জ্বালানি তেলের দামে ৪ আঘাতের শঙ্কা

তেলের দাম বাড়লে বেড়ে যায় সবকিছুর মূল্য। বরাবরের এই কঠিন বাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়ে জ্বালানি তেল নিয়ে চার আঘাতের শঙ্কায় রয়েছে সরকার। অর্থ বিভাগের ঝুঁকি বিশ্লেষণ বলছে, তেলের দামের অভিঘাত আগামী অর্থবছরে ‘উচ্চ মূল্যস্ফীতি-নিম্ন প্রবৃদ্ধি’র চক্রে ফেলতে পারে দেশকে, যেখান থেকে উত্তরণ সহজ হবে না। সংকুচিত হবে শিল্প উৎপাদন, বাড়তে পারে বাণিজ্য ঘাটতিও। এতে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির প্রায় সব সূচকই নেতিবাচক মোড় নিতে পারে, যার প্রতিক্রিয়া পৌঁছে যাবে মানুষের ভাতের থালা থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের কোষাগার পর্যন্ত।
অর্থ বিভাগের মধ্যমেয়াদি সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতি বিবৃতিতে (২০২৬-২৭ থেকে ২০২৮-২৯) জ্বালানি তেলজনিত ঝুঁকি মূল্যায়নে এসব উদ্বেগের কথা তুলে ধরা হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট ঘোষণার সময় অর্থমন্ত্রী এই নীতি বিবৃতি উপস্থাপন করেন।
জানা গেছে, বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ জ্বালানি তেল সরবরাহ হয় হরমুজ প্রণালি দিয়ে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের ঝুঁকি বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির শেষভাগে মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত তীব্র আকার নিলে বন্ধ হয়ে যায় হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল। ফলে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম ভিত্তিরেখা থেকে ৫৫ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১২৬ ডলারে পৌঁছে যায়, যা গত চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে গড়ে জ্বালানির দাম ২৪ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। কিন্তু অর্থ মন্ত্রণালয় আরও কঠোর পরিস্থিতি ধরে বিশ্লেষণ করেছে। তাদের হিসাবে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে তেলের দাম আরও ৩০ শতাংশ বাড়তে পারে। পরের বছর কিছুটা কমলেও এই অভিঘাত অর্থনীতিকে তাড়া করবে বহু বছর ধরে।
বিশ্লেষণে দেখানো হয়েছে, জ্বালানি তেলের এই মূল্যবৃদ্ধির আঘাতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি লক্ষ্যমাত্রা ৭ দশমিক ৫ থেকে বেড়ে ৯ দশমিক ১ শতাংশ, প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫ থেকে ৪ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে। আর শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি ৭ থেকে কমে ৪ দশমিক ৫ শতাংশ এবং বাণিজ্য ঘাটতি মাইনাস ৬ দশমিক ৯ থেকে বেড়ে মাইনাস ৭ দশমিক ৬ শতাংশ হতে পারে।
সাবেক সিনিয়র অর্থ সচিব মাহবুব আহমেদ আগামীর সময়কে জানিয়েছেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে অর্থনীতির সূচকের ওপর আঘাত আসবে। আমাদের এখন তাই জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কৌশল বের করতে হবে। বিশেষ করে তিন মাসের তেলের মজুদ গড়ে তোলার অবকাঠামোর দিকে নজর দিতে হবে। তিনি আরও বললেন, মূল্যস্ফীতি এখন অসহনীয় মাত্রায় বিরাজ করছে। এমন পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হবে সাধারণ মানুষের। এজন্য অভিঘাত মূল্যায়নের সঙ্গে তাদের কথাও মাথায় রাখতে হবে।
প্রথম আঘাত মূল্যস্ফীতিতে: দেশের মানুষ সবচেয়ে আগে যে ধাক্কা অনুভব করবে, সেটা বাজারদরে। নীতি বিবৃতির হিসাব বলছে, জ্বালানি তেলের দাম ৩০ শতাংশ বাড়লে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশের ভিত্তি প্রক্ষেপণ থেকে বেড়ে ৯ দশমিক ১ শতাংশে পৌঁছাবে। অর্থাৎ, মাত্র একটি বহিঃখাতীয় ধাক্কায় মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাবে ১ দশমিক ৬ শতাংশ। এর কারণও স্পষ্ট। জ্বালানির দাম বাড়লে পরিবহন ব্যয়ের সঙ্গে কাঁচামাল, খাদ্যপণ্য ও ভোগ্যপণ্য সরবরাহ ব্যয় বাড়ে। আরও বাড়ে শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যয়, কৃষকের সেচ, পরিবহন ও যান্ত্রিক চাষের খরচ। শেষ পর্যন্ত সবকিছুর চাপ গিয়ে পড়ে ভোক্তার পকেটে। উদ্বেগের