দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় নিজস্ব সংগীত বিপ্লব, চাপে কে-পপ?

সংগৃহীত ছবি
বিশ্ব জুড়ে মিউজিক ইন্ডাস্ট্রিতে গত এক দশক ধরে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে রেখেছে দক্ষিণ কোরিয়ার ‘কে-পপ’। বিটিএস কিংবা ব্ল্যাকপিঙ্কের গানে বুঁদ হয়ে থাকেনি এমন তরুণ খুঁজে পাওয়া দায়।
কিন্তু এই চেনা রাজত্বে এবার বড় ধাক্কা লেগেছে! দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোয় এখন কোরিয়ান বা আমেরিকান পপ মিউজিককে হটিয়ে শীর্ষস্থান দখল করে নিচ্ছে তাদের নিজস্ব হোমগ্রোন বা স্থানীয় সংগীত।
ফিলিপাইনের ‘পি-পপ’ থেকে শুরু করে থাইল্যান্ডের ‘টি-পপ’ এবং ইন্দোনেশিয়ার স্থানীয় গান এখন স্পটিফাই ও রেডিওর চার্টগুলোয় ঝড় তুলছে। আলজাজিরার সাম্প্রতিক এক বিশেষ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই চমকপ্রদ তথ্য।
মিউজিক অ্যানালিটিক্স প্ল্যাটফর্ম ‘সাউন্ডচার্টস’-এর তথ্য বলছে, গত কয়েক বছরে স্পটিফাই ও রেডিও— উভয় মাধ্যমেই স্থানীয় গানের জনপ্রিয়তা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
২০২১ সালে ইন্দোনেশিয়ার স্পটিফাই টপ ১০ চার্টে স্থানীয় গানের অংশ ছিল ৩৯ শতাংশ, যা ২০২৬ সালে বেড়ে ৯৭ শতাংশে পৌঁছেছে। একই সময়ে ফিলিপাইনে এ হার ৩১ শতাংশ থেকে ৮১ শতাংশ এবং থাইল্যান্ডে ৭১ শতাংশ থেকে ৭৬ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।
রেডিও চার্টেও একই প্রবণতা দেখা গেছে। ইন্দোনেশিয়ায় স্থানীয় গানের অংশ ২৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ৫৫ শতাংশ এবং থাইল্যান্ডে ৩৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ৬৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। পরিসংখ্যানটি ইঙ্গিত দিচ্ছে, শ্রোতাদের প্লেলিস্টে ক্রমেই বেশি জায়গা করে নিচ্ছে নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতির গান।
কে-পপের কাঠামো, প্রতিভায় নিজস্ব মাটি ফিলিপাইনের জনপ্রিয় বয়ব্যান্ড ‘আলামাত’, ‘বিজিওয়াইও’ কিংবা গার্ল গ্রুপ ‘বিনি’— যারা সবাই ২০২১ সালের দিকে যাত্রা শুরু করেছিল, তারা মূলত কে-পপ বা জে-পপের চমৎকার কাঠামো এবং গ্ল্যামারাস পরিবেশনার ধরনটি ধার করেছে। তবে গানের কথা, সুর, আবেগ এবং ভাষার ক্ষেত্রে তারা ব্যবহার করছে একদম নিজেদের ফিলিপিনো সংস্কৃতি। আর এই ফিউশন বা মিশ্রণ লুফে নিয়েছে নতুন প্রজন্মের শ্রোতারা।
থাই চলচ্চিত্র প্রযোজক কড সাত্রুসায়েং বলেছেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে থাই মিউজিক ছিল মূলত কোরিয়ান এবং আমেরিকান স্টাইলের অনুকরণ। কিন্তু গত কয়েক বছরে থাই শিল্পীরা নিজেদের একটি শক্তিশালী ও স্বাধীন পরিচয় তৈরি করতে পেরেছেন।’ তবে তিনি এটিও স্বীকার করেন যে, কোরিয়ার ‘গ্যাংনাম স্টাইল’ বা বিটিএস-এর সাফল্যই প্রথম এশিয়ান দেশগুলোকে শিখিয়েছে যে এশিয়ান মিউজিক দিয়েও আন্তর্জাতিক বাজারে কোটি কোটি ডলার আয় করা সম্ভব।
স্ট্যাটিস্টার তথ্যমতে, ডিজিটাল মিউজিক থেকে আয়ের পরিমাণ ফিলিপাইনে ২০২১ সালের ৯৩ মিলিয়ন ডলার থেকে দ্বিগুণ হয়ে ১৮০ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। ইন্দোনেশিয়ায় এই আয় দাঁড়িয়েছে ২৬৪ মিলিয়ন ডলারে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই মিউজিক বিপ্লবের পেছনে সবচেয়ে বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে টিকটক এবং ইনস্টাগ্রাম রিলস। ‘বিজিওয়াইও’ ব্যান্ডের ২৩ বছর বয়সী সদস্য নেট পোরকাল্লা জানিয়েছেন, সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ভক্তদের সঙ্গে টিকটক ট্রেন্ড, নাচের ভিডিও ও কমেন্টের মাধ্যমে সরাসরি যুক্ত থাকাই তাদের এই আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তার মূল চাবিকাঠি।
পাশাপাশি, এই অঞ্চলের দেশগুলোর মানুষের অর্থনৈতিক ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে তারা এখন নিজেদের দেশের কনটেন্ট ও মিউজিকের পেছনে টাকা খরচ করতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছেন।
এই মিউজিক জোয়ারের মধ্যেও ব্যতিক্রম হিসেবে রয়ে গেছে সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়া। সেখানে এখনো পশ্চিমা এবং কোরিয়ান কে-পপই রেডিও ও স্পটিফাই চার্টে রাজত্ব করছে। তবে মালয়েশিয়ায় একটি ভিন্ন ট্রেন্ড দেখা যাচ্ছে; সেখানে ভাষার মিল থাকার কারণে নিজেদের গানের পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশ ইন্দোনেশিয়ার পপ গান এক লাফে ৫% থেকে বেড়ে প্রায় ৪৬% জায়গা দখল করে নিয়েছে।
তাইওয়ানে কর্মরত ইন্দোনেশিয়ান নাগরিক এলহানা সুগাইমান বলেছেন, ‘বিদেশের মাটিতে বসে যখন আমেরিকার বড় রেকর্ড লেবেলে আমাদের দেশের ‘নো না’ ব্যান্ডের গানে গেমলানের মতো ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্রের সুর শুনি, তখন বুকটা গর্বে ভরে ওঠে। মনে হয় বিদেশের বুকেও নিজের দেশকে দেখতে পাচ্ছি।”
কে-পপ বিশ্বকে দেখিয়েছে যে এশিয়ান পপ কালচার আন্তর্জাতিকভাবে সফল হতে পারে। আর সেই পথ ধরেই এখন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নিজস্ব মিউজিক ইন্ডাস্ট্রি নিজেদের ডানা মেলছে।





