১০০০ দিনের ক্ষত
গাজার কান্না হয়ে বাজল ‘কমফোর্টেবলি নাম্ব’

সংগৃহীত ছবি
গাজায় ইসরায়েলি আগ্রাসনের ১০০০ দিন পূর্ণ হলো। এই দীর্ঘ সময়ে রক্ত ঝরেছে, জনপদ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। আর বিশ্ব? এক অদ্ভুত নীরবতা অথবা নিরপেক্ষতায় ডুবে আছে। ঠিক এই সময়েই যেন এক জোরালো চপেটাঘাত হয়ে এলো পিংক ফ্লয়েডের কালজয়ী গান ‘কমফোর্টেবলি নাম্ব’। সাতচল্লিশ বছর পর গানটি নতুন করে প্রাণ পেল। তবে এবার তা কোনো নস্টালজিয়া নয়; এবার তা গাজার কান্না, প্রতিরোধ আর প্রতিবাদের এক জীবন্ত দলিল।
রজার ওয়াটার্স ও ফিলিস্তিনি শিল্পী মোনা মিয়ারি—এই দুই অসম যুগের ও দুই ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষ এক হয়েছেন। জন্ম নিয়েছে ‘কমফোর্টেবলি নাম্ব: রিইমাজিনড’। ‘দ্য নিউ আরব’-এর সাংবাদিক অ্যাগনেস বোফানো কথা বলেছিলেন এই দুই শিল্পীর সাথে। সেই কথোপকথনে উঠে এসেছে শিল্প, রাজনীতি আর মানুষের অস্তিত্বের এক গভীর দর্শন। গাজার ১০০০ দিনের ক্ষতকে সামনে রেখে আগামীর সময়ের পাঠকদের জন্য সেই আলাপচারিতা তুলে ধরা হলো-
দূরত্বের সেতু: নিউইয়র্ক থেকে গাজা
গানটিতে রজার ওয়াটার্স যখন গেয়ে ওঠেন—“আই ফিল ইয়োর পেইন ফ্রম নিউইয়র্ক সিটি” (নিউইয়র্ক থেকে আমি তোমার যন্ত্রণা অনুভব করছি)—তখন তা কেবল একটি পঙ্ক্তি থাকে না। এটি হয়ে ওঠে এক মহাদেশীয় সংলাপ। এক প্রান্তে নিউইয়র্কের এক প্রবীণ রক লিজেন্ড, অন্য প্রান্তে ফিলিস্তিনের এক তরুণী—যার রক্তে ও স্মৃতিতে মিশে আছে ‘নাকবা’ বা মহাবিপর্যয়ের ইতিহাস।
মোনা মিয়ারি জানান, তিনি সাধারণত অন্যের গান কাভার করতে পছন্দ করেন না। কিন্তু গাজার ধ্বংসস্তূপের মধ্য দিয়ে মনে মনে হাঁটার সময় তার মাথায় রজার ওয়াটার্সের আদি গানটির প্রশ্নগুলো ঘুরপাক খাচ্ছিল। মোনা বলেছেন, “আমি রজারের প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে চেয়েছিলাম। আমি চেয়েছিলাম এক নির্মম, বিধ্বংসী সত্যকে দুনিয়ার সামনে মেলে ধরতে। যাতে এই বিশ্ব আর ‘স্বস্তিদায়ক অসাড়তা’র আড়ালে চোখ বুজে থাকতে না পারে।”
রজার ওয়াটার্স যখন মোনার লেখা আরবি লিরিক্সের অনুবাদ পড়েন, তিনি স্তম্ভিত হয়ে যান। রজার বলেন, ‘আমি ভাবলাম, আমি কী লিখব? তখনই কলম থেকে প্রথম শব্দ কটি বেরিয়ে এলো। এটি সমুদ্রের ওপার থেকে এক নারীর সাথে আমার সরাসরি কথোপকথন। তাই এই সৃষ্টি এত শক্তিশালী।’
গাজার চোখ ও এক শিশুর আর্তনাদ
