সংকট মোকাবিলায় কম ঋণ নেওয়ার পরামর্শ আইএমএফের

ছবি: আগামীর সময়
বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির মোকাবিলায় কম ঋণ নেওয়া এবং গতানুগতিক ধারা থেকে বেরিয়ে রাজস্ব খাত সংস্কারের পরামর্শ দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। পাশাপাশি ব্যয়ের গুণগত মান নিশ্চিত ও সাধারণ মানুষকে সুরক্ষা দিতে বলেছে সংস্থাটি।
আজ বুধবার ব্যাংককে কুইন সিরিকিত ন্যাশনাল কনভেনশন সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলেছেন আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টিলিনা জর্জিয়াভা। সেখানে পৃথকভাবে রাজস্বনীতি নিয়ে একটি ব্রিফিং করা হয়।
ব্রিফিংয়ে বলা হয় বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির কারণে অনেক দেশের ভর্তুকি ব্যয় জিডিপির প্রায় ১ দশমিক ৫ শতাংশের সমান হবে। এটি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার নিরাপত্তাকে ঝুঁকিতে ফেলছে। এ ছাড়া ঋণের উচ্চ সুদ, ভর্তুকি ব্যয়ে বাংলাদেশসহ স্বল্প আয়ের দেশগুলো কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়ছে। বৈশ্বিক বাজারে সুদের হার বেড়ে যাওয়ায় বিদেশি এবং অভ্যন্তরীণ ঋণ ব্যবস্থাপনার ওপর চাপ ক্রমশ তীব্র হচ্ছে। জ্বালানি তেলের মূল্য এবং উচ্চ ভর্তুকি ব্যয় অর্থনীতির জন্য বড় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশ্বব্যাপী এ পরিস্থিতি তুলে ধরে সেখানে প্রতিটি দেশকে নতুন করে রাজস্ব আয় নীতি ও কর কাঠামো গঠনের পরামর্শ দেওয়া হয়। বিশেষ করে রাজস্ব আয় বাড়ানোর ক্ষেত্রে কর কাঠামোর আধুনিকায়ন এবং সংগ্রহ ব্যবস্থার ডিজাইন জোরদার এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি বলে উল্লেখ করা হয়। সেখানে আরও বলা হয়, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে পেনশনের মতো নির্দিষ্ট কিছু খাতের চেয়ে স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং সামাজিক সুরক্ষার মতো মানবসম্পদ উন্নয়নমূলক ব্যয় বাড়াতে হবে।
ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা বলেছেন, বিশ্ব অর্থনীতি বর্তমানে এক জটিল ও বহুমাত্রিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নিয়ে অতিপ্রত্যাশা, উচ্চ সুদহার, খাদ্য ও জ্বালানির চড়া মূল্য এবং ঋণভার বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধিকে মন্থর করে দিচ্ছে। এ অস্থিরতা এবং আইএমএফের সতর্কবার্তার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল ও উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর জন্য অভ্যন্তরীণ নীতিমালায় বড় ধরনের সংস্কারের তাগিদ দেওয়া হয়।
আইএমএফের ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক ও গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি রিপোর্ট অনুযায়ী, বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির হার এখনো ঐতিহাসিক মানদণ্ডে ‘মেঘলা ও গতিহীন’ রয়েছে। আইএমএফ চলতি বছরের বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৩ দশমিক ১ শতাংশ অপরিবর্তিত রাখলেও আগামী বছরের জন্য তা সামান্য বাড়িয়ে ৩ দশমিক ৪ শতাংশ করেছে।
তবে ধর্মীয় উন্নয়ন সংস্থা ‘জুবিলি ইউএসএ নেটার্ক’-এর নির্বাহী পরিচালক এবং দীর্ঘদিনের আইএমএফ পর্যবেক্ষক এরিক লেকম্পটে সতর্ক করে বলেছেন, প্রতিবেদনের ভেতরের উপাত্তগুলো যথেষ্ট উদ্বেগজনক। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অর্থনীতিকে রাতারাতি বদলে দেবে বা সংকট দূর করবে এমন অতিরিক্ত আশাবাদী প্রত্যাশা আর্থিক বাজারে ধস নামাতে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
এর পাশাপাশি, উন্নত অর্থনীতিগুলোয় তৈরি হওয়া উচ্চ সুদের হারে চাপ দ্রুত উদীয়মান বাজার ও নিম্ন আয়ের দেশগুলোর ওপর চেপে বসছে। যার ফলে ঋণের সুদ পরিশোধের ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাচ্ছে। আইএমএফের মতে, জ্বালানি তেল ও খাদ্যের উচ্চমূল্য এবং বৈশ্বিক উন্নয়ন সহায়তা হ্রাসের কারণে অনেক দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ১ দশমিক ৫ শতাংশ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে কর ফাঁকি রোধ এবং করদাতার পরিধি বাড়াতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। আর রাজস্ব আয় জিডিপির অনুপাতে উল্লেখযোগ্য হারে না বাড়লে সরকারের উন্নয়ন ও সামাজিক সুরক্ষা ব্যয় হুমকিতে পড়বে।
ব্রিফিংয়ে আরও বলা হয়, জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক দামের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে স্বচ্ছ এবং পর্যায়ক্রমিক মূল্য নির্ধারণ বা সমন্বয় পলিসি গ্রহণ করতে হবে, যাতে সাধারণ মানুষ অযৌক্তিক মূল্যস্ফীতির শিকার না হয়। একই সঙ্গে ভর্তুকি খাতগুলোকে আরও লক্ষ্যভিত্তিক করতে হবে।
বৈদেশিক এবং অভ্যন্তরীণ ঋণের ক্ষেত্রে গুণগত মান ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা আবশ্যক। অপ্রয়োজনীয় ও কম অগ্রাধিকারের প্রকল্প থেকে সরে এসে উৎপাদনশীল খাতে ঋণ সীমিত রাখতে হবে।
এক প্রশ্নের জবাবে ক্রিষ্টিলিনা বলেছেন, বৈশ্বিক মন্দা ও মূল্যস্ফীতির ধাক্কা থেকে প্রান্তিক ও নিম্ন আয়ের মানুষকে রক্ষা করতে সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী এবং স্বাস্থ্য খাতের বাজেট বরাদ্দ বাড়াতে হবে।



