উৎপাদন বন্ধ আজিজ পাইপসের শেয়ারে উল্লম্ফন

উৎপাদন বন্ধ, বছরের পর বছর লোকসান, বিপুল ঋণের বোঝা আর ঋণাত্মক নিট সম্পদ—আর্থিক সংকটের এমন চিত্রের মধ্যেও শেয়ারবাজারে অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে আজিজ পাইপসের শেয়ারদর। গত আট কার্যদিবসে কোম্পানিটির শেয়ারের দাম বেড়েছে প্রায় ৩৪ শতাংশ। অথচ কোম্পানিটির ব্যবসা ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা ক্ষীণ বলে ইঙ্গিত দিচ্ছে আর্থিক হিসাব ও নিরীক্ষকের পর্যবেক্ষণ। এমন পরিস্থিতিতে কোম্পানিটির শেয়ারে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) নজরেও এসেছে আজিজ পাইপসের শেয়ারের অস্বাভাবিক দরবৃদ্ধি। এ বিষয়ে কোম্পানিটির কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছে স্টক এক্সচেঞ্জ। জবাবে কোম্পানি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, শেয়ারের দাম বাড়ার পেছনে কোনো অপ্রকাশিত মূল্য সংবেদনশীল তথ্য নেই।
ডিএসইর তথ্য অনুযায়ী, গত ৪ অক্টোবর আজিজ পাইপসের প্রতিটি শেয়ারের দাম ছিল ৭৫ টাকা ৯০ পয়সা। ১৪ অক্টোবর লেনদেন শেষে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০১ টাকা ৬০ পয়সায়। অর্থাৎ আট কার্যদিবসে শেয়ারটির দাম বেড়েছে ২৫ টাকা ৭০ পয়সা বা প্রায় ৩৪ শতাংশ।
কোম্পানিটির পক্ষ থেকে কোনো অপ্রকাশিত মূল্য সংবেদনশীল তথ্য না থাকার কথা জানানো হলেও স্বল্পমূলধনী এই কোম্পানির শেয়ারের এমন দরবৃদ্ধির পেছনে কী কারণ রয়েছে, তা স্পষ্ট নয়। একদিকে উৎপাদন বন্ধ ও আর্থিক সংকট, অন্যদিকে শেয়ারদরে বড় উল্লম্ফন—দুইয়ের মধ্যে দৃশ্যমান বৈপরীত্য বিনিয়োগকারীদের জন্য নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।
আজিজ পাইপসের ব্যবসায়িক পরিস্থিতি দীর্ঘদিন ধরেই নাজুক। কোম্পানিটি ২০২৫ সালের ১ মে উৎপাদন বন্ধ করে দেয়। আর্থিক সংকটের কারণে উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর পুনরায় কারখানা চালুর বিষয়ে আশাব্যঞ্জক কোনো চিত্র পাওয়া যাচ্ছে না।
কোম্পানিটির ২০২৪-২৫ অর্থবছরের আর্থিক হিসাব নিরীক্ষা করতে গিয়ে নিরীক্ষক জানান, আজিজ পাইপস কয়েক বছর ধরে লোকসান করছে। এতে কোম্পানিটির পুঞ্জীভূত লোকসান বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৯ কোটি ৯৪ লাখ টাকা। অন্যদিকে, কোম্পানিটির নিট সম্পদ বা ইক্যুইটি ঋণাত্মক ২৫ কোটি ৩৩ লাখ টাকা।
অর্থাৎ কোম্পানিটির মোট দায় ও সংশ্লিষ্ট হিসাব সমন্বয়ের পর শেয়ারহোল্ডারদের জন্য নিট সম্পদের পরিমাণ ইতিবাচক নেই। এমন আর্থিক অবস্থায় ব্যবসা পরিচালনা অব্যাহত রাখা এবং কোম্পানির ভবিষ্যৎ নিয়ে গুরুতর অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। নিরীক্ষকও কোম্পানিটির ব্যবসা পরিচালনা ও টিকে থাকার সক্ষমতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন।
