খাতা চ্যালেঞ্জে রেকর্ড ১৩ লাখ আবেদন

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
কোনো পাবলিক বা অ্যাকাডেমিক পরীক্ষার ফলে অসন্তুষ্ট হলে উত্তরপত্র পুনরায় যাচাইয়ের আবেদন করতে পারে শিক্ষার্থীরা। এই প্রক্রিয়া খাতা পুনর্নিরীক্ষণ বা ‘খাতা চ্যালেঞ্জ’ নামে পরিচিত। প্রতি বছর এসএসসি বা এইচএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর শিক্ষা বোর্ডগুলোয় জমা পড়ে খাতা চ্যালেঞ্জের অসংখ্য আবেদন। তবে চলতি বছরের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফলের বিপরীতে আবেদন জমার পরিমাণে রেকর্ড হয়েছে। এবার নির্ধারিত সাত দিনে ৪ লাখ ২৫১ জন শিক্ষার্থী মোট ১২ লাখ ৮৭ হাজার ৯২৬টি বিষয়ে খাতা যাচাইয়ের আবেদন করেছে, যা গত বছরের চেয়ে প্রায় সাড়ে ৫ লাখ বেশি। গড়ে একেকজন শিক্ষার্থী তিনটি বিষয়ে পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন করেছে। জিপিএ ৫ পেয়েও অনেক শিক্ষার্থী গোল্ডেন জিপিএ ৫ পাওয়ার জন্য খাতা চ্যালেঞ্জ করেছে। বোর্ডভিত্তিক সবচেয়ে বেশি আবেদন পড়েছে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডে।
আন্তঃশিক্ষা বোর্ডের তথ্যমতে, হঠাৎ করে অস্বাভাবিক আবেদন বাড়ার পেছনে পাসের হার কমে যাওয়া, কঠোর মূল্যায়ন এবং প্রচলিত প্রথা বদলে পুরো উত্তরপত্র মূল্যায়নের বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রীর ঘোষণার প্রভাব রয়েছে। তবে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলছেন, বিদ্যমান ব্যবস্থার অধীনে এই বিপুল আবেদন পুনর্নিরীক্ষণ করা অসম্ভব। পরিস্থিতি সামাল দিতে কোন ধরনের খাতা পুনর্নিরীক্ষণের আওতায় আসবে, তা নির্ধারণ করতে শিগগির নতুন নীতিমালা করা হবে বলেও জানালেন তিনি।
১০ আগস্ট প্রকাশ হয় এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল। যেখানে গড় পাসের হার ছিল ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ। গত বছর যা ছিল ৬৮ দশমিক ৪৫ শতাংশ। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে পাসের হার কমেছে ৬ দশমিক ২০ শতাংশ। একই সঙ্গে জিপিএ ৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে ২২ হাজারের বেশি।
এবার পুনর্নিরীক্ষণের আবেদনের সংখ্যা অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ার কারণ সম্পর্কে কথা হয় শিক্ষা বোর্ডের সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে। তারা বলছেন, এর অন্যতম কারণ চলতি বছর পুনর্নিরীক্ষণের ধরন পরিবর্তন। প্রচলিত আইনে পাবলিক পরীক্ষায় সাধারণত পুনর্নিরীক্ষণের ক্ষেত্রে শুধু নম্বর গণনা, যোগফল বা কোনো প্রশ্নের উত্তরে নম্বর দেওয়া বাদ পড়েছে কি না, তা দেখা হতো। অর্থাৎ পুরো খাতা নতুন করে মূল্যায়ন হতো না। চলতি বছর পাবলিক পরীক্ষা আইন পরিবর্তন করেছে সরকার। এ বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রী বলেছিলেন, যারা খাতা চ্যালেঞ্জ করেছে, তাদের খাতা প্রচলিত পুনর্নিরীক্ষণ নয় বরং পুরো উত্তরপত্র মূল্যায়ন করা হবে। এর পরিপ্রেক্ষিতে কাঙ্ক্ষিত ফল না পাওয়া শিক্ষার্থীরা প্রাপ্ত নম্বর ফের যাচাই করতে খাতা চ্যালেঞ্জ বেশি করেছে। এ ছাড়া চলতি বছর পাসের হার ও জিপিএ ৫ কমে যাওয়া, খাতা মূল্যায়নে আগের তুলনায় কঠোরতা, সহানুভূতির নম্বর দেওয়ার প্রচলন বন্ধ ছিল বড় কারণ।