বিষয় হলো, একবার কোনোকিছুর দাম বেড়ে গেলে, তা আর সহজে কমতে চায় না। বাংলাদেশের বাজার কাঠামোয় অলিগোপলি (এমন একটি বাজারব্যবস্থা, যেখানে অল্প কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠান সমগ্র বাজারের সিংহভাগ নিয়ন্ত্রণ করে), সিন্ডিকেটভিত্তিক ব্যবসা এবং সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতা মূল্যস্ফীতিকে দীর্ঘস্থায়ী করে তুলতে পারে বলে সতর্ক করেছে অর্থ বিভাগ। ফলে তেলের মূল ধাক্কা কেটে যাওয়ার পরও ২০২৭-২৮ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৯ এবং ২০২৮-২৯ অর্থবছরে ৬ দশমিক ২ শতাংশে থাকতে পারে, যা মূল প্রক্ষেপণের তুলনায় বেশি। অর্থাৎ, জনগণের জন্য স্বস্তির বাজার ফেরার পথ কেবল দীর্ঘই হবে।
শিল্প খাতে প্রবৃদ্ধিতে আঘাত: দ্বিতীয় বড় আঘাত আসবে শিল্প উৎপাদনে। দেশের শিল্পায়ন মূলত জ্বালানিনির্ভর। বিদ্যুৎ, গ্যাস, পরিবহন ও আমদানিনির্ভর কাঁচামালের ওপর দাঁড়িয়ে আছে উৎপাদন কাঠামো। ফলে তেলের দামের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি সরাসরি আঘাত করবে শিল্প খাতকে। নীতি বিবৃতির প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশের পরিবর্তে নেমে আসতে পারে মাত্র ৪ দশমিক ৫ শতাংশে। এই ব্যবধান পরের বছরগুলোতেও বজায় থাকবে। ২০২৮-২৯ অর্থবছরে যেখানে শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি ৮ শতাংশ হওয়ার কথা ছিল, সেখানে তা হতে পারে ৬ দশমিক ২ শতাংশ। কৃষিও রেহাই পাবে না এই আঘাত থেকে। একই ধারায় কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৫ শতাংশের পরিবর্তে কমে দাঁড়াতে পারে ৩ শতাংশে। ডিজেলচালিত সেচ, ফসল পরিবহন এবং কৃষি যন্ত্রপাতির ব্যবহার হয়ে উঠবে ব্যয়বহুল। ফলে খাদ্য উৎপাদনেও চাপ সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা আবার উসকে দিতে পারে মূল্যস্ফীতিকে।
বাণিজ্য ঘাটতির চাপ পড়বে রিজার্ভে: জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশ হওয়ায় সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হতে পারে বৈদেশিক খাত। তেলের দাম বাড়লে একই পরিমাণ জ্বালানি আমদানিতে বেশি ডলার খরচ করতে হয়। নীতি বিবৃতির হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাণিজ্য ঘাটতি জিডিপির ৬ দশমিক ৯ থেকে বেড়ে ৭ দশমিক ৬ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। চলতি হিসাবের ঘাটতিও হয়ে যেতে পারে প্রায় দ্বিগুণ। এই বাড়তি আমদানি ব্যয়ের সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হবে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে। ২০২৮-২৯ অর্থবছরে যেখানে রিজার্ভ ৬২ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছানোর আশা রয়েছে, সেখানে তা কমে দাঁড়াতে পারে ৫২ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলারে। অর্থাৎ প্রায় ৯ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারের ঘাটতি তৈরি হতে পারে। এটি শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়; বরং বিনিময় হার। আমদানি সক্ষমতা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থার ওপর এর গভীর প্রভাব পড়তে পারে।
গতি কমবে প্রবৃদ্ধির: নীতি বিবৃতির সবচেয়ে উদ্বেগজনক অংশ হচ্ছে জিডিপি প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস। অর্থ মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, তেলের মূল্য অভিঘাতের ফলে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫ শতাংশের পরিবর্তে কমে ৪ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে আসতে পারে। পরের বছরগুলোতে কিছুটা পুনরুদ্ধার হলেও তা ফিরতে পারবে না মূল গতিপথে। ২০২৭-২৮ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৫ দশমিক ৫ শতাংশ, যেখানে লক্ষ্য ছিল ৭ শতাংশ। আর ২০২৮-২৯ অর্থবছরে তা দাঁড়াতে পারে ৬ দশমিক ৫ শতাংশে, যা মূল প্রক্ষেপণের তুলনায় ১ শতাংশ কম। অর্থাৎ অর্থনীতি শুধু সাময়িক ধাক্কা খাবে না; বরং মধ্যমেয়াদে একটি স্থায়ী প্রবৃদ্ধি ঘাটতির ঝুঁকিতে পড়বে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার অভিঘাতে।


