ঢাকার বৈদ্যুতিক অবকাঠামো সম্প্রসারণ
বৈদেশিক ঋণচুক্তির ফাঁদে প্রকল্পের বাস্তবায়ন

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বিদেশি ঋণচুক্তির ফাঁদে আটকে গেছে প্রকল্পের বাস্তবায়ন। শুরুতেই চলে গেছে এক বছর ৯ মাস। সেই ধাক্কা সামলাতে না সামলাতেই গত মার্চ মাসে শেষ হয়ে গেছে মেয়াদ। অথচ এখন পর্যন্ত বাস্তব অগ্রগতি ৫২.৫০ শতাংশ এবং আর্থিক আরও কম, অর্থাৎ ৩০.২০ শতাংশ। সেই সঙ্গে রয়েছে নানা জটিলতাও। এগুলোর মধ্যে জমি অধিগ্রহণ সমস্যায় আটটি সাব-স্টেশনের মধ্যে মাত্র তিনটির জমি পাওয়া গেছে। বাকি পাঁচটি ঝামেলাযুক্ত ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি। প্রকল্প পরিচালকের পর্যাপ্ত আর্থিক ক্ষমতার অভাব, মালামাল পরিদর্শনের জন্য বিদেশ ভ্রমণে সরকারি আদেশ পেতে তিন-চার মাস সময় লাগা এবং চুক্তি স্বাক্ষরে দেরি হওয়ায় অন্য সব কাজ শুরু করতে দেরি হওয়া। ‘ঢাকায় ডেসকো এলাকায় বৈদ্যুতিক অবকাঠামো সম্প্রসারণ ও শক্তিশালীকরণ’ প্রকল্পে বিরাজ করছে এ চিত্র। ফলে সুফল বঞ্চিত হচ্ছেন গ্রাহকরা। প্রকল্পটি নিয়ে নিবিড় পরিবীক্ষণ সমীক্ষা পরিচালনা করেছে বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি)। এটির দ্বিতীয় খসড়া প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়।
প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বর্তমান বাস্তব অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে আরও দুই বছর অর্থাৎ, ২০২৮ সালের মার্চ পর্যন্ত মেয়াদ বাড়ানোর প্রক্রিয়া চলছে। এটির জন্য মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ২ হাজার ২৭২ কোটি ৪৭ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারি তহবিলের ৪৪৬ কোটি ৫০ লাখ, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) ঋণ ১ হাজার ২৩১ কোটি ৫৪ লাখ এবং বাস্তবায়নকারী সংস্থা ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি লিমিটেডের (ডেসকো) নিজস্ব তহবিল থেকে ৫৯৪ কোটি ৪২ লাখ টাকা ব্যয় করা হচ্ছে।
প্রতিবেদন প্রসঙ্গে আইএমইইডর সচিব সিরাজুন নূর চৌধুরী আগামীর সময়কে বলেছেন, এসব প্রতিবেদন আগামী ৩০ জুনের মধ্যে চূড়ান্ত করা হবে। এরপরই সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কাছে সুপারিশসহ পাঠানোর পাশাপাশি সব প্রতিবেদন মিলে একটি বই তৈরি করা হবে। সেটি নিয়ে আলোচনা করা হবে সরকারের উচ্চপর্যায়ে পাঠানোর পরিকল্পনা আছে।
প্রতিবেদনের খসড়া পর্যালোচনা করে দেখা যায়, প্রকল্পের অর্থায়নের বিষয়ে এডিবির সঙ্গে আগে থেকেই আলোচনা চলমান ছিল। কিন্তু ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে ডেসকো ইআরডির মাধ্যমে জানতে পারে ডেসকোর আর্থিক সচ্ছলতা বিবেচনায় এডিবি ওই প্রকল্পের জন্য ১৬ কোটি ডলার সভরেন অ্যান্ড নন-সভরেন মিশ্র ঋণ হিসাবে প্রস্তাব করেছে। যদিও আগের আলোচনায় অর্ডিনারি ক্যাপিটাল রিসোর্স তহবিল থেকে সভরেন ফাইন্যান্স হিসাবে অন্তর্ভুক্ত ছিল। এমন পরিস্থিতিতে এডিবিকে ২০২১ সালের ১৮ অক্টোবর ইআরডি আবার সভরেন ফাইন্যান্স করার অনুরোধ করে। বিষয়টি দ্রুত নিষ্পত্তি হবে ধরে নিয়ে ২০২২ সালের এপ্রিলে প্রকল্পটি অনুমোদন দেওয়া হয়। কিন্তু এডিবি পরিচালিত ২০২৩ সালের ১৫ মে শেষ হওয়া এক ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং মিশনে ‘বাংলাদেশের বিদ্যমান সরকারি নীতিমালায় সরকার মালিকানাধীন সংস্থার নন-সভরেন ঋণ গ্রহণের কোনো নীতিকাঠামো নেই’ বলে উল্লেখ করা হয়। ফলে ২০২৩ সালের ২১ জুন সভরেন ঋণের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয় এডিবি। ঋণচুক্তি কার্যকরের এক বছর আগে একটি অংশের তৈরি করা দরপত্র দলিলে এডিবির অনুমোদন দেয়; কিন্তু একই চিঠিতে তারা ঋণ অনুমোদনের কোনো অনুমতি দেয়নি। সেই সঙ্গে সামগ্রিকভাবে অ্যাডভান্স প্রকিউরমেন্ট প্রসেস করারও কোনো অনুমোদন বা পরামর্শ দেয়নি। ফলে ওই অংশের ক্রয়প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেও ঋণচুক্তি কার্যকর হওয়ারে আগে ঠিকাদারি চুক্তি করা যায়নি। একইভাবে, ডেসকো অন্য তিনটি অংশের ক্রয়প্রক্রিয়া শেষ করেও ঠিকাদারি চুক্তি করতে পারেনি। এভাবেই প্রকল্পের সব কার্যক্রম সামগ্রিকভাবে পিছিয়ে পড়ে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকল্পটি অনুমোদন পর্যায়ে কিছু প্রাক্কলন ও বাস্তবায়ন পরিকল্পনায় সীমিত অসামঞ্জস্যতা রয়েছে। বিশেষ করে অর্থবছরভিত্তিক পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন সময়সূচি এবং কিছু প্যাকেজের বাস্তবায়ন যোগ্যতা নির্ধারণে বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে পূর্ণ সামঞ্জস্যতা সব ক্ষেত্রে ছিল না। এ ছাড়া জমি হস্তান্তর, আন্তঃসংস্থাগত সমন্বয় ও অর্থছাড় প্রক্রিয়ার জটিলতা আগে থেকেই যথাযথ মূল্যায়ন না হওয়ায় পরও বাস্তবায়ন পর্যায়ে দেরি হয়। এজন্য ভবিষ্যতে এ ধরনের প্রকল্প তৈরিতে অধিক বাস্তবভিত্তিক সম্ভাব্যতা যাচাই, ঝুঁকি বিশ্লেষণ এবং সময়সূচি নির্ধারণ আরও সূক্ষ্মভাবে করা প্রয়োজন বলে মনে করছে আইএমইডি।