সবচেয়ে বেশি আবেদন ঢাকা বোর্ডে: বোর্ডভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ঢাকা শিক্ষা বোর্ডে তত্ত্বীয় বিষয়ে ২ লাখ ৭৭ হাজার ৬৬৫টি এবং ব্যবহারিক বিষয়ে ৫৮ হাজার ১২টি— ৩ লাখ ৩৫ হাজার ৬৭৭টি আবেদন পড়েছে। কুমিল্লা বোর্ডে আবেদন ১ লাখ ১২ হাজার ৬১১টি। রাজশাহী বোর্ডে ১ লাখ ২২ হাজার ২২৮টি, যশোরে ৯১ হাজার ৫৯টি এবং চট্টগ্রাম বোর্ডে ১ লাখ ৩৭ হাজার ৬০১টি আবেদন পড়েছে। এ ছাড়া বরিশালে ৬১ হাজার ৮৬টি, সিলেটে ৬০ হাজার ৯৭৪টি, দিনাজপুরে ১ লাখ ১১ হাজার ২৬০টি, মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডে ১ লাখ ১৭ হাজার ৫৯টি, কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে ৫১ হাজার ২১৪টি এবং ময়মনসিংহ বোর্ডে ৮৭ হাজার ১৫৭টি আবেদন জমা পড়েছে।
রেকর্ড আবেদনের পেছনে কারণ: এবার পরীক্ষাকেন্দ্রে ছিল কড়া নজরদারি। এ ছাড়া মূল্যায়নে শৃঙ্খলা এবং পরীক্ষকদের নির্ধারিত মানদণ্ড অনুসরণ, পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নে তুলনামূলকভাবে বেশি সতর্কতা ও কঠোরতার কারণে বেশি নম্বর আসেনি। এতে কাঙ্ক্ষিত ফল না পাওয়া শিক্ষার্থীরা মনে করছে, তাদের প্রত্যাশার তুলনায় কম নম্বর এসেছে। বিশেষ করে ইংরেজি ও গণিতের মতো অপেক্ষাকৃত দুর্বল ফলের বিষয়গুলোয় কম নম্বর পাওয়ার পর পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন করার প্রবণতা বেশি। যেমন ঢাকা শিক্ষা বোর্ডে ২ লাখ ৭৭ হাজার ৬৬৫টি আবেদনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আবেদন পড়েছে ইংরেজিতে ৪৬ হাজার এরপর গণিতে ৩৪ হাজার। একই চিত্র অন্যান্য শিক্ষা বোর্ডগুলোতেও। তবে খাতা পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন বেড়েছে বলেই যে বিপুল শিক্ষার্থীর ফল পরিবর্তন হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই বলে জানালেন শিক্ষা বোর্ড সংশ্লিষ্টরা।
এ ব্যাপারে আন্তঃশিক্ষা বোর্ডের সমন্বয়ক ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আকতারুজ্জামান বললেন, ‘এবার আবেদন বাড়ার একটিই কারণ, প্রচলিত পুনর্নিরীক্ষণের প্রথা থেকে বের নতুন পদ্ধতিতে উত্তরপত্র মূল্যায়ন। আশা করি, দ্রুত সময়ে এসব খাতা পুনর্নিরীক্ষণ করে ফলাফল প্রকাশ করা হবে।’
ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক খন্দোকার এহছানুল কবির বলছেন, পুনর্নিরীক্ষণের সুযোগ থাকা শিক্ষার্থীদের অধিকার। খাতা চ্যালেঞ্জের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় অন্যতম কারণ চলতি বছর আইন পরিবর্তন। এ ছাড়া কাঙ্ক্ষিত ফল না পাওয়া, অল্প নম্বরের জন্য ফেল বা গ্রেড পরিবর্তন না হওয়া এবং মূল্যায়ন পদ্ধতিতে পরিবর্তন— এসব বিষয় কাজ করেছে। আগে পুনর্নিরীক্ষণে খাতা মূল্যায়নে কোনো প্রশ্নের নম্বর যোগ না হওয়া, নম্বর গণনায় ভুল কিংবা কোনো উত্তর মূল্যায়নের বাইরে থেকে যাওয়ার বিষয় দেখা হতো। এবার সেখানে ব্যাপক রদবদল আনা হয়েছে। এবার একজন শিক্ষার্থীর পুরো খাতা পুনরায় মূল্যায়ন হবে।
এ কারণে শিক্ষার্থীরা আশাবাদী হয়ে বেশি আবেদন করেছে বলেও যোগ করলেন তিনি।






