটি আদতে কতদূর যাবে তা নিয়ে সবার মনেই ছিল ঢের সন্দেহ।
দলের প্রতিষ্ঠাতা লিসা ক্যানি মূলত মাথায় রেখেছিলেন ‘ট্রেডিশনাল মিউজিকের স্পাইস গার্লস’ বানানোর এক অদ্ভুত আইডিয়া। তিনি প্রায় দশ বছর ধরে এই পরিকল্পনাটি মনে মনে লালন করছিলেন যাতে লোকজ সংগীতে নারীদের সেই মান্ধাতা আমলের রূপটি বদলে দেওয়া যায়। লিসা চান যে, বিশ্বজুড়ে আইরিশ গানের মঞ্চে নারীরা যেন আরও আধুনিক আর সাহসীভাবে নিজেদের তুলে ধরেন।কাউন্টি মেয়োর লিসা ক্যানি এই গানের ভুবনে আগে থেকেই ছিলেন বড্ড পরিচিত এক নাম। হার্প আর ব্যাঞ্জো বাজিয়ে তিনি সাতবার চ্যাম্পিয়ন হয়ে নিজেকে এক অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। দলের অন্য সদস্যরা তাকে ভালোবেসে ডাকেন ‘ট্র্যাডিশনাল মিউজিকের ব্যাডি’ নামে, কারণ লিসা সবসময়ই নিয়মের বাইরে গিয়ে নতুন কিছু করতে ভীষণ পছন্দ করেন।
এই ব্যান্ডটি আসলে কোনো অডিশন নিয়ে বা ছক কষে তৈরি করা হয়নি। লিসার সাথে যাদের দীর্ঘদিনের চেনা-জানা ছিল, তাদের মধ্য থেকেই ১১ জন সেরা মানুষকে তিনি খুঁজে বের করেছেন। লিসা চেয়েছিলেন এমন সব গুণী নারীদের এক জায়গায় করতে, যারা প্রত্যেকেই যার যার জায়গায় একদম অনন্য। ফলে ১১ জনের এই বিশাল বহর নিয়েই তারা এখন দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন দেশ-বিদেশের সব নামী মঞ্চ।
ব্যান্ডের গানের সুর যেমন মায়াবী, তাদের সাজগোজও তেমনি চমকপ্রদ। আয়ারল্যান্ডের নামী ডিজাইনারদের বানানো ঝলমলে পোশাক আর কড়া মেকআপ নিয়ে তারা যখন মঞ্চে ওঠেন, তখন দর্শক এক মুহূর্তের জন্য হলেও থমকে যান। আইরিশ লোকজ সংগীতের সেই চেনা রূপ থেকে এই ডার্ক আর গর্জিয়াস লুকটিই তাদের ইন্টারনেটে রাতারাতি জনপ্রিয় করে তুলেছে।
ব্যান্ডের সদস্যরা শুরু থেকে এখন পর্যন্ত তাদের শেকড়ের গানটিকেই আঁকড়ে ধরে রেখেছেন। বাঁশি, হার্প আর ব্যাঞ্জোর সেই পরিচিত সুরকে তারা আধুনিক ঢঙে পরিবেশন করে তরুণ প্রজন্মের মন জয় করে নিয়েছেন। তারা মনে করেন যে, পাড়ার ছোট আড্ডায় গান গেয়ে যে আনন্দ পাওয়া যায়, তার কোনো তুলনা নেই।
বিশ্বখ্যাত তারকা এড শিরানের সাথে তাদের দেখা হওয়ার গল্পটিও বড্ড চমকপ্রদ। গত বছর একটি লোকজ উৎসবে পাবের ভেতর আড্ডা দেওয়ার সময় এড শিরান তাদের গান শোনেন এবং সাথে সাথেই তাদের সাথে ট্যুর করার প্রস্তাব দিয়ে বসেন। সেই থেকেই এই নারী ব্যান্ডটি এড শিরানের বিশাল সব স্টেডিয়াম কনসার্টে ওপেনিং অ্যাক্ট হিসেবে পারফর্ম করে দুনিয়া মাতাচ্ছে।
সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়া আর নিউজিল্যান্ড সফর শেষ করে তারা এখন পাড়ি দিচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রে। সেখানে হাজার হাজার প্রবাসী আইরিশদের ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে তারা এখন নিজেদের প্রথম অ্যালবামের কাজ শুরু করেছেন ইংল্যান্ডের বিখ্যাত ডিকয় স্টুডিওতে। দলের সদস্য ডোনোহো জানিয়েছেন যে, তাদের মাঝে বোঝাপড়া এখন এতটাই চমৎকার যে অ্যালবামের কাজ এগোচ্ছে বড্ড দ্রুত গতিতে।
ও'ডোনেল মনে মনে এক বড় স্বপ্ন দেখছেন এই ব্যান্ডটিকে নিয়ে। তিনি চান যে, তাদের দেখে যেন ছোট ছোট মেয়েরা মিউজিক শিখতে আগ্রহী হয়। ভবিষ্যতে যখন তারা থাকবেন না, তখন যেন অন্য কোনো মেয়েরা এই ‘বার্ড’ নামটি নিয়ে গানের ভুবনে আলো ছড়িয়ে দিতে পারে।