এই মিউজিক ভিডিওটি কেবল একটি গান নয়, একটি জীবন্ত দলিল। এর পেছনে আছেন ফিলিস্তিনি আলোকচিত্রী সুহাইল নাসার এবং তার দল। যখন গাজার ওপর বোমা পড়ছিল, তখন তারা ক্যামেরা হাতে জীবন বাজি রেখে এই দৃশ্যগুলো ধারণ করেছেন। এতে কোনো কৃত্রিমতা নেই, নেই কোনো সাজানো যুদ্ধের আবহ। এটি ফিলিস্তিনিদের নিজেদের চোখে নিজেদের গল্প বলা।
গানের সবচেয়ে মর্মস্পর্শী অংশটি হলো ছয় বছরের শিশু হিন্দ রজবের মায়ের সাথে মোনার এক কাল্পনিক কথোপকথন। ইসরায়েলি বাহিনীর গুলিতে গাড়ির ভেতর আটকে থেকে সাহায্যের জন্য আকুতি জানাতে জানাতে প্রাণ হারিয়েছিল ছোট্ট হিন্দ। এই গানে হিন্দ কোনো পরিসংখ্যান নয়; সে একটি ঘুমপাড়ানি গানের সুর হয়ে ফিসফিসিয়ে কথা বলে। সে জানান দেয়—হাজারো শিশুর রক্তকে এত সহজে ভুলে যেতে দেওয়া হবে না।
মোনা স্পষ্ট করে বলেছেন, তিনি গানটি সুন্দর করার জন্য গাননি। এটা কোনো বিনোদন নয়, এটা একটা ‘কল টু অ্যাকশন’ বা প্রতিবাদের ডাক। তার ভাষায়, ‘আমরা মানুষের প্রশংসা চাই না। আমরা চাই এই সত্য মানুষকে অস্বস্তিতে ফেলুক। শ্রোতাদের ভেতরে এমন কিছু জেগে উঠুক, যা তাদের ব্যবস্থা নিতে বাধ্য করবে।’
‘মুক্ত ফিলিস্তিন’ এবং অস্তিত্বের লড়াই
গানটি শেষ হয় এক চরম সাঙ্গীতিক ও নৈতিক চূড়ায় পৌঁছানোর মধ্য দিয়ে—‘ফ্রম দ্য রিভার টু দ্য সি’ (নদী থেকে সাগর পর্যন্ত ফিলিস্তিন মুক্ত হোক)। এই লাইনের কারণে ইতিমধ্যে অনেক জায়নবাদী এবং পিংক ফ্লয়েডের পুরনো ভক্তরা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। রজার ওয়াটার্স তাদের উদ্দেশ্যে সোজাসুজি বলেছেন, ‘ওরা আসলে এত বছর ধরে পিংক ফ্লয়েডের দর্শনের কিছুই বোঝেনি। মোনা আর আমি মানবজাতির আত্মার সুরক্ষার জন্য এক অস্তিত্বের লড়াইয়ে নেমেছি।’
ভবিষ্যতের রাজনৈতিক সমাধান কী? রজারের চোখে তা হলো—ধর্ম, বর্ণ বা জাতীয়তা নির্বিশেষে সবার জন্য সমান অধিকারসম্পন্ন একটি একক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। তবে মোনা এখানে আরেকটু গভীরে যান। তিনি মনে করিয়ে দেন, ‘গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র তো পরের কথা। আগে সব নিপীড়িত মানুষের জন্য স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে।’
গাজার ১০০০ দিনের এই ক্রান্তিলগ্নে ‘কমফোর্টেবলি নাম্ব: রিইমাজিনড’ কোনো শোকগাথা নয়। এটি আরবি শব্দ ‘সুমুদ’ বা অবিচলতার প্রতীক। মোনা মিয়ারির কণ্ঠে আর রজার ওয়াটার্সের গিটারের তারে যে সুর বেজে উঠেছে, তা আসলে ফিলিস্তিনের কখনো হার না মানার গল্প।