আজিজ পাইপসের আর্থিক হিসাবের বিভিন্ন খাতেও অসংগতি ও যাচাই-সংক্রান্ত সীমাবদ্ধতার তথ্য উঠে এসেছে নিরীক্ষকের পর্যবেক্ষণে।
আর্থিক হিসাবে কোম্পানিটির ২২ কোটি ৮২ লাখ টাকার স্থায়ী সম্পদ দেখানো হয়েছে। তবে জমি, ভবন ও যন্ত্রপাতি ছাড়া অন্যান্য স্থায়ী সম্পদের বিষয়ে নিশ্চিত হতে পারেননি নিরীক্ষক। ফলে এসব সম্পদের হিসাবের যথার্থতা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে।
অন্যদিকে, কোম্পানিটির মজুদ পণ্যের পরিমাণ দেখানো হয়েছে ১ কোটি ৯৪ লাখ টাকা। এর উল্লেখযোগ্য অংশ ব্যবহার অনুপযোগী হলেও হিসাবমান অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সঞ্চিতি গঠন করা হয়নি বলে জানিয়েছেন নিরীক্ষক। ব্যবহার অনুপযোগী পণ্যের যথাযথ মূল্যায়ন না হলে কোম্পানির সম্পদ ও আর্থিক অবস্থার চিত্র বাস্তবতার তুলনায় ভিন্ন হতে পারে।
কোম্পানিটির বিভিন্ন গ্রাহকের কাছে পাওনা রয়েছে ২ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। কিন্তু এসব পাওনার বিস্তারিত তালিকা নিরীক্ষককে দিতে পারেনি কর্তৃপক্ষ। এর মধ্যে ১ কোটি ৫৩ লাখ টাকা এক বছরের বেশি সময় ধরে অনাদায়ি রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা এসব পাওনার বিপরীতে প্রয়োজনীয় সঞ্চিতি গঠন না করার বিষয়টিও নিরীক্ষকের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে।
আজিজ পাইপসের আর্থিক সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে ব্যাংকঋণ আদায়ে আইনি পদক্ষেপের কারণে। কোম্পানিটির বিরুদ্ধে উত্তরা ব্যাংক ও ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের ঋণসংক্রান্ত মামলা রয়েছে।
নিরীক্ষকের তথ্য অনুযায়ী, উত্তরা ব্যাংকের কাছে কোম্পানিটির ঋণের পরিমাণ ২২ কোটি ৮৯ লাখ টাকা, যা নিয়ে বিচারিক কার্যক্রম চলছে। ব্যাংকটি ২০১৮ সালের ৩১ জুলাই পর্যন্ত সময়ের সুদসহ ৭২ কোটি ৫১ লাখ টাকা দাবি করে আইনি পদক্ষেপ নিয়েছে।
এ ছাড়া ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের কাছ থেকে নেওয়া ৭ কোটি ৫১ লাখ টাকার ঋণ রয়েছে কোম্পানিটির। এই ঋণের বিপরীতে ২০২২ সালের ২০ অক্টোবর পর্যন্ত সময়ের জন্য ৩৪ কোটি ৬ লাখ টাকা দাবি করে মামলা করেছে ব্যাংকটি।
দুই ব্যাংকের দাবির পরিমাণ, দীর্ঘদিনের লোকসান এবং উৎপাদন বন্ধ থাকার পরিস্থিতি মিলিয়ে কোম্পানিটির আর্থিক পুনরুদ্ধারের পথ যে কঠিন, তা স্পষ্ট। ঋণসংক্রান্ত মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি ও দায় পরিশোধের বাস্তব চিত্রও কোম্পানিটির ভবিষ্যৎ মূল্যায়নে গুরুত্বপূর্ণ।
১৯৮৬ সালে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়া আজিজ পাইপসের পরিশোধিত মূলধন মাত্র ৫ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। কোম্পানিটির উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের বাইরে অন্যান্য শ্রেণির বিনিয়োগকারীদের হাতে রয়েছে ৮৮ দশমিক ৮৪ শতাংশ শেয়ার।



